০৮:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংকের টানা ডলার কেনা, বাড়ছে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি ব্যাংককের রাস্তা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে খাবারের ঠেলাগাড়ি, বদলে যাচ্ছে নগর জীবনের চিত্র ট্রাম্পের ‘পারস্পরিকতা’ আসলে নতুন বাণিজ্য একতরফাবাদ ছোলার সালাদেই কি বদলে যাবে গ্রীষ্মের টেবিলের চেনা স্বাদ? মরক্কোতে নিখোঁজ মার্কিন সেনার মরদেহ উদ্ধার, শেষ হলো দীর্ঘ অনুসন্ধান অভিযান ট্রাম্প যুগের রাজনীতি, ব্রিটেনের সংকট ও আমেরিকার নতুন বিভাজন থাইল্যান্ডের শেয়ারবাজারে বড় পরিবর্তন, কড়াকড়ি বাড়ছে স্বল্পমেয়াদি লেনদেনে ভারতের শিক্ষাবিপ্লব: এআই যুগে বহুভাষিক দক্ষতায় গড়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দৌড়ে বিপুল বিনিয়োগে আলিবাবা-টেনসেন্ট কানাডার বিনিয়োগে ফিলিপাইনে নতুন অর্থনৈতিক করিডর, বাড়ছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় জোট

কঠিন সময়ে কেমন বাজেট আসছে

অধ্যাপক ইউনূসের অন্তবর্তী সরকার দেশে উচ্চ মুল্যস্ফীতির এক ফোকলা অর্থনীতি রেখে গেছে। শুধু ফোকলা অর্থনীতিই নয়নব নির্বাচিত তারেক রহমানের বিএনপি সরকারকে দায়িত্ব নিয়েই পড়তে হয়েছে ইরাক যুদ্ধের এক বৈশ্বিক চাপের মধ্যে। বিশেষ করেআন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেলের উচ্চমূল্য ক্রমবর্ধমান মুল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে। অর্থনীতির এমন কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই প্রথম বাজেট দিতে হচ্ছে বিএনপি সরকারকে। এই বাজেট প্রদানকে কেন্দ্র করে সরকারের সামনে নানামুখী চ্যালেঞ্জ এসে ভীড় করেছে। একদিকে উচ্চ মুল্যস্ফীতিবেকারত্ববিনিয়োগে স্থবিরতাআইএমএফের সংস্কারের চাপ এবং চরম অর্থ সংকটঅন্যদিকে নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের পাহাড় সমান প্রত্যাশা। অর্থনীতির এই অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কেমন বাজেট দিতে যাচ্ছেন সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় অর্থমন্ত্রীর সামর্থ সীমিত। তার ওপর ইরান যুদ্ধ সেই সামর্থকে আরও সংকীর্ণ করে তুলেছে। সেই অবস্থায় অর্থমন্ত্রীর বাজেট পরিকল্পণা কতটা বাস্তবসম্মত বা বাস্তবায়নযোগ্য হবেসেই প্রশ্নও সমানে আছে। বিশেষ করেঅর্থ সংকটের মধ্যে এই প্রশ্নগুলো বড় করে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থমন্ত্রী কোন পথে হাটছেন আমাদের বাজেটের দুটি অংশ থাকে। একটি রাজস্ব বাজেটঅপরটি উন্নয়ন বাজেট। ইতোমধ্যে উন্নয়ন বাজেট চূড়ান্ত হয়েছে। উন্নয়ন বাজেটে দেখা যাচ্ছেআগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরেরর জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সংশোধিত আকার ছিল ২ লাখ কোটি টাকা। এক লাফে এক লাখ কোটি টাকা বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরের এডিপির আকার করা হয়েছে তিন লাখ কোটি। এতেই বুঝা যায়সরকার অন্তবর্তী সরকারের সংকোচন বা সাশ্রয়ের বাজেট বাদ দিয়ে প্রবৃদ্ধিভিত্তিক সম্প্রসারণ বাজেটের দিকে যাচ্ছে। তাতে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা যাচ্ছেআগামী অর্থবছরে ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার আকার ধরে বাজেট পরিকল্পনার ছক কষছে অর্থ বিভাগ। বর্তমান রাজনৈতিক সরকার অতীতের রাজনৈতিক সরকারের মতোই বাজেট দিতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেট হতে যাচ্ছে প্রবৃদ্ধিমুলক ও কর্মসংস্থানমুখী। বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটাতে যে সরকারের এই উদ্যোগ তাতে কোন সন্দেহ নেই। উচ্চ মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আইএমএফের পরামর্শে গত তিন বছর ধরেই বাংলাদেশে সংকোচনমুলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছি। বিশেষ করেঅন্তবর্তী সরকার এসে কঠোর সংকোচনমুলক পথে হাটে। কিন্তু তাতে মুল্যস্ফীতি তেমন নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আইএমএফের প্রেসক্রিপশন যে সব দেশে খাটে না তা বাংলাদেশে আবারো প্রমাণিত হয়েছে।

