ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় চীন দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে শক্তিশালী উইন্ডমিলে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব বিস্তারের পথে এগোচ্ছে।
চীনের বিভিন্ন প্রান্তে এখন সারি সারি শক্তিশালী উইন্ডমিল দৃশ্যমান। পাহাড়ের চূড়া থেকে শুরু করে মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় এগুলোর বিস্তার চোখে পড়ে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ আল্ট্রা-হাই ভোল্টেজ লাইনের মাধ্যমে হাজার মাইল দূরের শিল্পাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। গত বছর চীন একাই বিশ্বের অন্যান্য দেশের সম্মিলিত উৎপাদনের তিন গুণ বায়ু বিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপন করেছে।
বাজার দখলে চীনের শক্ত অবস্থান
বিশ্বের শীর্ষ ছয়টি শক্তিশালী উইন্ডমিল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সবগুলোই এখন চীনের। একসময় ইউরোপীয় ও মার্কিন কোম্পানির দখলে থাকা এই শিল্পে চীন এখন প্রায় একক আধিপত্য গড়ে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এই সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
জ্বালানি সংকটে কৌশলগত সুবিধা
পারস্য উপসাগর হয়ে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় আংশিকভাবে বন্ধ থাকায় এশিয়ার বহু দেশ জ্বালানি সংকটে পড়েছে। কিন্তু চীন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে, কারণ তারা আগে থেকেই বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। দেশটির নেতৃত্ব মনে করছে, শক্তিশালী উইন্ডমিল ও সৌর শক্তিতে আগাম বিনিয়োগ এখন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে নবায়নযোগ্য খাতে কিছুটা ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। সেখানে আবার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা দুই দেশের জ্বালানি নীতির স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরছে।
অফশোর শক্তিশালী উইন্ডমিলে নতুন গতি
চীন এখন সমুদ্রভিত্তিক শক্তিশালী উইন্ডমিল প্রকল্পেও জোর দিচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় স্থাপিত এই উইন্ডমিলগুলোতে বাতাসের গতি তুলনামূলক স্থিতিশীল হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও বেশি হয়। সম্প্রতি দেশের গভীরতম অফশোর প্রকল্প চালু হয়েছে, যা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অসন্তোষও রয়েছে। উইন্ডমিলের শব্দ এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলার কারণে গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবুও শক্তিশালী সরকারি সমর্থনের কারণে এসব প্রকল্পে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়নি।

রপ্তানিতে দ্রুত বিস্তার
চীন শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারেই নয়, বৈশ্বিক বাজারেও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে তাদের উইন্ডমিল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও চীনা প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ছে।
তবে এই অগ্রযাত্রা কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখেও পড়ছে। ইউরোপে ভর্তুকি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং কিছু দেশে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে চীনা প্রকল্প আটকে দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফলাফল
চীনের শক্তিশালী উইন্ডমিল খাতের এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল। ২০০৫ সালে দেশীয় উৎপাদন বাধ্যতামূলক করার মতো নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই শিল্পের ভিত্তি তৈরি করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলো বাজার হারাতে থাকে।
বর্তমানে চীনের মোট বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ আসে বায়ুশক্তি থেকে, যা প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। যদিও কয়লা এখনও প্রধান উৎস, তবুও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে—যা ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীনের শক্তিশালী উইন্ডমিলে বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব বিস্তারের কৌশল, তেলের সংকটে নতুন জ্বালানি বাস্তবতার দিকনির্দেশনা তুলে ধরছে।
তেলের অনিশ্চয়তায় চীনের শক্তিশালী উইন্ডমিলে বড় বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথে দ্রুত অগ্রযাত্রা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















