পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা বাঙালি অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় তারা দলে দলে ফিরে আসছেন নিজ রাজ্যে। দীর্ঘ ভ্রমণ, ভিড়ভাট্টা আর নানা দুর্ভোগ সত্ত্বেও ভোট দেওয়ার তাগিদেই এই ফিরে আসা।
ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বেগ
রাজ্য সরকারের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩৬ লাখ বাঙালি শ্রমিক রাজ্যের বাইরে কাজ করেন, যদিও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ৫০ লাখের কাছাকাছি। সম্প্রতি ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় বহু জেলার তালিকায় ব্যাপক হারে নাম যাচাই ও বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভোট না দিলে তাদের নাম স্থায়ীভাবে বাদ পড়ে যেতে পারে।
দুর্ভোগের মাঝেও ফেরার তাড়া
তামিলনাড়ু, কেরালা, দিল্লি, গুজরাট, মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে শ্রমিকরা ট্রেন ও বাসে করে ফিরছেন। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেকেই নির্ধারিত টিকিট না পেয়ে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করছেন। কেউ কেউ জরিমানা দিয়ে রিজার্ভড কামরায় উঠছেন, আবার কেউ ভিড়ের চাপে আহত হচ্ছেন। অনেকেই জানাচ্ছেন, যাত্রাপথে জায়গা না পাওয়া, ট্রেন দেরি করা কিংবা ব্যক্তিগত জিনিস হারানো—সবই এখন সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোটার পরিচয়ের গুরুত্ব
অভিবাসী শ্রমিকদের কাছে ভোটার কার্ড শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, এটি তাদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। রাজ্যের বাইরে কাজ করতে গেলে এটি প্রায়শই পরিচয় যাচাইয়ের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখতে ভোট দেওয়া তাদের কাছে অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
কাজের টান আর ভোটের দায়
অনেক শ্রমিক জানিয়েছেন, রাজ্যে পর্যাপ্ত কাজ না থাকায় তারা বাইরে গিয়ে কাজ করেন। তবে ভোট দেওয়ার পর আবার কাজে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা তাদের। এতে বোঝা যায়, জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় তারা সচেতন।
রাজনীতি ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
অভিবাসী শ্রমিকদের এই ফিরে আসা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও চলছে তর্ক-বিতর্ক। বিরোধী পক্ষ দাবি করছে, বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ফিরে আসছেন এবং কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সহায়তায় ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। অন্যদিকে শাসক দল এই দাবি অস্বীকার করে বলছে, শ্রমিকদের জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পরিচয় ও মর্যাদার প্রশ্ন
শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, এই ভোট শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি পরিচয় রক্ষার লড়াইও। অনেক অভিবাসী শ্রমিক নিজেদের ‘বহিরাগত’ বা সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্তি পেতে ভোট দিতে আগ্রহী। তাদের কাছে আঙুলের কালি শুধুই ভোটের চিহ্ন নয়, বরং নাগরিকত্বের স্বীকৃতি।
ফেরার এই স্রোত তাই শুধু নির্বাচনী উত্তেজনা নয়, বরং অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনের বাস্তবতা, নিরাপত্তা ও পরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















