০৮:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
ব্রিটেনের রাজনীতিতে নতুন ভূমিকম্প নয়, দীর্ঘ অস্থিরতার নতুন অধ্যায় ভয় নয়, সতর্কতার সময়: হান্টাভাইরাস আতঙ্ক আমাদের কী শেখাচ্ছে ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট: যে আর্থিক উপহার কোটি শিশুর নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে পাকিস্তান পেল ১৩২ কোটি ডলার, আইএমএফ বোর্ডের অনুমোদন প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় পাকিস্তানি অভিনেত্রী উশনা শাহ পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর পর মমতার পতন, শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনে বিজয়ের অঙ্ক মিলছে না, রাজ্যপালের দরজায় তৃতীয় দফা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম মন্ত্রিসভায় জঙ্গলমহলের আদিবাসী নেতা ক্ষুদিরাম টুডু বিএসএফের গুলিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তে কলেজছাত্রসহ দুই বাংলাদেশি নিহত আসিয়ানকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সতর্ক করলেন প্রাবোও

গায়ে ছিল একই ট্যাটু, ছিলেন সহকর্মী- তখনো জানতেন না তারা বোন

জুলিয়া টিনেট্টি ও ক্যাসান্ড্রা ম্যাডিসনের মধ্যে অনেক মিল ছিল। একই বারে কাজ করতে গিয়ে পরিচয়ের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। কিন্তু তখন তারা কেউই জানতেন না, আসলে তারা কতটা কাছের মানুষ।

টিনেট্টি ও ম্যাডিসন দু’জনেই যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে ১৯৯০–এর দশকে বড় হয়েছেন।

ছোটবেলায় একে অপরকে না চিনলেও তারা মাত্র প্রায় ১৫ মিনিটের দূরত্বে থাকতেন, আর দু’জনই ছিলেন দত্তক নেওয়া সন্তান।

শৈশবে ম্যাডিসন প্রায়ই তার জন্মদাত্রী মা-কে নিয়ে ভাবতেন এবং একদিন তার সঙ্গে দেখা করার আকাঙ্ক্ষা বোধ করতেন। তিনি ভাবতেন, হয়তো তার হাসি বা চোখ তিনি মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন কি না।

তিনি জানতেন, তাকে জন্ম দেওয়া পরিবারটি ক্যারিবীয় অঞ্চলের ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে এসেছিল।

“তারা আমাকে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কারণ তারা খুব, খুব, খুবই গরিব ছিলেন এবং আমাকে বড় করার সামর্থ্য তাদের ছিল না,” বলেন ম্যাডিসন।

তরুণ বয়সে ম্যাডিসন তার জৈবিক পরিবারকে খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু তার কাছে কোনো জন্মসনদ ছিল না, আর তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ম্যাডিসন ১৯ বছর বয়সে তার বাহুতে ডোমিনিকান রিপাবলিকের পতাকার ট্যাটু করান, তার শিকড়ের কথা মনে রাখার জন্য।

“ডোমিনিকান হওয়া আমার জন্য গর্বের বিষয়,” তিনি বলেন।

পাঁচ বছর পর ম্যাডিসন একটি বারে ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানেই তিনি সহকর্মী টিনেট্টির সঙ্গে পরিচিত হন, যিনি ম্যাডিসনের বাহুতে আঁকা পতাকার ট্যাটুটি লক্ষ্য করেন।

কৌতূহল তৈরি হয়, কারণ টিনেট্টির শরীরেও ডোমিনিকান রিপাবলিকের পতাকার একটি ট্যাটু ছিল, তবে সেটি ছিল তার পিঠে। তিনি ২২ বছর বয়সে সেই ট্যাটুটি করিয়েছিলেন, যেখানে তিনি জন্মেছিলেন সেই জায়গার কথা মনে করে।

খুব শিগগিরই টিনেট্টি ও ম্যাডিসন বুঝতে পারেন, দু’জনকেই দত্তক নেওয়া হয়েছিল।

“আমি বলেছিলাম- হ্যাঁ, আমিও ওখান থেকেই দত্তক নেওয়া,” বলেন টিনেট্টি।

“আর (সে) বলল, ‘একটু দাঁড়াও, আমাকেও তো সেখান থেকেই দত্তক নেওয়া হয়েছিল’। তখন আমি একেবারে থমকে গেলাম”।

তারা লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন, “আপনাদের কি মনে হয় আমরা দেখতে একরকম?”

