০৭:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

ইরানে আবার যুদ্ধের শঙ্কা, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় তেহরানের পথে সাধারণ মানুষ

ইরানে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা থমকে যাওয়ার পর আবারও নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। রাজধানী তেহরানের পথে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন স্পষ্ট উদ্বেগ, আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা। সীমান্ত এলাকা থেকে রাজধানীর দিকে যাওয়া সড়কে যুদ্ধের ক্ষত, অর্থনৈতিক সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার চিত্র আরও পরিষ্কার হয়ে উঠছে।

তাবরিজের কাছাকাছি অঞ্চলজুড়ে এখনও ধ্বংসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। কোথাও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও অবকাঠামো আংশিক ভেঙে পড়েছে। যদিও কিছু এলাকা তুলনামূলক অক্ষত রয়েছে, তবুও মানুষের মুখে যুদ্ধ ফের শুরু হওয়ার আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে।

এক তরুণী, যিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেহরানে নিজের পরিবারের কাছে ফিরছিলেন, বলেন পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও পরিবারের জন্য তিনি এই যাত্রা করছেন। অনেক সাধারণ ইরানির মধ্যেই একই ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। তারা মনে করছেন পরিস্থিতি যেকোনো সময় আবারও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে।

নেতৃত্ব সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিকে নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও তিনি এখনো প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা দিয়েছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও সংশয় আরও বাড়ছে।

সড়কের পাশে বড় বড় পোস্টারে পুরনো নেতৃত্বকে স্মরণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনার চেষ্টা চলছে। তবে সাধারণ মানুষ বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে তাদের কাছে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া।

অর্থনৈতিক সংকটে চাপে সাধারণ মানুষ

যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তুরস্ক সীমান্ত এলাকা থেকে মানুষ রান্নার তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বহন করে নিয়ে আসছেন। কারণ প্রতিবেশী দেশে যেসব পণ্য তুলনামূলক সস্তা, ইরানে সেগুলোর দাম কয়েকগুণ বেশি।

দ্রব্যমূল্যের এই চাপ গত বছর শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছিল। পরে কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে সেই আন্দোলন থামানো হয়। বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও সামনে আসে। যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সমাজে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

রাজধানীর পথে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও বিশ্রামকেন্দ্রে দেখা গেছে অনেক নারী বাধ্যতামূলক হিজাব ছাড়াই চলাফেরা করছেন। এটি কয়েক বছর আগে শুরু হওয়া নারী অধিকার আন্দোলনের প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমাজে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিললেও যুদ্ধের ভয় এখন সবকিছুর ওপর বড় ছায়া ফেলেছে।

একজন ইরানি বাবা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মানুষ প্রতিবাদের কথা ভাবছেন না। তাদের প্রধান চিন্তা পরিবারকে নিরাপদ রাখা এবং প্রতিদিনের জীবন চালিয়ে নেওয়া। তার মতে, যুদ্ধের চাপ মানুষের কণ্ঠকে অনেকটাই নীরব করে দিয়েছে।

চীনকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক হিসাব

এই সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুপক্ষই চীনের দিকে তাকিয়ে আছে। পারস্য উপসাগরে তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

যদিও যুদ্ধবিরতির আলোচনা এখনো অনিশ্চিত, তবুও সাধারণ ইরানিদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—দেশে কি আবারও বোমা হামলা শুরু হবে, নাকি অবশেষে শান্তির পথ খুলবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে আবার যুদ্ধের শঙ্কা, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় তেহরানের পথে সাধারণ মানুষ

০৫:২৩:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

ইরানে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা থমকে যাওয়ার পর আবারও নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। রাজধানী তেহরানের পথে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন স্পষ্ট উদ্বেগ, আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা। সীমান্ত এলাকা থেকে রাজধানীর দিকে যাওয়া সড়কে যুদ্ধের ক্ষত, অর্থনৈতিক সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার চিত্র আরও পরিষ্কার হয়ে উঠছে।

তাবরিজের কাছাকাছি অঞ্চলজুড়ে এখনও ধ্বংসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। কোথাও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও অবকাঠামো আংশিক ভেঙে পড়েছে। যদিও কিছু এলাকা তুলনামূলক অক্ষত রয়েছে, তবুও মানুষের মুখে যুদ্ধ ফের শুরু হওয়ার আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে।

এক তরুণী, যিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেহরানে নিজের পরিবারের কাছে ফিরছিলেন, বলেন পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও পরিবারের জন্য তিনি এই যাত্রা করছেন। অনেক সাধারণ ইরানির মধ্যেই একই ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। তারা মনে করছেন পরিস্থিতি যেকোনো সময় আবারও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে।

নেতৃত্ব সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিকে নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও তিনি এখনো প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা দিয়েছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও সংশয় আরও বাড়ছে।

সড়কের পাশে বড় বড় পোস্টারে পুরনো নেতৃত্বকে স্মরণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনার চেষ্টা চলছে। তবে সাধারণ মানুষ বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে তাদের কাছে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া।

অর্থনৈতিক সংকটে চাপে সাধারণ মানুষ

যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তুরস্ক সীমান্ত এলাকা থেকে মানুষ রান্নার তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বহন করে নিয়ে আসছেন। কারণ প্রতিবেশী দেশে যেসব পণ্য তুলনামূলক সস্তা, ইরানে সেগুলোর দাম কয়েকগুণ বেশি।

দ্রব্যমূল্যের এই চাপ গত বছর শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছিল। পরে কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে সেই আন্দোলন থামানো হয়। বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও সামনে আসে। যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সমাজে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

রাজধানীর পথে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও বিশ্রামকেন্দ্রে দেখা গেছে অনেক নারী বাধ্যতামূলক হিজাব ছাড়াই চলাফেরা করছেন। এটি কয়েক বছর আগে শুরু হওয়া নারী অধিকার আন্দোলনের প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমাজে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিললেও যুদ্ধের ভয় এখন সবকিছুর ওপর বড় ছায়া ফেলেছে।

একজন ইরানি বাবা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মানুষ প্রতিবাদের কথা ভাবছেন না। তাদের প্রধান চিন্তা পরিবারকে নিরাপদ রাখা এবং প্রতিদিনের জীবন চালিয়ে নেওয়া। তার মতে, যুদ্ধের চাপ মানুষের কণ্ঠকে অনেকটাই নীরব করে দিয়েছে।

চীনকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক হিসাব

এই সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুপক্ষই চীনের দিকে তাকিয়ে আছে। পারস্য উপসাগরে তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

যদিও যুদ্ধবিরতির আলোচনা এখনো অনিশ্চিত, তবুও সাধারণ ইরানিদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—দেশে কি আবারও বোমা হামলা শুরু হবে, নাকি অবশেষে শান্তির পথ খুলবে।