০৪:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
এআই অবকাঠামো নিয়ে জনরোষ: প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জাপানি কোম্পানির বিরল খনিজ আমদানি ব্যয় ২২% বেড়েছে, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে চাপ এআই একচেটিয়া হতে পারে না, বিশ্বজুড়ে সহযোগিতার আহ্বান শি জিনপিংয়ের এফবিআইর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার গ্যাং সদস্য নিতিশ কৌশল যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯% কমেছে, দামে ও পরিমাণে একসঙ্গে ধাক্কা বিশ্বকাপের শেষ বাঁশির পর: ফুটবল যে আয়নায় আমেরিকা ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ দেখা গেল প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা? শুধু শ্রদ্ধা নয়, শহীদ সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব এখনই পালন করতে হবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের সতর্কবার্তা: প্রবৃদ্ধি ৩.৫%, মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে নামার শঙ্কা

উদারতাবাদের ক্লান্তি ও পুনর্জাগরণের সন্ধান

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন অনুদার রাজনীতি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, ক্ষমতার কেন্দ্রে জায়গা করে নিচ্ছে, আর উদারতাবাদ—যা একসময় আধুনিক গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি ছিল—তা যেন দুর্বল, বিভ্রান্ত এবং আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতা শুধু রাজনৈতিক পরাজয়ের ফল নয়; বরং এটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংকটের লক্ষণ। এমনকি যারা নিজেদের উদারপন্থী হিসেবে দেখেন, তাদের মধ্যেও আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—উদারতাবাদ আসলে কী বলতে চায়? এর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা কোথায়?

এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়, কিন্তু আজ এগুলোর তীব্রতা বেড়েছে। কারণ সাম্প্রতিক ইতিহাস উদারতাবাদকে একটি দ্বৈত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছে। একদিকে ছিল বারাক ওবামার নির্বাচনের মতো ঐতিহাসিক সাফল্য, যা উদারতাবাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে সামনে এনেছিল। অন্যদিকে, সেই যুগের পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান দেখিয়েছে—উদারতাবাদের ভিত কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্পের রাজনীতি নিজেও কোনো স্থায়ী আকর্ষণ তৈরি করতে পারেনি। বরং তার ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে—উদারতাবাদের অনুপস্থিতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়, যা সহজেই বিপজ্জনক শক্তি দিয়ে পূরণ হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি সামনে আসে: উদারতাবাদকে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রতিরোধের ভাষা যথেষ্ট নয়। এটি যদি কেবল “ওটা নয়” বলেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা মানুষের কাছে কোনো ইতিবাচক ভবিষ্যৎ কল্পনা তুলে ধরতে পারবে না। প্রয়োজন এমন একটি উদারতাবাদ, যা আবার স্বপ্ন দেখতে পারে, নৈতিক কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাতে পারে এবং সমাজকে একটি উচ্চতর লক্ষ্য দেখাতে পারে।

এই অনুসন্ধান আমাদের নিয়ে যায় উদারতাবাদের ইতিহাসের দিকে—বিশেষ করে সেই সময়ের দিকে, যখন “উদারতাবাদ” শব্দটিরই অস্তিত্ব ছিল না। ইতিহাসবিদ হেলেনা রোজেনব্ল্যাটের বিশ্লেষণ দেখায়, “উদার” হওয়া একসময় ছিল একটি নৈতিক গুণ—যা বোঝাতো উদারতা, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সাধারণ কল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা। রোমান যুগে “লিবারালিতাস” বলতে বোঝানো হতো এমন এক মানসিকতা, যেখানে একজন নাগরিক নিজের স্বাধীনতাকে শুধু নিজের জন্য নয়, বরং অন্যদের উপকারে ব্যবহার করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের উদারতাবাদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আধুনিক সময়ে আমরা উদারতাবাদকে প্রায় পুরোপুরি ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে অধিকার ছিল একটি মাধ্যম—যার মাধ্যমে মানুষ তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। অর্থাৎ, স্বাধীনতা মানে শুধু নিজের ইচ্ছামতো চলা নয়; বরং সঠিক কাজটি করার সক্ষমতা অর্জন করা।

Liberalism must revive itself before it's too late

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, উদারতাবাদ একসময় ব্যক্তিগত চরিত্র গঠনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। একজন ভালো নাগরিক হওয়ার জন্য যে নৈতিক গুণগুলো প্রয়োজন—যেমন উদারতা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ—সেগুলোই ছিল উদারতার মূল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নৈতিক ভাষা রাজনীতির আলোচনায় থেকে হারিয়ে গেছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। বিশেষ করে শীতল যুদ্ধের সময়, উদারতাবাদ নিজেকে ফ্যাসিবাদ ও সাম্যবাদের বিপরীতে দাঁড় করাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও নাগরিক গঠনের ধারণা থেকে দূরে সরে আসে। ফলে এটি ক্রমে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকারের ওপর জোর দিতে শুরু করে, আর নৈতিক বা সামাজিক দায়িত্বের আলোচনা কমে যায়।