টিনেট্টির ভাষায়, “ওরা বলত- হ্যাঁ, তোমরা দু’জন দেখতে একরকম”।

অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ঠাট্টা করে লোকজনকে বলতে শুরু করেন যে, তারা বোন।

এমনকি ম্যাডিসন প্রস্তাবও দেন, তারা মিলিয়ে একরকম জামাকাপড় পরবেন, যাতে আরও সাদৃশ্য দেখা যায়।

জুলিয়া টিনেট্টি প্রথমবার তার বাবার সঙ্গে দেখা করে তাকে জড়িয়ে ধরছেন। তিনি কালো টপ ও জিন্স পরেছেন এবং ছবিটির দিকে তার পিঠ ফেরানো। তার বাবা সাদা টপ ও জিন্স পরা এবং তাকে শক্ত করে আলিঙ্গন করছেন।
বিমানবন্দরে পুনর্মিলনের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন, কারণ সেখানে পরিবারের অনেকে অপেক্ষা করছিলেন দুই বোনকে স্বাগত জানাতে

সবকিছুই ছিল মজা করে বলা কথা। কিন্তু একসময় তাদের মনে সত্যিই প্রশ্ন জাগে, আদৌ কি তারা আত্মীয় হতে পারেন?

তারা দত্তক নেওয়ার কাগজপত্র মিলিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেখানে এমন কিছুই পাওয়া যায়নি যা থেকে বোঝা যেতে পারে যে তারা বোন। কাগজে লেখা ছিল তারা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় জন্মেছেন এবং তাদের জন্মদাত্রী মায়েদের পদবিও আলাদা।

কিছু সময় পর তারা দুই জনই নতুন চাকরি পান এবং আলাদা জায়গায় চলে যান। টিনেট্টি কানেকটিকাটেই থাকেন, আর ম্যাডিসন অন্য রাজ্য ভার্জিনিয়ায় চলে যান।

তারা যোগাযোগ রাখলেও দূরত্বের কারণে আগের মতো ঘনিষ্ঠ থাকা সম্ভব হয়নি।

এর কয়েক বছর পর, বড়দিনের উপহার হিসেবে ম্যাডিসন একটি জেনেটিক টেস্টিং কিট পান। সেই পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি এক দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাইকে খুঁজে পান, যিনি তাকে জানান যে তার জন্মদাত্রী মা ২০১৫ সালে মারা গেছেন। এই খবর ছিল হৃদয়বিদারক।

তবে সেই চাচাতো ভাই তাকে পরিবারের আরও অনেক সদস্যের সন্ধান পেতে সাহায্য করেন, যার মধ্যে ছিলেন তার জন্মদাতা বাবাও।

ম্যাডিসনের চাচাতো ভাই তাকে জানান, শিশু বয়সে তার বাবা–মার সময়টা ছিল খুবই কঠিন। তিনি ম্যাডিসনের সঙ্গে তার জন্মদাতা বাবা আদ্রিয়ানো লুনা কোল্লাদোর ফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করেন।

দত্তক দেওয়ার সময় কী ঘটেছিল, তার কিছুটা ব্যাখ্যা দেন কোল্লাদো। তিনি বলেন, তাদের পরিবারটি এতটাই গরিব ছিল যে তারা মাটির মেঝেতে ঘুমাতেন।

ম্যাডিসনের মা যখন তার গর্ভবতী ছিলেন, তখন তার বড় ছেলে সন্তানটিও গুরুতর অসুস্থ ছিল। তখন পরিবারের টিকে থাকার একমাত্র উপায় হিসেবে ম্যাডিসনকে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তার বাবা।

শিগগিরই ম্যাডিসন ডোমিনিকান রিপাবলিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে শুরু করেন।

বিমানবন্দরে পুরো পরিবার তার জন্য অপেক্ষা করছিল, সবাই তার মুখের ছবি ছাপানো শার্ট পরে ছিল। ম্যাডিসন তার বাবার বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং দুই জনেই কাঁদতে শুরু করেন।