এ কারণেই বিএনপি সরকার এই পথে না হেটে ভিন্ন পথে হাটতে চাইছে। আর মুল্যস্ফীতি বিষয়টি অতীতের রাজনৈতিক সরকারের মডেল অনুযায়ী ভিন্ন পথে অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। আর প্রথম বাজেটেই বড় ধরণের কোন সংস্কারে যাচ্ছেন না অর্থমন্ত্রী। প্রথম বাজেট দেয়ার পর ঘাটতিগুলো পর্যবেক্ষণ কওে তার ভিত্তিতে সংস্কারে করা হবে। অর্থ সচিব ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যদিয়েই আসন্ন বাজেটের এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে। অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেছেন, “বাজেটের আকার বড় হয়ে যাচ্ছে। আসলে গত তিন বছর ধরে সংকোচনমূলক বাজেট করছি। এটার একটা বড় সমস্যা হলো যে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের নীতি নিলে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটা কাঠামোগত দুর্বলতা দেখা দেয়। এবং প্রবৃদ্ধিটা আবার নিম্নগতির দিকে আসার সম্ভাবনা থাকে। এই একটা বড় চিন্তা আমাদের মাথায় আছে। দ্বিতীয় বিষয়টা হলো যে- সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার।” তার ভাষ্যমূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর জন্য টার্গেটেড সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রাম’ নেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেন। এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে যারা উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বেশি চাপে পড়েছে তাদের সহায়তা করা হবে। স্বাস্থ্য-শিক্ষায় জিডিপির বিচারে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি মূলধনি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘শিল্পের ক্ষেত্রে যে অন্য আনুষঙ্গিক পরিবেশের অভাব আছে যার জন্য বেসরকারি খাতে অর্থায়ন কমে যাচ্ছেসেটাও দূর হবে না। এই সার্বিক চিন্তা থেকেই বাজেটকে বড় করছি।’ বাজেটের আকার বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির ট্রেনে আবার সরকারের উঠে পড়ার চিন্তাভাবনার বিষয়টির আভাস পাওয়া যায় তার বক্তব্যে। বিনিয়োগকে গতিশীল করতেও তা ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সরকারের ব্যয় বাড়াতে গিয়ে টাকা ছাপানো হবে না বলে সরকারের অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু। বলেন, ‘টাকা ছাপানোহাই পাওয়ার মানি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদের যে বড় বড় ঋণ- এটা এড়িয়ে চলা আমাদের এক নম্বর অগ্রাধিকার। আমরা চেষ্টা করছি।’ আর বাজেটের আকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনি যদি দেশের প্রবৃদ্ধি চানআপনি যদি বিনিয়োগ চান আপনাকে তো বাজেট বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। বাজেট বাড়ানো ছাড়া দেশেরতো প্রবৃদ্ধি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যেতো বাজেট দিতে হবে।

শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ছে ৫২৮৭ কোটি টাকা

শিক্ষায় বাজেট দিতে হবে। আপনি যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা সবসময় বলে আসছেন- কোনো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সফল করতে হলে সবার আগে বিনিয়োগ করতে হবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়।’ বাজেট কাঠামো আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের আকার বাড়ছে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকাযা চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত এডিপির তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকাযা সংশোধন করে ২ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ কোটি টাকা। ফলে গত বছরের তুলনায় এডিপির আকার বেড়েছে ৫০ শতাংশ। নতুন এডিপিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে এডিপি বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। ফলে এক অর্থবছরের ব্যবধানে খাতটিতে এডিপি বরাদ্দ বাড়ছে ৯ হাজার কোটি টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণায় জানায়প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বরাবরের মতো এবারও বেশি বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ৩৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ প্রায় ৩২ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ পেয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এছাড়া আসন্ন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রায় ১৬ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকামাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রায় ১৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকানৌপরিবহন মন্ত্রণালয় প্রায় ১১ হাজার ৩১৯ কোটি টাকাপানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রায় ৯ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা আর কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপির ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যেই বড় এডিপি দিয়েছে সরকার। এর পেছনে যুক্তি হিসাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেনসরকার ১ টাকা বিনিয়োগ করলে বেসরকারিখাত এর কয়েকগুণ বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। ফলে বেসরকারিখাতে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার বেড়ে ২৪.৯ শতাংশে উন্নীত হবে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এডিপির আকার বাস্তবায়নযোগ্য নয়’ দাবি করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, ‘একটা প্রেক্ষাপটের আচমকা পরিবর্তন ঘটেছে। বাজেট যে প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছে তার গুরুত্ব বিবেচনার বিষয়। ওভারঅল বাজেট কত হওয়া উচিতএডিপির আকার কত হওয়া উচিতএগুলো বিবেচনার বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিঅন্যদিকে উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্বল প্রবৃদ্ধি। যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছেজ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়ছে। বাইরের একটা শকড আছে। এর সঙ্গে আমাদের খাপ খাওয়াতে হবে। প্রথম কথা হলোএ ধরনের পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। কতটা সাশ্রয়ী হতে হবেকীভাবে সাশ্রয়ী হতে হবে তা সময়ের দাবি। সবকিছু বিবেচনায় বাজেটের এই আকার মিলছে নাএডিপির আকার মিলছে না।’ বাজেট সামনে রেখে বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা। এ লক্ষ্যে নতুন বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের অতি উচ্চাভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে অর্থবিভাগ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকাযা সংশোধন করে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে শেষ পর্যন্ত ৪ লাখ কোটি টাকা আদায় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছেরাজস্ব আয়ের এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় অতীতে এনবিআর নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এবার কঠোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়কে মোট দেশজ উৎপাদনের ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছেযা পূরণের জন্যই এই উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় ও আয়ের এই কাঠামোর ভিত্তিতে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকাযা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৯ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রণীত এ বাজেটে দারিদ্র্য নিরসনকর্মসংস্থান সৃষ্টিমানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজেটকে বাস্তবসম্মত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নযোগ্য করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত দেশে মোট ৫৪টি জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছেআর সেই ধারাবাহিকতায় সদ্য রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করা বিএনপি সরকার এবার দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। আর আগামী বাজেট হবে বিএনপি সরকারের জন্য ১৫তম বাজেট। এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে ১১ জুনবৃহস্পতিবার বেলা ৩টায়। টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশের অর্থনীতির চরম এক দুঃসময়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। এর আগে সর্বশেষ ২০০৫-০৬ অর্থবছরের জন্য মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিলেন সে সময়ের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমান। এই মুহর্তে সরকারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো। ব্যাংক খাতের অচলাবস্থা কাটিয়ে এখানে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্যবসাবাণিজ্যে অস্থিরতা ও মন্দাবস্থা কাটিয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। নিত্যপণ্যের বাজারে অরাজকতা বন্ধ করা। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। এত সব অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে একটি স্বস্তিদায়ক বাজেট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। সরকারের বাস্তবায়ন সামর্থ্য উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সরকারকে তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে দেখা গেছে। