প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১২ এপ্রিল ঘোষণা করেছিলেন, ইরানকে শান্তি চুক্তিতে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ শুরু করবে—এটা অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না।
ট্রাম্প নিজেকে অপ্রত্যাশিত হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি অভ্যাসের বাইরে যান না। হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে অবরোধ তার অন্যতম পছন্দের সামরিক কৌশলে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনি ভেনেজুয়েলা ও কিউবার বিরুদ্ধে এই কৌশল ব্যবহার করেছেন। এখন তার প্রশাসন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করেছে এবং সমুদ্রে ইরান-সংযুক্ত জাহাজ জব্দ করা শুরু করেছে।

এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ কোনো সমস্যা ছিল না। সরু এই জলপথ দিয়ে তখন নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরান কার্যত এই প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যা এখন এই যুদ্ধের সবচেয়ে জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প এটাকে দ্রুত সমাধান করতে চান। তার ধারণা, পাল্টা অবরোধ চাপিয়ে ইরানের অর্থনীতি শ্বাসরোধ করা গেলে তেহরান বাধ্য হবে প্রণালী খুলতে এবং ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে নিতে।
কিন্তু এই কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ এখানে লক্ষ্য ও সময়সীমার মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে। ইরান এই সংঘাতকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে এবং দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সুবিধা নিচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প দ্রুত ও নির্ণায়ক বিজয় চান—যা অবরোধ দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। অবরোধ অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেওয়ার মতো ফল দেয় না।
ইতিহাসও একই কথা বলে। মার্কিন গৃহযুদ্ধের শুরুতে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কনফেডারেসির প্রায় ৩,৫০০ মাইল উপকূল জুড়ে অবরোধ আরোপ করেছিলেন। এতে দক্ষিণাঞ্চলের তুলা রপ্তানি প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যায় এবং অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়নি; চার বছর ধরে সংঘাত চলেছে।
![]()
প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও ব্রিটেন জার্মানির ওপর নৌ অবরোধ দেয়। ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া এই অবরোধ খাদ্য, ওষুধ ও যুদ্ধসামগ্রীতে জার্মানির প্রবেশ সীমিত করার চেষ্টা করেছিল। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়াবহ কষ্ট সৃষ্টি হয় এবং শত-সহস্র মানুষের মৃত্যু ঘটে। সামরিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবু জার্মানি সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেনি; যুদ্ধ চলেছে ১৯১৮ সালের শেষ পর্যন্ত।
অবরোধ দ্রুত প্রতিপক্ষের আচরণ বদলায় না—এটা ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টাদের জানা থাকার কথা। এ বছরই যুক্তরাষ্ট্র কিউবার তেল সরবরাহে বাধা দেয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ছাড় আদায়ের জন্য। কিউবা এখন মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে, তবু সরকার নতি স্বীকার করেনি। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তেল রপ্তানিতে অবরোধ দেওয়ার পরও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতা ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়, যা সামরিক ঝুঁকি বাড়ায়।
ইরান আরও সহনশীল হতে পারে। অবরোধে দেশটির তেল আয়ে বড় ধরনের পতন ঘটেছে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সরকার বিপর্যস্ত হবে না। যুদ্ধের আগে পাঠানো তেলের অর্থ এখনও আসছে, এবং অন্তত ৩৪টি ট্যাংকার অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে যেতে পেরেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বাড়তে পারে, যা ইরানের জন্য কিছুটা সুবিধাও তৈরি করবে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, ইরানকে সহায়তা করা যেকোনো জাহাজকে বিশ্বের যেকোনো স্থানে তাড়া করা হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। কার্যকর অবরোধের জন্য নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমা, পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা এবং মানবিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হয়। বর্তমান অবরোধে এসব শর্ত পূরণ হয়নি। ফলে এটি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

দেশের ভেতরেও ইরানের বিকল্প ব্যবস্থা আছে। তাদের প্রায় ৯০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সংরক্ষণ ক্ষমতা রয়েছে, যা অন্তত দুই মাস উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়। খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুতও আছে, এবং স্থলপথে বাণিজ্যের বিকল্প রুট রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ছাড়াই কয়েক মাস অবরোধ সহ্য করা সম্ভব।
কিন্তু এই সময়সীমা ট্রাম্পের জন্য গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তার অস্থিরতা সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া মন্তব্যে স্পষ্ট। তিনি বারবার দাবি করছেন, যুদ্ধ প্রায় শেষ।
এই তাড়াহুড়োর পেছনে কারণও আছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়, এবং এর প্রভাব দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়ছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানি ও সার সংকট বাড়বে, উপসাগরীয় দেশগুলোর রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, যা আসন্ন নির্বাচনে ট্রাম্পের জন্য বড় ঝুঁকি।
সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার বদলে এই অবরোধ উল্টো তেহরানের কৌশলকেই শক্তিশালী করতে পারে। অর্থনীতিতে ক্ষতি হলেও ইরান দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
ইচ্ছাশক্তির এই লড়াইয়ে তেহরানই এগিয়ে। কারণ তাদের কাছে এটি টিকে থাকার প্রশ্ন, আর সেই কারণে তারা অপেক্ষা করতে প্রস্তুত।
জেনিফার কাভানাঘ 



