যাত্রাটি ছিল অসাধারণ। তবে বাড়ি ফেরার পর গল্পে আসে নতুন মোড়।

ম্যাডিসন ও টিনেত্তি তাদের বাবার ও এক শিশুর সঙ্গে বসে আছেন — শিশুটি ম্যাডিসনের মেয়ে। তারা সবুজ গাছপালার সামনে সারিবদ্ধভাবে বসে হাসছেন।
ম্যাডিসন ও টিনেট্টি তাদের জৈবিক বাবা এবং ম্যাডিসনের ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ছবিটি তোলেন; এমন এক বড় পরিবার তারা খুঁজে পেলেন, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে জানা ছিল না

মলি নামে একজন নারী ম্যাডিসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন টিনেট্টির সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তাদের বাবা–মা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডোমিনিকান রিপাবলিকে গিয়েছিলেন সন্তান দত্তক নিতে।

মলির ধারণা ছিল, তিনি ম্যাডিসনের জৈবিক বোন, কারণ তার জন্মসনদে ম্যাডিসনের জন্মদাত্রী মায়ের নামই লেখা ছিল। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, তারা বোন নন — কেবল দূর সম্পর্কের আত্মীয়; আর জন্মসনদে লেখা নামটিও ছিল ভুল।

তবে মলির কাছে ম্যাডিসনের জৈবিক মায়ের একটি ছবি ছিল, যা তার মতে দেখতে একেবারে টিনেট্টির মতো। সেই কারণেই তিনি জোর দিয়ে বলেন, আসলে ম্যাডিসন ও টিনেট্টিই বোন।

ক্যাসান্ড্রা ম্যাডিসন (বাঁয়ে) ও জুলিয়া টিনেট্টি (ডানে) মিলিয়ে পরা টি-শার্ট, কালো শর্টস ও সানগ্লাসে (বোনদের অবস্থান যাচাই করুন)
পরিবারের সদস্যরা “ওয়েলকাম টু ইওর ফ্যামিলি” লেখা টি-শার্ট পরে ম্যাডিসন ও টিনেট্টিকে স্বাগত জানান

ম্যাডিসন ভিডিও কলে তার জন্মদাতা বাবাকে জিজ্ঞেস করেন, তারা কি আর কোনো সন্তানকে দত্তক দিয়েছিলেন।

“তিনি এমনভাবে তাকালেন, যেন হঠাৎ সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন,” বলেন ম্যাডিসন।

“তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, দিয়েছিলাম’। আর আমি বললাম, ‘হে ঈশ্বর! আপনি তো কখনো আমাকে বলেননি’।”

এই নতুন তথ্য জানার পর ম্যাডিসনের মনে হলো, সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি আরেকটি জেনেটিক টেস্টিং কিট সংগ্রহ করেন এবং তুষারঝড়ের মধ্যে আট ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে টিনেট্টির কাছে যান।

পরীক্ষার ফল আসতে লাগে আড়াই সপ্তাহ। অপেক্ষার সময়টি ছিল দু’জনের জন্যই যন্ত্রণাদায়ক, তারা কেউই কাজে মন দিতে পারছিলেন না।

শেষমেশ ফল এলে টিনেট্টি বার্তাটি খোলেন। সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল, তিনি এবং ম্যাডিসন বোন।

“সত্যি বলতে, এটা পাগলামি,” বলেন টিনেট্টি।

“এতদিন ধরে আমরা বোন, অথচ আমরা নিজেরাই জানতাম না।”

ফল শুনে ম্যাডিসন কেঁদে ফেলেন। তিনি তাদের বাবাকে খবর দেন, যিনি দারুণ আনন্দিত এবং যত দ্রুত সম্ভব টিনেট্টির সঙ্গে দেখা করতে চান।

এরপর দুই বোন একসঙ্গে ডোমিনিকান রিপাবলিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেখানে পৌঁছানোর সময় আবারও পুরো পরিবার তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল — এবার সবার গায়ে দুই বোনের মুখ ছাপানো শার্ট।

তাদের বাবা এগিয়ে এসে টিনেট্টিকে বিশাল এক আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন, “মি হিহা”, স্প্যানিশ ভাষায় যার মানে – “আমার মেয়ে”।

বোন হিসেবে একসঙ্গে করা সেই প্রথম সফর ছিল আনন্দ, গান আর নাচে ভরা।

আদ্রিয়ানো লুনা কোল্লাদো বলেন, কন্যাদের সঙ্গে পুনর্মিলন তার জীবনে ঈশ্বরের দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।