এর প্রভাব আমরা আজ শিক্ষাব্যবস্থায়ও দেখি। একসময় শিক্ষা ছিল নাগরিক তৈরির প্রক্রিয়া—যেখানে মানুষকে যুক্তিবাদী, নৈতিক ও সমাজসচেতন করে গড়ে তোলা হতো। আজ সেই জায়গায় এসেছে পেশাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের চাপ। শিক্ষা এখন মূলত চাকরি পাওয়ার উপায়, নাগরিক হওয়ার নয়। ফলে আমরা দক্ষ মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু সচেতন নাগরিক তৈরি করতে পারছি না।

উদারতাবাদের আরেকটি জটিল দিক হলো এর সঙ্গে সহনশীলতার সম্পর্ক। উদারতাবাদ বিশ্বাস করে—ভিন্নমত ও মতবিরোধকে দমন না করে, বরং তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা নিজেরাই অসহনশীল, তাদের কীভাবে মোকাবিলা করা হবে? এই দ্বন্দ্ব ইতিহাস জুড়েই রয়েছে, এবং এর সহজ কোনো সমাধান নেই।

এই সংকট আরও জটিল হয় যখন উদারতাবাদ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। যখন এটি প্রতিষ্ঠানের অংশ হয়ে যায়, তখন এটি আর পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে কাজ করে না। বরং অনেক সময় এটি সাধারণ মানুষের কাছে দূরবর্তী ও অভিজাত একটি মতাদর্শ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এই দূরত্বই উদারতাবাদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে।

তবুও ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: উদারতাবাদ বারবার সংকটে পড়েছে, কিন্তু প্রতিবারই নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছে। এই পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়েছে মূলত ধারণার ভেতর থেকেই—বিশেষ করে যখন এটি আবার তার নৈতিক ভিত্তির দিকে ফিরে তাকিয়েছে।

আজকের সময়েও সেই পথই প্রাসঙ্গিক। উদারতাবাদকে আবার সেই ভাষা খুঁজে পেতে হবে, যা মানুষকে শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়; যা ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি সম্মিলিত কল্যাণের গুরুত্ব তুলে ধরে; যা মানুষকে কেবল ভোগবাদী জীবন নয়, বরং অর্থপূর্ণ জীবনের সন্ধান দেয়।

শেষ পর্যন্ত, উদারতাবাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তার এই পুনর্নির্মাণের ওপর। যদি এটি আবার নৈতিক কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে, তাহলে এটি শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবেই নয়, বরং একটি জীবনদর্শন হিসেবে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি এটি সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে এটি কেবল প্রতিরোধের ভাষায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে—যা কোনো সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নিতে পারে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

এআই অবকাঠামো নিয়ে জনরোষ: প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ

উদারতাবাদের ক্লান্তি ও পুনর্জাগরণের সন্ধান

০৮:০০:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন অনুদার রাজনীতি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, ক্ষমতার কেন্দ্রে জায়গা করে নিচ্ছে, আর উদারতাবাদ—যা একসময় আধুনিক গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি ছিল—তা যেন দুর্বল, বিভ্রান্ত এবং আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতা শুধু রাজনৈতিক পরাজয়ের ফল নয়; বরং এটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংকটের লক্ষণ। এমনকি যারা নিজেদের উদারপন্থী হিসেবে দেখেন, তাদের মধ্যেও আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—উদারতাবাদ আসলে কী বলতে চায়? এর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা কোথায়?

এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়, কিন্তু আজ এগুলোর তীব্রতা বেড়েছে। কারণ সাম্প্রতিক ইতিহাস উদারতাবাদকে একটি দ্বৈত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছে। একদিকে ছিল বারাক ওবামার নির্বাচনের মতো ঐতিহাসিক সাফল্য, যা উদারতাবাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে সামনে এনেছিল। অন্যদিকে, সেই যুগের পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান দেখিয়েছে—উদারতাবাদের ভিত কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্পের রাজনীতি নিজেও কোনো স্থায়ী আকর্ষণ তৈরি করতে পারেনি। বরং তার ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে—উদারতাবাদের অনুপস্থিতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়, যা সহজেই বিপজ্জনক শক্তি দিয়ে পূরণ হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি সামনে আসে: উদারতাবাদকে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রতিরোধের ভাষা যথেষ্ট নয়। এটি যদি কেবল “ওটা নয়” বলেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা মানুষের কাছে কোনো ইতিবাচক ভবিষ্যৎ কল্পনা তুলে ধরতে পারবে না। প্রয়োজন এমন একটি উদারতাবাদ, যা আবার স্বপ্ন দেখতে পারে, নৈতিক কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাতে পারে এবং সমাজকে একটি উচ্চতর লক্ষ্য দেখাতে পারে।

