১১:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
ঢাকার বাস টার্মিনাল এখনই সরছে না, বাইরে থাকবে ডিপো—জানালেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী জাবিতে মাদককাণ্ড: দুই ছাত্রীকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার, একজনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ চীনের ইভি যুদ্ধে নতুন অস্ত্র: নিজস্ব স্মার্ট-ড্রাইভিং চিপে ঝুঁকছে গাড়ি নির্মাতারা নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৬ মাস পর মুখোমুখি, জি৭ সম্মেলনে পাশাপাশি আসন জি৭ সম্মেলনে রাশিয়ার ওপর আরও চাপের সিদ্ধান্ত, ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠকে ইউক্রেন ইস্যুতে নতুন বার্তা উপজেলায় এমপিদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’, প্রতিটি উপজেলায় বরাদ্দ ৬ লাখ টাকা চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত, মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের বৈঠক মুহাররমের চাঁদ দেখা যায়নি, পাকিস্তানে ২৬ জুন পালিত হবে আশুরা রয়টার্স এর প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে দিল্লি বিমানবন্দরে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করার প্রতিবাদ জানিয়েছে লালমনিরহাটে শিশু হত্যাকাণ্ড ঘিরে সংঘর্ষ: এসপি-ওসিসহ আহত ২০, আটক প্রধান সন্দেহভাজন

সহাবস্থানের ইতিহাস: সংঘাতের আড়ালে মুসলিম-ইহুদি সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

ইতিহাসের পাতায় মুসলিম ও ইহুদিদের সম্পর্ককে প্রায়ই রক্তাক্ত সংঘাতের গল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ বলছে, এই সম্পর্কের ভেতরে রয়েছে সহাবস্থান, সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার এক দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস, যা অনেকটাই উপেক্ষিত।

বিদায়ের বেদনা ও বাস্তবতার সংঘাত

১৯৫১ সালের ১৬ এপ্রিল, ইরাকের সীমান্তবর্তী একটি শহর থেকে যখন ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষজন দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, তখন তাদের বিদায় জানাতে ভিড় করেছিলেন স্থানীয় কুর্দি মুসলমান প্রতিবেশীরা। চোখের জল আর কান্নায় ভরা সেই বিদায়ের দৃশ্য একদিকে যেমন মানবিক সম্পর্কের গভীরতা দেখায়, অন্যদিকে বাগদাদ বিমানবন্দরে পৌঁছে তারা যে বিদ্বেষের মুখে পড়েন, তা তুলে ধরে তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার নির্মমতা।

এই মানুষগুলো রাজনৈতিকভাবে কোনো পক্ষের ছিলেন না, তবুও নাগরিকত্ব হারিয়ে তারা বাধ্য হন দেশ ছাড়তে। নতুন দেশে পৌঁছে তাদের অনেকেই নিজেদেরকে শরণার্থী নয়, বরং যুদ্ধবন্দীর মতো অনুভব করেছিলেন।

সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস

ইসলামের সূচনা থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে সম্পর্ক শুধুই সংঘাতের ছিল না। মরক্কো, আন্দালুসিয়া, তুরস্ক, ইয়েমেন কিংবা ইরাক—বিভিন্ন অঞ্চলে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বসবাস করেছেন।

বিয়ে, ব্যবসা, সামাজিক আচার—সবকিছুতেই ছিল একধরনের মিলন ও সহযোগিতা। যদিও ইসলামী রাষ্ট্রে ইহুদিরা “ধিম্মি” হিসেবে কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকতেন, তবুও তাদের সুরক্ষা ও ধর্মচর্চার অধিকার নিশ্চিত ছিল।

এই সম্পর্ককে অনেক গবেষক “সহাবস্থানের সহমর্মিতা” হিসেবে দেখছেন, যেখানে বৈষম্য ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল সহনশীলতা ও পারস্পরিক নির্ভরতা।

ইতিহাসের চরিত্র ও তাদের ভূমিকা

এই দীর্ঘ ইতিহাসে উঠে আসে নানা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের নাম। ষোড়শ শতকের এক নারী ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী, যিনি ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হওয়ার পর আবার নিজের ধর্মে ফিরে আসেন এবং একটি নতুন বসতি গড়ে তোলেন, তার গল্প যেমন অনুপ্রেরণাদায়ক, তেমনি উনিশ শতকের এক ব্যবসায়ীর সাফল্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইহুদিদের ভূমিকার দৃষ্টান্ত।

অন্যদিকে, ১৯৬১ সালে আলজেরিয়ায় এক সংগীতশিল্পীর হত্যাকাণ্ড ইহুদিদের ব্যাপকভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। এই ধরনের ঘটনাগুলো দেখায়, কিভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা সহাবস্থানের পরিবেশকে ভেঙে দেয়।

রাজনীতি, মতাদর্শ ও বিভাজন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরব-ইসরায়েল সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোতে ইহুদিদের অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও নেতারা তাদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, আবার কিছু ক্ষেত্রে উগ্র মতাদর্শ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, মুসলিম-ইহুদি সম্পর্কের অবনতিতে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ ও ধর্মীয় রাজনীতি অনেক সময় বিভাজনকে গভীর করেছে।