“আমি খুব সুখী, সত্যিই সুখী। তারা যতবার আমাকে দেখতে আসে, আমার হৃদয় আনন্দে ভরে যায়। আমরা তাদের ভালোবাসা ও স্নেহ দিয়ে গ্রহণ করি, যেমন সব পরিবারেরই করা উচিত,” তিনি বলেন।

“এটা এক অসাধারণ গল্প। এমন গল্প সবাই বলতে পারে না”।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের আউটলুক অনুষ্ঠানের একটি পর্ব অবলম্বনে।

বিবিসি বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রিটেনের রাজনীতিতে নতুন ভূমিকম্প নয়, দীর্ঘ অস্থিরতার নতুন অধ্যায়

গায়ে ছিল একই ট্যাটু, ছিলেন সহকর্মী- তখনো জানতেন না তারা বোন

০৬:৫৩:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬

জুলিয়া টিনেট্টি ও ক্যাসান্ড্রা ম্যাডিসনের মধ্যে অনেক মিল ছিল। একই বারে কাজ করতে গিয়ে পরিচয়ের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। কিন্তু তখন তারা কেউই জানতেন না, আসলে তারা কতটা কাছের মানুষ।

টিনেট্টি ও ম্যাডিসন দু’জনেই যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে ১৯৯০–এর দশকে বড় হয়েছেন।

ছোটবেলায় একে অপরকে না চিনলেও তারা মাত্র প্রায় ১৫ মিনিটের দূরত্বে থাকতেন, আর দু’জনই ছিলেন দত্তক নেওয়া সন্তান।

শৈশবে ম্যাডিসন প্রায়ই তার জন্মদাত্রী মা-কে নিয়ে ভাবতেন এবং একদিন তার সঙ্গে দেখা করার আকাঙ্ক্ষা বোধ করতেন। তিনি ভাবতেন, হয়তো তার হাসি বা চোখ তিনি মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন কি না।

তিনি জানতেন, তাকে জন্ম দেওয়া পরিবারটি ক্যারিবীয় অঞ্চলের ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে এসেছিল।

“তারা আমাকে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কারণ তারা খুব, খুব, খুবই গরিব ছিলেন এবং আমাকে বড় করার সামর্থ্য তাদের ছিল না,” বলেন ম্যাডিসন।

তরুণ বয়সে ম্যাডিসন তার জৈবিক পরিবারকে খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু তার কাছে কোনো জন্মসনদ ছিল না, আর তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ম্যাডিসন ১৯ বছর বয়সে তার বাহুতে ডোমিনিকান রিপাবলিকের পতাকার ট্যাটু করান, তার শিকড়ের কথা মনে রাখার জন্য।

“ডোমিনিকান হওয়া আমার জন্য গর্বের বিষয়,” তিনি বলেন।

পাঁচ বছর পর ম্যাডিসন একটি বারে ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানেই তিনি সহকর্মী টিনেট্টির সঙ্গে পরিচিত হন, যিনি ম্যাডিসনের বাহুতে আঁকা পতাকার ট্যাটুটি লক্ষ্য করেন।

কৌতূহল তৈরি হয়, কারণ টিনেট্টির শরীরেও ডোমিনিকান রিপাবলিকের পতাকার একটি ট্যাটু ছিল, তবে সেটি ছিল তার পিঠে। তিনি ২২ বছর বয়সে সেই ট্যাটুটি করিয়েছিলেন, যেখানে তিনি জন্মেছিলেন সেই জায়গার কথা মনে করে।

খুব শিগগিরই টিনেট্টি ও ম্যাডিসন বুঝতে পারেন, দু’জনকেই দত্তক নেওয়া হয়েছিল।

“আমি বলেছিলাম- হ্যাঁ, আমিও ওখান থেকেই দত্তক নেওয়া,” বলেন টিনেট্টি।

“আর (সে) বলল, ‘একটু দাঁড়াও, আমাকেও তো সেখান থেকেই দত্তক নেওয়া হয়েছিল’। তখন আমি একেবারে থমকে গেলাম”।

তারা লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন, “আপনাদের কি মনে হয় আমরা দেখতে একরকম?”

