গতকাল ‘পঞ্চাশ বছরেও এ দেশ ঠিক হবে না’ শিরোনামে আমার পোষ্টের উপর অনেকগুলো প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। এটি ছিল মূলত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অত্যন্ত পরিচিত টকশো আলোচক ডাক্তার জাহেদুর রহমানের প্রথম সংবাদ সম্মেলন এবং তরুণ সংসদ সদস্য জুলাই যোদ্ধা হাসনাত আব্দুল্লাহর সরকারি গাড়ি চাওয়া নিয়ে।
তাদের দুজনের বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যেটা আপনারা ইতিমধ্যে দেখেছেন। হাসনাতের গাড়ির ব্যাপারটায় পরে আসছি।
গতকাল ড।: জাহেদ ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সদস্যদের সঙ্গে দুপুরে কি খাবার খেয়েছেন সেটা নিয়ে। খাবারের ছবি সহ তালিকায় দেখলাম একেবারেই সাদামাটা মেনু। জাহেদ সাহেব আরো উল্লেখ করেছেন বিকেলের নাস্তা এবং দুপুরের খাওয়া সহ একজনের মোট খরচ ১৫০ টাকা। অর্থাৎ এটাই প্রধানমন্ত্রীর দুপুর এবং বিকেলের খাওয়ার খরচ। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন এটা আগের সরকার প্রধানদের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় ভাগ কম। তার এই পোস্ট দেখে আমার এক ফেসবুক বন্ধু আমাকে ইনবক্সে একটা মন্তব্য পাঠিয়েছেন। সেটা শেয়ার করছি।
“উনি কি বাস্তবতা দেখে বলেছেন, নাকি বলতে হবে তাই বলেছেন। দেশের যেকোন টং হোটেলেও দুপুরের খাবার ও বিকালের নাস্তার জন্য এত আইটেমের দাম দেড়শ টাকার বেশি হবে।
আমার লোকাল শহরে : দুপুরে সর্বনিম্ন ১ প্লেট ভাত ২০/, ডাল ১০/, সবজি ২০/ সেদ্ধ ডিম ২০ , চিংড়ি+লাউ ৫০/,দই ২০/ আবার বিকালে যদি সিঙাড়া/স্যান্ডউইচ ১৫/ ১ কাপ কফি ১৫/ = দেড়শ টাকা! উনি পানি খাবেন না?
,১ লিটার পানির দাম কত উনি জানেন তো? নাকি উনিও গা ভাসালেন চাটুকার রাজনীতিবিদের মত।
যদি সম্ভব হয় আপনি ডাঃ জাহেদকে প্রশ্নটি করবেন ভাই।”
গতকাল খাবারের ওই পোষ্ট দেখে আমার মনে কয়েকটা প্রশ্ন এসেছে। সেটা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি।

১। আমার কাছে খাবারের এই পোস্ট অরুচি এবং মর্যাদাহানিকর মনে হয়েছে। ডা: জাহেদের মত একজন জ্ঞানী, রুচিবান মানুষের কাছ থেকে এটা আমি আশা করিনি। অনুমান করি জাহেদ সাহেব এই পোস্টটি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কত সাদামাটা জীবনযাপন করেন সেটা হাইলাইট করার জন্য।
তার পোস্ট অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য নওয়াবের সদস্যদের ডেকেছেন। এখন বুঝতে পারছি তাদেরকে আলোচনার পর তিনি মধ্যাহ্ন ভোজে আপ্যায়িত করেছেন। ভালো কথা। তবে প্রধানমন্ত্রীর অফিস তো খাওয়া দাওয়ার জায়গা না। আর দুপুরের খাবার খেলেও সেটা প্রচারের কি প্রয়োজন ছিল সেটা আমার মাথায় আসছেনা।
সাংবাদিক হিসেবে আমি পৃথিবীর অনেক দেশে বড় বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আগে থেকে এপয়েন্টমেন্ট করা সেসব মিটিংয়ে তারা শুধু কাজের কথা বলে এবং সেখানে লাঞ্চে আপ্যায়ন করা তাদের রিচুয়াল এর মধ্যে পড়ে না। সরকারি বড় কর্মকর্তাদের দেখেছি যদি লাঞ্চে কাউকে দাওয়াত করে তবে সাধারণত তারা অফিসের বাইরে কোন রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে কয়েকবার। অনেকে অবশ্য বলতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তো কাউকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেতে পারবেন না। সেটা বুঝি। তবে তার খাবারের মেনু কেন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে সেটা বুঝলাম না।
এর উদ্দেশ্য সম্ভবত তারেক রহমানকে একজন সাধারন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে তিনি যে বুলেটপ্রুফ অত্যন্ত দামী নিজের গাড়িতে চড়েন সেটা তো সাধারণ মানুষের পক্ষে এ্য।ফরড করা সম্ভব না। দীর্ঘ ১৭ বছর কোন দৃশ্যমান আয় ছাড়া তিনি কি করে লন্ডনের মত একটি ব্যয়বহুল শহরে বসবাস করলেন, বা কিভাবে এই ধরনের গাড়ি ব্যবহার করছেন তার কোন সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাইনি।
