যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরকে সামনে রেখে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দুই দেশের নেতারা প্রকাশ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার বার্তা দিলেও পর্দার আড়ালে চলছে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংঘাতের প্রস্তুতি। বিশেষ করে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও নিষেধাজ্ঞা ঘিরে দুই পরাশক্তির পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বেইজিং একাধিক পদক্ষেপ নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা আর যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে ভয় পাচ্ছে না। চীন নতুন আইনি কাঠামো ব্যবহার করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর নিয়ম চালু করেছে, যারা পশ্চিমা বিশ্বের চীনবিরোধী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের সরবরাহ ব্যবস্থা সরিয়ে নিতে চাইছে।
অর্থনৈতিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা
গত এক বছরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক চাপ ও পাল্টা চাপ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে, পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর, রাসায়নিক ও যন্ত্রপাতির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি খাতে বিধিনিষেধ জারি করেছে। এর জবাবে চীনও বিরল খনিজ, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশ এখন শুধু নিজেদের মধ্যে সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও অন্যান্য দেশগুলোকেও পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কঠিন চাপে পড়ছে।
বিদেশি কোম্পানির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে চীন
এপ্রিল মাসে বেইজিং এমন কিছু নিয়ম চালু করেছে, যার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র তদন্ত করতে পারবে, কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে এবং প্রয়োজনে কর্মকর্তাদের দেশত্যাগে বাধা দিতে পারবে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান চীনের বাইরে সরবরাহ চেইন স্থানান্তরে সহযোগিতা করবে, তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য সরবরাহকারী অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম বা মেক্সিকোর মতো দেশে উৎপাদন সরিয়ে নিচ্ছে। আবার কেউ কেউ বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করছে, যাতে ভবিষ্যতের বাণিজ্য ঝুঁকি কমানো যায়।
![]()
তুলা ও জিনজিয়াং ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা
চীনের কঠোর অবস্থানের একটি উদাহরণ দেখা যায় মার্কিন পোশাক ব্র্যান্ড মালিক প্রতিষ্ঠান পিভিএইচকে ঘিরে। প্রতিষ্ঠানটি জিনজিয়াং অঞ্চল থেকে তুলা সংগ্রহ বন্ধ করার পর চীন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে এবং পরে “অবিশ্বস্ত সত্তা তালিকায়” যুক্ত করে। যুক্তরাষ্ট্র জিনজিয়াংয়ের তুলার সঙ্গে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ জড়িত থাকার কারণে ওই অঞ্চলের তুলা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন বিদেশি কোম্পানিগুলো এমন এক পরিস্থিতিতে পড়ছে যেখানে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—তারা মার্কিন আইন মানবে নাকি চীনের আইন অনুসরণ করবে।
নিষেধাজ্ঞা ঘিরে পাল্টা শক্তি প্রদর্শন
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে পাঁচটি চীনা তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর জবাবে চীন সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার নির্দেশ দেয় এবং ২০২১ সালে প্রণীত একটি আইনি ব্যবস্থা সক্রিয় করে। চীনা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বড় প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরেছে।
চীনের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও বাণিজ্য সুরক্ষাবাদ এখন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হয়েছে। দেশটির অর্থনীতি রক্ষায় বেইজিং তাই দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও কৌশলগত প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্প-শি বৈঠককে তাই শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