টিনেট্টির ভাষায়, “ওরা বলত- হ্যাঁ, তোমরা দু’জন দেখতে একরকম”।

অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ঠাট্টা করে লোকজনকে বলতে শুরু করেন যে, তারা বোন।

এমনকি ম্যাডিসন প্রস্তাবও দেন, তারা মিলিয়ে একরকম জামাকাপড় পরবেন, যাতে আরও সাদৃশ্য দেখা যায়।

জুলিয়া টিনেট্টি প্রথমবার তার বাবার সঙ্গে দেখা করে তাকে জড়িয়ে ধরছেন। তিনি কালো টপ ও জিন্স পরেছেন এবং ছবিটির দিকে তার পিঠ ফেরানো। তার বাবা সাদা টপ ও জিন্স পরা এবং তাকে শক্ত করে আলিঙ্গন করছেন।
বিমানবন্দরে পুনর্মিলনের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন, কারণ সেখানে পরিবারের অনেকে অপেক্ষা করছিলেন দুই বোনকে স্বাগত জানাতে

সবকিছুই ছিল মজা করে বলা কথা। কিন্তু একসময় তাদের মনে সত্যিই প্রশ্ন জাগে, আদৌ কি তারা আত্মীয় হতে পারেন?

তারা দত্তক নেওয়ার কাগজপত্র মিলিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেখানে এমন কিছুই পাওয়া যায়নি যা থেকে বোঝা যেতে পারে যে তারা বোন। কাগজে লেখা ছিল তারা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় জন্মেছেন এবং তাদের জন্মদাত্রী মায়েদের পদবিও আলাদা।

কিছু সময় পর তারা দুই জনই নতুন চাকরি পান এবং আলাদা জায়গায় চলে যান। টিনেট্টি কানেকটিকাটেই থাকেন, আর ম্যাডিসন অন্য রাজ্য ভার্জিনিয়ায় চলে যান।

তারা যোগাযোগ রাখলেও দূরত্বের কারণে আগের মতো ঘনিষ্ঠ থাকা সম্ভব হয়নি।

এর কয়েক বছর পর, বড়দিনের উপহার হিসেবে ম্যাডিসন একটি জেনেটিক টেস্টিং কিট পান। সেই পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি এক দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাইকে খুঁজে পান, যিনি তাকে জানান যে তার জন্মদাত্রী মা ২০১৫ সালে মারা গেছেন। এই খবর ছিল হৃদয়বিদারক।

তবে সেই চাচাতো ভাই তাকে পরিবারের আরও অনেক সদস্যের সন্ধান পেতে সাহায্য করেন, যার মধ্যে ছিলেন তার জন্মদাতা বাবাও।

ম্যাডিসনের চাচাতো ভাই তাকে জানান, শিশু বয়সে তার বাবা–মার সময়টা ছিল খুবই কঠিন। তিনি ম্যাডিসনের সঙ্গে তার জন্মদাতা বাবা আদ্রিয়ানো লুনা কোল্লাদোর ফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করেন।

দত্তক দেওয়ার সময় কী ঘটেছিল, তার কিছুটা ব্যাখ্যা দেন কোল্লাদো। তিনি বলেন, তাদের পরিবারটি এতটাই গরিব ছিল যে তারা মাটির মেঝেতে ঘুমাতেন।

ম্যাডিসনের মা যখন তার গর্ভবতী ছিলেন, তখন তার বড় ছেলে সন্তানটিও গুরুতর অসুস্থ ছিল। তখন পরিবারের টিকে থাকার একমাত্র উপায় হিসেবে ম্যাডিসনকে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তার বাবা।

শিগগিরই ম্যাডিসন ডোমিনিকান রিপাবলিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে শুরু করেন।

বিমানবন্দরে পুরো পরিবার তার জন্য অপেক্ষা করছিল, সবাই তার মুখের ছবি ছাপানো শার্ট পরে ছিল। ম্যাডিসন তার বাবার বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং দুই জনেই কাঁদতে শুরু করেন।

যাত্রাটি ছিল অসাধারণ। তবে বাড়ি ফেরার পর গল্পে আসে নতুন মোড়।

ম্যাডিসন ও টিনেত্তি তাদের বাবার ও এক শিশুর সঙ্গে বসে আছেন — শিশুটি ম্যাডিসনের মেয়ে। তারা সবুজ গাছপালার সামনে সারিবদ্ধভাবে বসে হাসছেন।
ম্যাডিসন ও টিনেট্টি তাদের জৈবিক বাবা এবং ম্যাডিসনের ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ছবিটি তোলেন; এমন এক বড় পরিবার তারা খুঁজে পেলেন, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে জানা ছিল না

