এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল কর্মজীবনে প্রবেশের প্রধান দরজা। সেই ধারণা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় শুধু সনদ নয়, বরং কাজের অভিজ্ঞতা, বাস্তব দক্ষতা এবং শিল্পখাতের সঙ্গে পরিচিতি—এই তিনটি বিষয়ই তরুণদের চাকরির বাজারে টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে উঠছে। ফলে অনেকের কাছে এখন প্রথম চাকরিটাই যেন তৃতীয় বর্ষের কাজের মতো—যেখানে প্রবেশের আগেই প্রমাণ করতে হচ্ছে নিজের সক্ষমতা।
এই পরিবর্তনের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক ওঠানামা দায়ী নয়। বরং শ্রমবাজারের কাঠামোগত রূপান্তরই এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। মহামারির পর যে নিয়োগ-বুম দেখা গিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়েছে। উচ্চ সুদের হার, বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগে সতর্কতা—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আরও হিসেবি। তারা নতুন কর্মী নেওয়ার আগে নিশ্চিত হতে চায়, সেই প্রার্থী কাজের জন্য কতটা প্রস্তুত।
কিন্তু এর চেয়েও বড় পরিবর্তন ঘটেছে নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশায়। আগে যেখানে নতুন স্নাতকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে ঢোকানো হতো, এখন সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো চায় প্রস্তুত কর্মী। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার আগেই যেন প্রার্থীরা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করে আসে। ফলে ইন্টার্নশিপ, যা একসময় অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে দেখা হতো, এখন তা হয়ে উঠেছে প্রায় বাধ্যতামূলক।
এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে যারা একাধিক ইন্টার্নশিপ করেছে, বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেছে বা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে—তাদের অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে। এতে করে একটি নতুন বৈষম্যও তৈরি হচ্ছে। যেসব শিক্ষার্থী সুযোগ পায়, তারা আরও এগিয়ে যায়; আর যারা এই সুযোগ পায় না, তারা শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা তরুণদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—শিক্ষাজীবনের মূল লক্ষ্য কি এখন জ্ঞান অর্জন, নাকি কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনাকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছে, আর আসল গুরুত্ব দিচ্ছে সিভি সমৃদ্ধ করার দিকে।
তবে এই পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকও আছে। শিক্ষা ও কাজের মধ্যে যে ফাঁকটি দীর্ঘদিন ধরে ছিল, তা ধীরে ধীরে কমছে। বিভিন্ন কর্মমুখী শিক্ষা কার্যক্রম, কাজের সঙ্গে পড়াশোনার সমন্বয় এবং শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা—এসব উদ্যোগ তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী আগেই কর্মক্ষেত্রের চাহিদা বুঝে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, যেসব দেশে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী, সেখানে তরুণদের বেকারত্ব তুলনামূলক কম। অর্থাৎ, শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব দক্ষতা অর্জনই কর্মসংস্থানের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠছে।
তবে এই নতুন ব্যবস্থায় একটি ঝুঁকিও রয়েছে। যদি প্রত্যাশা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী হয়তো সেই মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারবে না। তখন প্রয়োজন হবে এমন সহায়ক কাঠামো, যা তাদের ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান শ্রমবাজারে ডিগ্রি আর এককভাবে সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। এটি এখন কেবল একটি ভিত্তি। এর ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি করতে হবে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং সংযোগের এক সমন্বিত কাঠামো। যারা এই পরিবর্তনকে দ্রুত বুঝে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে। আর যারা পারবে না, তাদের জন্য পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
লিন সুলিং 



