ভবিষ্যতের পথ: সম্মান ও সহাবস্থান

বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে ইহুদিদের সংখ্যা খুবই কম। অনেকেই এখন পর্যটক হিসেবে পূর্বপুরুষের স্মৃতি খুঁজতে যান।

তবুও ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—সংঘাতের পাশাপাশি সহাবস্থানের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে ভবিষ্যতে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই হতে পারে একমাত্র পথ।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সম্পর্ককে শুধু রক্তাক্ত সংঘাতের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না, আবার অতিরঞ্জিত সৌহার্দ্যের গল্পেও সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বাস্তবতা এর মাঝামাঝি, যেখানে মানবিক সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকার বাস টার্মিনাল এখনই সরছে না, বাইরে থাকবে ডিপো—জানালেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী

সহাবস্থানের ইতিহাস: সংঘাতের আড়ালে মুসলিম-ইহুদি সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

০১:২২:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

ইতিহাসের পাতায় মুসলিম ও ইহুদিদের সম্পর্ককে প্রায়ই রক্তাক্ত সংঘাতের গল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ বলছে, এই সম্পর্কের ভেতরে রয়েছে সহাবস্থান, সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার এক দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস, যা অনেকটাই উপেক্ষিত।

বিদায়ের বেদনা ও বাস্তবতার সংঘাত

১৯৫১ সালের ১৬ এপ্রিল, ইরাকের সীমান্তবর্তী একটি শহর থেকে যখন ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষজন দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, তখন তাদের বিদায় জানাতে ভিড় করেছিলেন স্থানীয় কুর্দি মুসলমান প্রতিবেশীরা। চোখের জল আর কান্নায় ভরা সেই বিদায়ের দৃশ্য একদিকে যেমন মানবিক সম্পর্কের গভীরতা দেখায়, অন্যদিকে বাগদাদ বিমানবন্দরে পৌঁছে তারা যে বিদ্বেষের মুখে পড়েন, তা তুলে ধরে তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার নির্মমতা।

এই মানুষগুলো রাজনৈতিকভাবে কোনো পক্ষের ছিলেন না, তবুও নাগরিকত্ব হারিয়ে তারা বাধ্য হন দেশ ছাড়তে। নতুন দেশে পৌঁছে তাদের অনেকেই নিজেদেরকে শরণার্থী নয়, বরং যুদ্ধবন্দীর মতো অনুভব করেছিলেন।

সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস

ইসলামের সূচনা থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে সম্পর্ক শুধুই সংঘাতের ছিল না। মরক্কো, আন্দালুসিয়া, তুরস্ক, ইয়েমেন কিংবা ইরাক—বিভিন্ন অঞ্চলে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বসবাস করেছেন।

বিয়ে, ব্যবসা, সামাজিক আচার—সবকিছুতেই ছিল একধরনের মিলন ও সহযোগিতা। যদিও ইসলামী রাষ্ট্রে ইহুদিরা “ধিম্মি” হিসেবে কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকতেন, তবুও তাদের সুরক্ষা ও ধর্মচর্চার অধিকার নিশ্চিত ছিল।

এই সম্পর্ককে অনেক গবেষক “সহাবস্থানের সহমর্মিতা” হিসেবে দেখছেন, যেখানে বৈষম্য ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল সহনশীলতা ও পারস্পরিক নির্ভরতা।

ইতিহাসের চরিত্র ও তাদের ভূমিকা

এই দীর্ঘ ইতিহাসে উঠে আসে নানা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের নাম। ষোড়শ শতকের এক নারী ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী, যিনি ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হওয়ার পর আবার নিজের ধর্মে ফিরে আসেন এবং একটি নতুন বসতি গড়ে তোলেন, তার গল্প যেমন অনুপ্রেরণাদায়ক, তেমনি উনিশ শতকের এক ব্যবসায়ীর সাফল্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইহুদিদের ভূমিকার দৃষ্টান্ত।

অন্যদিকে, ১৯৬১ সালে আলজেরিয়ায় এক সংগীতশিল্পীর হত্যাকাণ্ড ইহুদিদের ব্যাপকভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। এই ধরনের ঘটনাগুলো দেখায়, কিভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা সহাবস্থানের পরিবেশকে ভেঙে দেয়।

রাজনীতি, মতাদর্শ ও বিভাজন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরব-ইসরায়েল সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোতে ইহুদিদের অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও নেতারা তাদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, আবার কিছু ক্ষেত্রে উগ্র মতাদর্শ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, মুসলিম-ইহুদি সম্পর্কের অবনতিতে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ ও ধর্মীয় রাজনীতি অনেক সময় বিভাজনকে গভীর করেছে।

ভবিষ্যতের পথ: সম্মান ও সহাবস্থান

বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে ইহুদিদের সংখ্যা খুবই কম। অনেকেই এখন পর্যটক হিসেবে পূর্বপুরুষের স্মৃতি খুঁজতে যান।

তবুও ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—সংঘাতের পাশাপাশি সহাবস্থানের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে ভবিষ্যতে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই হতে পারে একমাত্র পথ।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সম্পর্ককে শুধু রক্তাক্ত সংঘাতের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না, আবার অতিরঞ্জিত সৌহার্দ্যের গল্পেও সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বাস্তবতা এর মাঝামাঝি, যেখানে মানবিক সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।