০৪:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মৃত্যুর পরও স্বস্তি: কয়লা ব্লক মামলায় সম্পূর্ণ অব্যাহতি পেলেন ড. মনমোহন সিং রাহুল গান্ধীর বিস্ফোরক অভিযোগে লোকসভায় তুমুল হট্টগোল, অমিত শাহের বিরুদ্ধে ‘ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ’ দেওয়ার দাবি বাধ্যতামূলক ভোট: গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি আরও দুর্বল? হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রশ্নে আবার আলোচনায় আইসিটি: ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিয়ে নতুন বিতর্ক জাপানের কুমামোতো ভূমিকম্পে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা, বন্ধ কারখানা-যোগাযোগ, সরবরাহ শৃঙ্খলে সংকট গত ১৫ বছরে জাপানের বড় বড় ভূমিকম্প মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন সিআইডির নতুন প্রধান, আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ ট্রাম্প কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হবেন? ইরানকে সহায়তার অভিযোগে নতুন বিতর্ক জীবন বদলে দিল ১০ দিনের মাথাব্যথা, ধরা পড়ল মরণব্যাধি মস্তিষ্কের ক্যানসার উইম্বলডনের ‘ইন্ডিয়া-ফার্স্ট’ কৌশল: বলিউড, আইসক্রিমে বাড়ছে টেনিসের জনপ্রিয়তা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ক্যামেরায় বন্দি করা রঘু রাই আর নেই: ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শেষে কিংবদন্তির বিদায়

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের বেদনা, সংগ্রাম ও এক জাতির জন্মের ইতিহাসকে ক্যামেরায় তুলে ধরেছিলেন রঘু রাই। তাঁর ছবিতে ফুটে উঠেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মুখ, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—যা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত। সেই ইতিহাস-ধারক আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই। দীর্ঘ দুই বছরের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শেষে রোববার তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথমে প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসার পর তিনি কিছুটা সুস্থ হন। পরে রোগটি পেটে ছড়িয়ে পড়ে এবং সর্বশেষ মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলে। বয়সজনিত জটিলতাও তাঁর শারীরিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে।

জন্ম ও শুরু

১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, বর্তমান পাকিস্তানের ঝাং এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন রঘু রাই। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি আলোকচিত্রের জগতে পা রাখেন। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের প্রতিভা দিয়ে তিনি সংবাদ আলোকচিত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তিনি ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পরে ১৯৭৬ সালে ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করেন।

পেশাগত উত্থান

রঘু রাইয়ের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ‘ইন্ডিয়া টুডে’-এর ফটোগ্রাফি পরিচালক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন। এই সময় তিনি অসংখ্য শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছবি তুলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেন। এছাড়া ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্বখ্যাত ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো’ প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ফরাসি কিংবদন্তি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে রঘু রাইকে বিশেষভাবে উৎসাহ দেন। তাঁর সুপারিশেই ১৯৭৭ সালে রঘু রাই বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্র সংস্থা ম্যাগনাম ফটোস-এর সদস্যপদ লাভ করেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোকচিত্রীদের জন্য অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।

ছবিতে ইতিহাসের দলিল

রঘু রাইয়ের কাজকে আধুনিক ভারতের দৃশ্যমান ইতিহাস বলা হয়। তিনি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার মতো বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প বিপর্যয়ের ছবি ধারণ করে আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে মাদার তেরেসা এবং ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মতো বিশ্বনেতাদের প্রতিকৃতি।

একজন রঘু রাই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও কিছু দুর্লভ ছবি | The Business Standard

পুরস্কার ও সম্মাননা

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেন। ২০১৯ সালে তিনি অ্যাকাডেমি দে বো-আর্টস ফটোগ্রাফি পুরস্কার লাভ করেন, যা আলোকচিত্র জগতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এর আগে ২০১৭ সালে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করে।

একজন পথিকৃৎের বিদায়

রঘু রাই শুধু একজন আলোকচিত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সময়ের দলিল নির্মাতা। তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের গল্প। তাঁর মৃত্যুতে শুধু ভারত নয়, আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র জগত এক অনন্য প্রতিভাকে হারাল।

রঘু রাইয়ের মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর রেখে যাওয়া কাজ আগামী প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকবে অনুপ্রেরণার উৎস।

জনপ্রিয় সংবাদ

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মৃত্যুর পরও স্বস্তি: কয়লা ব্লক মামলায় সম্পূর্ণ অব্যাহতি পেলেন ড. মনমোহন সিং

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ক্যামেরায় বন্দি করা রঘু রাই আর নেই: ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শেষে কিংবদন্তির বিদায়

০৩:৩৭:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের বেদনা, সংগ্রাম ও এক জাতির জন্মের ইতিহাসকে ক্যামেরায় তুলে ধরেছিলেন রঘু রাই। তাঁর ছবিতে ফুটে উঠেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মুখ, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—যা আজও উপমহাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত। সেই ইতিহাস-ধারক আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই। দীর্ঘ দুই বছরের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শেষে রোববার তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথমে প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসার পর তিনি কিছুটা সুস্থ হন। পরে রোগটি পেটে ছড়িয়ে পড়ে এবং সর্বশেষ মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলে। বয়সজনিত জটিলতাও তাঁর শারীরিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে।

জন্ম ও শুরু

১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, বর্তমান পাকিস্তানের ঝাং এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন রঘু রাই। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি আলোকচিত্রের জগতে পা রাখেন। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের প্রতিভা দিয়ে তিনি সংবাদ আলোকচিত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তিনি ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পরে ১৯৭৬ সালে ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করেন।

পেশাগত উত্থান

রঘু রাইয়ের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ‘ইন্ডিয়া টুডে’-এর ফটোগ্রাফি পরিচালক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন। এই সময় তিনি অসংখ্য শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছবি তুলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেন। এছাড়া ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্বখ্যাত ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো’ প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ফরাসি কিংবদন্তি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে রঘু রাইকে বিশেষভাবে উৎসাহ দেন। তাঁর সুপারিশেই ১৯৭৭ সালে রঘু রাই বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্র সংস্থা ম্যাগনাম ফটোস-এর সদস্যপদ লাভ করেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোকচিত্রীদের জন্য অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।

ছবিতে ইতিহাসের দলিল

রঘু রাইয়ের কাজকে আধুনিক ভারতের দৃশ্যমান ইতিহাস বলা হয়। তিনি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার মতো বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প বিপর্যয়ের ছবি ধারণ করে আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে মাদার তেরেসা এবং ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মতো বিশ্বনেতাদের প্রতিকৃতি।

একজন রঘু রাই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও কিছু দুর্লভ ছবি | The Business Standard

পুরস্কার ও সম্মাননা

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেন। ২০১৯ সালে তিনি অ্যাকাডেমি দে বো-আর্টস ফটোগ্রাফি পুরস্কার লাভ করেন, যা আলোকচিত্র জগতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এর আগে ২০১৭ সালে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করে।

একজন পথিকৃৎের বিদায়

রঘু রাই শুধু একজন আলোকচিত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সময়ের দলিল নির্মাতা। তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের গল্প। তাঁর মৃত্যুতে শুধু ভারত নয়, আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র জগত এক অনন্য প্রতিভাকে হারাল।

রঘু রাইয়ের মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর রেখে যাওয়া কাজ আগামী প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকবে অনুপ্রেরণার উৎস।