ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের লাগাতার শক্তি প্রদর্শন প্রাচীন ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উপেক্ষা করছে—এথেন্স একসময় সদয় নেতৃত্ব থেকে নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল, আর সেই পথই তাদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারকরা প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডিসের চিন্তাধারাকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করছেন। তারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত শক্তির ওপর নির্ভর করে চলে। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করা হয়, যা ট্রাম্প ‘বিশ্ব শক্তির চিরন্তন নিয়ম’-এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। এই ঘটনার সমালোচনার জবাবে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আসলে শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার ওপরই পরিচালিত হয়।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত এই মনোভাবকে আরও জোরালো করেছে। এপ্রিলের শুরুতে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ না করলে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।
থুসিডিডিসের শিক্ষা ও ভুল ব্যাখ্যা

থুসিডিডিসের ‘পেলোপনেশীয় যুদ্ধের ইতিহাস’ বহুদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী বিশ্লেষণের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা অনিবার্য। তবে তারা প্রাচীন ইতিহাসবিদের গভীর শিক্ষাকে প্রায়ই উপেক্ষা করেন—অসংযত ও অযৌক্তিক ক্ষমতার ব্যবহার শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে।
এই গ্রন্থের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ‘মেলিয়ান সংলাপ’। সেখানে এথেন্স মেলোস দ্বীপকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। মেলোস নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। এথেন্স জানিয়ে দেয়, শক্তিশালী যা পারে তাই করে, আর দুর্বলদের তা মেনে নিতে হয়। শেষ পর্যন্ত মেলোস পরাজিত হয়, পুরুষদের হত্যা করা হয় এবং নারী-শিশুদের দাসত্বে বিক্রি করা হয়।
আধুনিক বিশ্বে একই নীতি
বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে এই একই মনোভাব স্পষ্ট। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরাসরি বলা হয়েছে, তার হাতে শক্তি নেই। ডেনমার্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ দাবি করা হয়েছে। ছোট দেশগুলোর ওপর একতরফা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কিউবা দখলের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি ইরান যুদ্ধের আগে ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই তাদের সহযোগিতা দাবি করা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপ দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এমন এক পরাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে, যা নেতৃত্বের নৈতিকতা ও বৈধতার পরিবর্তে কেবল আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

প্রাচীন গ্রিসে একটি শহর-রাষ্ট্রকে নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতো, যাকে বলা হতো ‘হেগেমন’। তবে এই নেতৃত্ব সবসময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত। সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ ছিল এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে পেলোপনেশীয় যুদ্ধ, যেখানে শেষ পর্যন্ত এথেন্স পরাজিত হয়।
থুসিডিডিস লিখেছিলেন, এথেন্সের শক্তি বৃদ্ধির কারণে স্পার্টার মধ্যে ভয় সৃষ্টি হয়েছিল, যা যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। বর্তমান বিশ্বে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ককে একইভাবে ব্যাখ্যা করেন। তবে বাস্তবতা আরও গভীর—এথেন্সের শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা নৈতিক নিয়ম ভেঙে একনায়কতান্ত্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল, যা অন্যদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
আধিপত্যের ফাঁদ
শক্তির অপব্যবহার ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রও সেই পথে হাঁটছে। আন্তর্জাতিক স্বার্থে দায়িত্ব নেওয়ার পরিবর্তে এখন তারা নিজেদের আধিপত্য ব্যবহার করে মিত্রদের কাছ থেকেও সুবিধা আদায় করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের কাঠামোর মধ্যে নিজের শক্তিকে সংহত করেছিল। এতে ছোট-বড় সব দেশ অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল এবং একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও লাভজনক ছিল।
কিন্তু এখন সেই পথ থেকে সরে আসা হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ রাশিয়া বা চীনের কার্যকলাপের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে উঠছে।
একাকী পরাশক্তির ঝুঁকি
বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে গেলে অনুসারী প্রয়োজন। ট্রাম্প দাবি করতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্র কারও সাহায্য ছাড়াই চলতে পারবে। কিন্তু যদি এই নীতি অব্যাহত থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে মিত্রহীন হয়ে পড়বে এবং একটি বিশৃঙ্খল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একা হয়ে যাবে।
এখনও সময় আছে এই পথ পরিবর্তনের। আর সেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে ইতিহাসকে সঠিকভাবে বোঝার মাধ্যমে—যেমনটি থুসিডিডিস আমাদের শিখিয়েছিলেন।
স্টুয়ার্ট প্যাট্রিক 



