মলি নামে একজন নারী ম্যাডিসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন টিনেট্টির সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তাদের বাবা–মা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডোমিনিকান রিপাবলিকে গিয়েছিলেন সন্তান দত্তক নিতে।

মলির ধারণা ছিল, তিনি ম্যাডিসনের জৈবিক বোন, কারণ তার জন্মসনদে ম্যাডিসনের জন্মদাত্রী মায়ের নামই লেখা ছিল। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, তারা বোন নন — কেবল দূর সম্পর্কের আত্মীয়; আর জন্মসনদে লেখা নামটিও ছিল ভুল।

তবে মলির কাছে ম্যাডিসনের জৈবিক মায়ের একটি ছবি ছিল, যা তার মতে দেখতে একেবারে টিনেট্টির মতো। সেই কারণেই তিনি জোর দিয়ে বলেন, আসলে ম্যাডিসন ও টিনেট্টিই বোন।

ক্যাসান্ড্রা ম্যাডিসন (বাঁয়ে) ও জুলিয়া টিনেট্টি (ডানে) মিলিয়ে পরা টি-শার্ট, কালো শর্টস ও সানগ্লাসে (বোনদের অবস্থান যাচাই করুন)
পরিবারের সদস্যরা “ওয়েলকাম টু ইওর ফ্যামিলি” লেখা টি-শার্ট পরে ম্যাডিসন ও টিনেট্টিকে স্বাগত জানান

ম্যাডিসন ভিডিও কলে তার জন্মদাতা বাবাকে জিজ্ঞেস করেন, তারা কি আর কোনো সন্তানকে দত্তক দিয়েছিলেন।

“তিনি এমনভাবে তাকালেন, যেন হঠাৎ সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন,” বলেন ম্যাডিসন।

“তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, দিয়েছিলাম’। আর আমি বললাম, ‘হে ঈশ্বর! আপনি তো কখনো আমাকে বলেননি’।”

এই নতুন তথ্য জানার পর ম্যাডিসনের মনে হলো, সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি আরেকটি জেনেটিক টেস্টিং কিট সংগ্রহ করেন এবং তুষারঝড়ের মধ্যে আট ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে টিনেট্টির কাছে যান।

পরীক্ষার ফল আসতে লাগে আড়াই সপ্তাহ। অপেক্ষার সময়টি ছিল দু’জনের জন্যই যন্ত্রণাদায়ক, তারা কেউই কাজে মন দিতে পারছিলেন না।

শেষমেশ ফল এলে টিনেট্টি বার্তাটি খোলেন। সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল, তিনি এবং ম্যাডিসন বোন।

“সত্যি বলতে, এটা পাগলামি,” বলেন টিনেট্টি।

“এতদিন ধরে আমরা বোন, অথচ আমরা নিজেরাই জানতাম না।”

ফল শুনে ম্যাডিসন কেঁদে ফেলেন। তিনি তাদের বাবাকে খবর দেন, যিনি দারুণ আনন্দিত এবং যত দ্রুত সম্ভব টিনেট্টির সঙ্গে দেখা করতে চান।

এরপর দুই বোন একসঙ্গে ডোমিনিকান রিপাবলিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেখানে পৌঁছানোর সময় আবারও পুরো পরিবার তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল — এবার সবার গায়ে দুই বোনের মুখ ছাপানো শার্ট।

তাদের বাবা এগিয়ে এসে টিনেট্টিকে বিশাল এক আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন, “মি হিহা”, স্প্যানিশ ভাষায় যার মানে – “আমার মেয়ে”।

বোন হিসেবে একসঙ্গে করা সেই প্রথম সফর ছিল আনন্দ, গান আর নাচে ভরা।

আদ্রিয়ানো লুনা কোল্লাদো বলেন, কন্যাদের সঙ্গে পুনর্মিলন তার জীবনে ঈশ্বরের দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।

“আমি খুব সুখী, সত্যিই সুখী। তারা যতবার আমাকে দেখতে আসে, আমার হৃদয় আনন্দে ভরে যায়। আমরা তাদের ভালোবাসা ও স্নেহ দিয়ে গ্রহণ করি, যেমন সব পরিবারেরই করা উচিত,” তিনি বলেন।

“এটা এক অসাধারণ গল্প। এমন গল্প সবাই বলতে পারে না”।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের আউটলুক অনুষ্ঠানের একটি পর্ব অবলম্বনে।

বিবিসি বাংলা