এই অনুসন্ধান আমাদের নিয়ে যায় উদারতাবাদের ইতিহাসের দিকে—বিশেষ করে সেই সময়ের দিকে, যখন “উদারতাবাদ” শব্দটিরই অস্তিত্ব ছিল না। ইতিহাসবিদ হেলেনা রোজেনব্ল্যাটের বিশ্লেষণ দেখায়, “উদার” হওয়া একসময় ছিল একটি নৈতিক গুণ—যা বোঝাতো উদারতা, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সাধারণ কল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা। রোমান যুগে “লিবারালিতাস” বলতে বোঝানো হতো এমন এক মানসিকতা, যেখানে একজন নাগরিক নিজের স্বাধীনতাকে শুধু নিজের জন্য নয়, বরং অন্যদের উপকারে ব্যবহার করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের উদারতাবাদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আধুনিক সময়ে আমরা উদারতাবাদকে প্রায় পুরোপুরি ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে অধিকার ছিল একটি মাধ্যম—যার মাধ্যমে মানুষ তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। অর্থাৎ, স্বাধীনতা মানে শুধু নিজের ইচ্ছামতো চলা নয়; বরং সঠিক কাজটি করার সক্ষমতা অর্জন করা।

Liberalism must revive itself before it's too late

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, উদারতাবাদ একসময় ব্যক্তিগত চরিত্র গঠনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। একজন ভালো নাগরিক হওয়ার জন্য যে নৈতিক গুণগুলো প্রয়োজন—যেমন উদারতা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ—সেগুলোই ছিল উদারতার মূল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নৈতিক ভাষা রাজনীতির আলোচনায় থেকে হারিয়ে গেছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। বিশেষ করে শীতল যুদ্ধের সময়, উদারতাবাদ নিজেকে ফ্যাসিবাদ ও সাম্যবাদের বিপরীতে দাঁড় করাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও নাগরিক গঠনের ধারণা থেকে দূরে সরে আসে। ফলে এটি ক্রমে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকারের ওপর জোর দিতে শুরু করে, আর নৈতিক বা সামাজিক দায়িত্বের আলোচনা কমে যায়।

এর প্রভাব আমরা আজ শিক্ষাব্যবস্থায়ও দেখি। একসময় শিক্ষা ছিল নাগরিক তৈরির প্রক্রিয়া—যেখানে মানুষকে যুক্তিবাদী, নৈতিক ও সমাজসচেতন করে গড়ে তোলা হতো। আজ সেই জায়গায় এসেছে পেশাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের চাপ। শিক্ষা এখন মূলত চাকরি পাওয়ার উপায়, নাগরিক হওয়ার নয়। ফলে আমরা দক্ষ মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু সচেতন নাগরিক তৈরি করতে পারছি না।

উদারতাবাদের আরেকটি জটিল দিক হলো এর সঙ্গে সহনশীলতার সম্পর্ক। উদারতাবাদ বিশ্বাস করে—ভিন্নমত ও মতবিরোধকে দমন না করে, বরং তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা নিজেরাই অসহনশীল, তাদের কীভাবে মোকাবিলা করা হবে? এই দ্বন্দ্ব ইতিহাস জুড়েই রয়েছে, এবং এর সহজ কোনো সমাধান নেই।

এই সংকট আরও জটিল হয় যখন উদারতাবাদ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। যখন এটি প্রতিষ্ঠানের অংশ হয়ে যায়, তখন এটি আর পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে কাজ করে না। বরং অনেক সময় এটি সাধারণ মানুষের কাছে দূরবর্তী ও অভিজাত একটি মতাদর্শ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এই দূরত্বই উদারতাবাদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে।

তবুও ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: উদারতাবাদ বারবার সংকটে পড়েছে, কিন্তু প্রতিবারই নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছে। এই পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়েছে মূলত ধারণার ভেতর থেকেই—বিশেষ করে যখন এটি আবার তার নৈতিক ভিত্তির দিকে ফিরে তাকিয়েছে।

আজকের সময়েও সেই পথই প্রাসঙ্গিক। উদারতাবাদকে আবার সেই ভাষা খুঁজে পেতে হবে, যা মানুষকে শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়; যা ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি সম্মিলিত কল্যাণের গুরুত্ব তুলে ধরে; যা মানুষকে কেবল ভোগবাদী জীবন নয়, বরং অর্থপূর্ণ জীবনের সন্ধান দেয়।

শেষ পর্যন্ত, উদারতাবাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তার এই পুনর্নির্মাণের ওপর। যদি এটি আবার নৈতিক কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে, তাহলে এটি শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবেই নয়, বরং একটি জীবনদর্শন হিসেবে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি এটি সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে এটি কেবল প্রতিরোধের ভাষায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে—যা কোনো সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নিতে পারে না।