জাহেদ সাহেবের উচিত হবে এই ব্যাপারগুলো খোলাসা করা। কারণ এগুলো নিয়ে এখন মানুষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। আর এগুলো করলে মানুষের মনে তারেক রহমান সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা হচ্ছে সেটা কেটে যাবে।
আশঙ্কা করি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ইমেজ বিল্ড আপ এর প্রচেষ্টায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনুসের মত অবস্থা না হয়। তার দপ্তরের কতিপয় অতি উৎসাহী ব্যক্তির প্রধান কাজ ছিল ইউনুসকে এক মহামানব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তারা প্রায়ই বলতেন তার মত নির্লোভ, নিরহংকার, পরোপকারী, দেশপ্রেমিক আর হয় না। তার গাড়ি-বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স কোন কিছুই নাই। তার আঠারো মাসের শাসনকালে জাতি দেখল ইউনুস নামক এই ব্যক্তি কতটা লোভী, স্বার্থপর এবং দুর্নীতি পরায়ন।

জাহেদ সাহেব কে অনুরোধ করবো তিনি যেন কোনভাবেই তারেক রহমানের ডাস্টবিন হিসেবে পরিচিতি না পান।
এবার আসি হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রসঙ্গে। গত পরশু উপজেলা চেয়ারম্যানদের, ডিসি, এসপি, ইউএনওদের মতো সংসদ সদস্যদেরও সরকারি গাড়ি দিতে হবে এরকম একটি আবদার তিনি করেছেন। সেটি টেবিল চাপড়িয়ে সমর্থন করেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
অনেকের মত আমিও ভেবেছিলাম তিনি হয়তো শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা চাচ্ছেন। বেশ কয়েকজন আমার পোস্টে মন্তব্য করে আমার ভুলটি ধরিয়ে দিয়েছেন এবং আমি সঙ্গে সঙ্গে সেটা কারেকশন করেছি।
তবে প্রশ্ন হল সংসদ সদস্যদের সরকারি গাড়ি কেন দিতে হবে? তারা তো জনপ্রতিনিধি। হাসনাত উল্লেখ করেছেন যে ভাড়া গাড়িতে চড়ে এলাকায় যেতে তাদের লজ্জা হয়। এখানে লজ্জার কি ব্যাপার বুঝতে পারলাম না। তার কথায় মনে হলো সরকারি গাড়ি একটা স্ট্যাটাস সিম্বল। অতএব তাদেরকেও স্ট্যাটাসধারী হতে হবে এবং সে জন্যই সরকারি গাড়ি প্রয়োজন।
গতকাল সংসদে হাসনাত বলেছেন তার বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি চাননি তবে সরকারি গাড়ি চেয়েছেন। তিনি এও বলেছেন যাতায়াতের জন্য গাড়ির খরচ হিসেবে তাদের প্রতি মাসে ৭০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের মতো একটা গরীব দেশে এটা তো অনেক টাকা। এই টাকা দিয়ে তো তারা গাড়ি রেন্ট করতে পারেন। ভাড়া করা গাড়িতে চড়লে তাদের অসম্মান হবে কেন এটা আমি বুঝতে পারছি না। তারা তো জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ জনগণের মতোই তাদের চলাফেরা, আচার-আচরণ হবে এটাই আমরা আশা করি।
পরিশেষে বলবো সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রীদের সরকার থেকে ঘরবাড়ি বা গাড়ি দেওয়া হবে না এটা নিশ্চিত করতে হবে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে সেটাই নিয়ম। তাদেরকে মাসে একটা বেতন দেওয়া হয় এবং তাদেরও দেশের অন্যান্য জনগণের মত এই বেতনের টাকা দিয়েই সবকিছু চালিয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশে যদি বৈষম্য কমাতে হয় তবে অনতিবিলম্বে ক্ষমতাসীনদের এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাতিল করতে হবে। এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
(আন্তর্জাতিকখ্যাতি সম্পন্ন সাংবাদিক আরশাদ মাহমুদের ফেসবুক পোষ্ট থেকে নিয়ে হবহু ছেপে দেওয়া হলো)
আরশাদ মাহমুদ 


















