যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শুধু “দুর্নীতিগ্রস্ত” বলা তার কার্যকলাপের প্রকৃত পরিসর বোঝাতে যথেষ্ট নয়। তার দুর্নীতির ব্যাপ্তি এতটাই বিশাল যে এটি আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন ধরনের বাস্তবতা তৈরি করেছে।
ট্রাম্প এবং তার পরিবার ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসার মাধ্যমে তারা শত শত মিলিয়ন ডলার আয় করেছেন। এসব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে বড় করপোরেশন, বিদেশি নাগরিক এবং এমনকি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পক্ষ, যারা প্রশাসনের কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার আশায় এই বিনিয়োগ করেছে।
উদাহরণ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার একটি বিনিয়োগ তহবিল ট্রাম্প পরিবারের একটি ক্রিপ্টো ফান্ডে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে, যা ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়ার ঠিক আগে ঘটে। পরে ওই পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ পাওয়ার জন্য হোয়াইট হাউসের ওপর প্রভাব খাটাতে সক্ষম হয়।
ক্ষমা প্রদানের বিতর্ক
ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাও ২০২৩ সালে একটি আর্থিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর ঝাও ক্ষমা পাওয়ার জন্য তদবির করেন। পরবর্তীতে ট্রাম্প তাকে ক্ষমা প্রদান করেন, যা বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয়। এর ফলে ঝাও তার ওপর আরোপিত ৪.৩ বিলিয়ন ডলারের জরিমানার দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
একই সময়ে আরেকটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, যা ওই আমিরাতি পক্ষের সঙ্গে যুক্ত, ট্রাম্প পরিবারের সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে একটি বড় বিনিয়োগ চুক্তি করে। এই চুক্তি ট্রাম্প পরিবারের জন্য বছরে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সরকারি প্রকল্পে অর্থ সংগ্রহ
ট্রাম্পের বিভিন্ন প্রকল্প—যেমন বলরুম, প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি এবং স্মৃতিস্তম্ভ—এসব উদ্যোগের জন্য ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেশন থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এসব অর্থের একটি বড় অংশের কোনো স্পষ্ট হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।
একই সঙ্গে ট্রাম্প তার কর তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব সংস্থার বিরুদ্ধে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করেছেন। সমালোচকদের মতে, এটি সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি ভিন্ন রূপ।
ইতিহাসের প্রে
ক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দুর্নীতির ঘটনা নতুন নয়। উনবিংশ শতকে অনেক প্রশাসনে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তবে সেসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি সাধারণত প্রশাসনের নিচের স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল।
বিশ শতকের বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেও বিতর্ক ছিল, যেমন প্রশাসনিক অনিয়ম বা ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ। তবে ট্রাম্পের মতো করে ক্ষমতাকে সরাসরি ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করার নজির খুবই বিরল।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বিশেষতা
অতীতের প্রেসিডেন্টদের ক্ষেত্রে দুর্নীতি সাধারণত একটি পার্শ্ববর্তী সমস্যা হিসেবে দেখা গেছে। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে দুর্নীতিই যেন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার প্রশাসনে ব্যক্তিগত লাভ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার একটি কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আচরণ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের আড়ালে ক্ষমতাসীনরা ব্যক্তিগত সম্পদ সংগ্রহে মনোযোগী হয়ে ওঠে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা
ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হলে তিনি আরও বেশি করে নিজের ও পরিবারের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা দুর্নীতিকে রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখতেন। তাদের মতে, দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
বর্তমানে কংগ্রেসে বিরোধী দলের শক্ত অবস্থান না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হলেও ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের এই ধরনের অনিয়ম উপেক্ষা করা হলে তা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
জামেল বুই 
ক্ষাপট

















