যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর জন্য জন্মের পর থেকেই একটি বিনিয়োগ হিসাব—শুনতে হয়তো ভবিষ্যৎমুখী সামাজিক নীতির মতো লাগে। কিন্তু গত বছর কংগ্রেস যে উদ্যোগ নিয়েছিল, সেটি শুধু প্রতীকী নয়; এটি আমেরিকান সমাজে সম্পদ গঠনের ধারণাকেই বদলে দিতে পারত। ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুর জন্য সরকার ১ হাজার ডলার জমা রাখার যে “ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট” কর্মসূচি চালু করেছে, তা দীর্ঘমেয়াদে একটি শিশুর শিক্ষা, বাসস্থান কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার পথকে শক্তিশালী করার সম্ভাবনা রাখে।
সমস্যা হলো, যে কর্মসূচি মূলত বৈষম্য কমানোর কথা, সেটিই বাস্তবে নতুন বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে।
নীতিগতভাবে এই অ্যাকাউন্টগুলোর ধারণা অত্যন্ত শক্তিশালী। সরকার নির্দিষ্ট অর্থ জমা রাখবে, সেটি কর-সুবিধাপ্রাপ্ত বিনিয়োগ হিসেবে বড় হতে থাকবে, এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর শিশু সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারবে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভোগা পরিবারগুলোর জন্য এটি হতে পারত প্রজন্মগত দারিদ্র্য ভাঙার একটি কার্যকর উপায়।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই সুযোগ পাওয়ার জন্য পরিবারগুলোকে নিজে থেকে নিবন্ধন করতে হচ্ছে। আয়কর ফরম পূরণ করতে হবে, আলাদা ওয়েবসাইটে যেতে হবে, পরিচয় যাচাইয়ের ধাপ পেরোতে হবে। নীতিনির্ধারকদের কাছে এগুলো হয়তো সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু নিম্নআয়ের পরিবার, আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে অপরিচিত মানুষ কিংবা সময়-সংকটে থাকা অভিভাবকদের জন্য এগুলোই হয়ে দাঁড়ায় বড় বাধা।
সামাজিক নীতির ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, “অপ্ট-ইন” ভিত্তিক কর্মসূচি প্রায় সব সময়ই সেই মানুষদের বাদ দেয়, যাদের জন্য নীতিটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্যের “মাই অ্যালফন্ড গ্রান্ট” কর্মসূচিতে প্রথমদিকে পরিবারগুলোকে নিজে নিবন্ধন করতে হতো। ফলে মাত্র ৪০ শতাংশ শিশু অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পরে যখন নিবন্ধন স্বয়ংক্রিয় করা হয়, অংশগ্রহণ এক লাফে ১০০ শতাংশে পৌঁছে যায়।

এখানেই মূল শিক্ষা: মানুষকে সুযোগ দেওয়া যথেষ্ট নয়; সেই সুযোগকে সহজলভ্যও করতে হয়।
ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট কর্মসূচির বর্তমান চিত্রও একই সংকেত দিচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ২ কোটি ৫০ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নিলেও কর মৌসুম শেষে নিবন্ধিত হয়েছে মাত্র প্রায় ৫০ লাখ শিশু। অথচ যোগ্য শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ। অর্থাৎ, কোটি কোটি শিশু ইতিমধ্যেই পিছিয়ে পড়ছে—এবং তাদের বড় অংশই সেই পরিবার থেকে আসছে, যাদের জন্য এই কর্মসূচির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
এখানে প্রশ্ন শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি রাজনৈতিক দর্শনেরও প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র কি সম্পদ সৃষ্টির সুযোগকে সার্বজনীন অধিকার হিসেবে দেখবে, নাকি এমন সুবিধা হিসেবে রাখবে, যা কেবল সচেতন, সংগঠিত এবং তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল পরিবারগুলোই ব্যবহার করতে পারবে?
সমাধান অবশ্য জটিল নয়। সরকার চাইলে সামাজিক নিরাপত্তা বিভাগের জন্ম-তথ্য ব্যবহার করে প্রতিটি যোগ্য শিশুর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাকাউন্ট খুলে দিতে পারে। পরিবার চাইলে পরে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু শুরুটা হওয়া উচিত “অন্তর্ভুক্তি” দিয়ে, “আবেদন” দিয়ে নয়।
এ ধরনের মডেল নতুনও নয়। ওকলাহোমায় দীর্ঘমেয়াদি শিশু সঞ্চয় প্রকল্পে স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করেছে। পরে মেইন, পেনসিলভানিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়াও একই পথ অনুসরণ করেছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও এসব অঙ্গরাজ্য একটি বিষয়ে একমত হয়েছে—যখন সরকার নিজে উদ্যোগ নিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়, তখন প্রায় সবাই অংশ নেয়।
তবে আরেকটি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এই অ্যাকাউন্টগুলোকে যদি প্রচলিত অবসরভিত্তিক বিনিয়োগ হিসাবের মতো বিবেচনা করা হয়, তাহলে তা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ অনেক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সম্পদের সীমা নির্ধারিত থাকে। ফলে যে অ্যাকাউন্ট একটি শিশুর আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তোলার জন্য তৈরি, সেটিই ভবিষ্যতে তাকে সরকারি সহায়তা পাওয়ার অযোগ্য করে দিতে পারে।
এটি এক ধরনের নীতিগত বৈপরীত্য—রাষ্ট্র এক হাতে সম্পদ গঠনের সুযোগ দিচ্ছে, অন্য হাতে সেই সম্পদকেই শাস্তির কারণ বানাচ্ছে।
ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট কর্মসূচির ভবিষ্যৎ তাই শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক প্রশ্নও তৈরি করছে। যদি একটি সমাজ সত্যিই চায় যে জন্মপরিস্থিতি কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করুক, তাহলে তাকে এমন কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে সুযোগ গ্রহণের জন্য অতিরিক্ত দক্ষতা, সময় বা আর্থিক সচেতনতার প্রয়োজন না পড়ে।
অন্যথায়, এই কর্মসূচিও শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো বাস্তবতাই পুনরাবৃত্তি করবে—যেখানে সুবিধা সবার নামে ঘোষণা করা হয়, কিন্তু বাস্তবে পৌঁছে যায় কেবল অল্প কয়েকজনের হাতে।
জিন হুয়াং ও স্টিফেন রোল 



