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড দেওয়াকৃষি ঋণ মওকুফের পদক্ষেপ নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। আরও বেশ কিছু প্রণোদনা দিচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনী বাড়ানোর কথাও আসছে। এসব পদক্ষেপে প্রান্তিক মানুষের উপকার হলেও এগুলো মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। আবার এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থের দরকার। কিন্তু অর্থের জোগানই এখন বাজেট বাস্তবায়ন ও নতুন বাজেট করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় সমস্যা আকারে হাজির হচ্ছে এবারও। অর্থের জোগান পরিকল্পনায় সেই এনবিআরের ওপরই ভরসা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের অতি উচ্চাভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে অর্থবিভাগ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেনচলতি অর্থবছরের নয় মাস শেষে বিশাল ঘাটতির পরও যদি এনবিআর ৪ লাখ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয় তাহলে আগামী অর্থবছরে কর আদায়কারী এ সংস্থার ওই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে। এটি আদতে সম্ভব না। আসছে করের বাড়তি চাপ রাজস্ব ঘাটতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশের কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলাআন্তর্জাতিক ঋণচাপ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনসব মিলিয়ে সরকার এবার কর আহরণ বাড়াতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। তবে সেই আহরণ কাঠামো কীভাবে সাজানো হচ্ছেসেটিই এখন বড় প্রশ্ন। রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছেন তিনি ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করতে চান। এতেই বোঝা যায়প্রত্যক্ষ করের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে আয়ভিত্তিক কর থেকে ভোগভিত্তিক করের দিকে একটি স্পষ্ট ঝোঁক তৈরি হচ্ছেযার প্রভাব পড়বে সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষের ওপর। প্রস্তাবিত কর কাঠামোর সবচেয়ে আলোচিত দিক হলোউত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর কর আরোপের উদ্যোগ। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ীকেউ যদি এক টাকার সম্পদও উত্তরাধিকার হিসেবে পানতাতেও কর দিতে হবে। যদিও এক টাকার নিচে প্রাপ্ত সম্পদের ক্ষেত্রে কর প্রযোজ্য হবে নাকিন্তু এই সীমা অতিক্রম করলেই করের আওতায় পড়তে হবে। ফলে কার্যত ভিক্ষুক বা সম্পদহীন মানুষ ছাড়া প্রায় সবাই করের আওতায় চলে আসবেন। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কৃষকশ্রমিকদিনমজুরকারও জন্যই কোনও বিশেষ ছাড় থাকছে নাযদি তারা উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ পান। অর্থাৎ কর ব্যবস্থায় একটি সর্বজনীনতার ধারা তৈরি হচ্ছেযেখানে সম্পদের মালিকানা থাকলেই কর দিতে হবেতা যতই সামান্য হোক না কেন। উত্তরাধিকার করের ক্ষেত্রে দুটি শ্রেণি নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছেযথা নিকটাত্মীয় ও দূরসম্পর্কের আত্মীয়। নিকটাত্মীয়ের ক্ষেত্রে (মাবাবাভাইবোন) ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ শতাংশপরবর্তী ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ২ শতাংশ। পরবর্তী ধাপে ৩ শতাংশউচ্চ স্তরে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ। দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের ক্ষেত্রে: ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ৩ শতাংশপরবর্তী ৫ কোটি টাকা ৫ শতাংশএরপর ৭ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ স্তরে ১০ শতাংশ। এই কর হিসাব করা হবে সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে। এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন এক জটিলতা। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই সম্পদের ঘোষিত মূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকে। ফলে কর নির্ধারণে কর কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বেযা হয়রানি বা স্বেচ্ছাচারিতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাককোনও ব্যক্তি জীবদ্দশায় ১০ লাখ টাকার একটি সম্পদের মালিক ছিলেন। মৃত্যুর পর দেখা গেলো সেই সম্পদের বাজারমূল্য বেড়ে এক কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এখন উত্তরাধিকারী সেই সম্পদ পাওয়ার সময় তাকে ১ শতাংশ হারে এক লাখ টাকা কর দিতে হবে। যদি একাধিক উত্তরাধিকারী থাকেতাহলে প্রত্যেককে তাদের অংশ অনুযায়ী কর দিতে হবে। এই ধরনের কর কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সম্পদ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় একটি নতুন আর্থিক চাপ তৈরি হবেযা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই উত্তরাধিকার কর চালু রয়েছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রযুক্তরাজ্যজার্মানি ও জাপান। তবে কিছু দেশ এই কর বাতিলও করেছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছেএই খাত থেকে রাজস্ব আসে তুলনামূলক কম। তবে সম্পদবৈষম্য কমাতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে এই কর চালু হলে কয়েক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর সামাজিক প্রভাব কী হবেসেটিই বড় প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেনকর আহরণ বাড়ানো জরুরি হলেও তা হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। তাদের সুপারিশ হলোএকটি নির্দিষ্ট করমুক্ত সীমা (থ্রেশহোল্ড) নির্ধারণ। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা। কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ডিজিটাল কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। উল্লেখ্যদেশে আগেও সম্পদ কর চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালে ওই সম্পদ কর বাতিল করে সারচার্জ চালু করা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমানের দাবিসম্পদ কর নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারও সম্পদ থেকে আয় না হলে আয়করও শূন্যসম্পদ করও শূন্য হবে। পাশাপািশ দেশের অতি ধনীদের ওপর আয়করের হার আরও বাড়তে যাচ্ছে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ করহার বিদ্যমান ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আবশ্য ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে এই নতুন কর হার কার্যকর হতে পারে। এছাড়া ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংকে বার্ষিক জমার ওপর বিদ্যমান আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)যা বর্তমানে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। স্বল্প অঙ্কের আমানতকারীদের করের বোঝা থেকে কিছুটা রেহাই দিতে আগামী বাজেটে সরকার এই শুল্ক অব্যাহতি দিতে পারে। বর্তমানে ৩ লাখ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক রয়েছে ১৫০ টাকা। পরোক্ষ করের বিস্তার কর কাঠামোর আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে পরোক্ষ করের বিস্তার। পরোক্ষ কর এমন একটি ব্যবস্থাযেখানে কর সরাসরি আয়ের ওপর নয়বরং পণ্য ও সেবার ভোগের ওপর আরোপ করা হয়।

Breaking down the FY2024-25 education budget | The Daily Star

ফলে একজন ধনী ব্যক্তি ও একজন দরিদ্র ব্যক্তি একই পণ্য কিনলে একই হারে কর দেন। এখানেই তৈরি হয় বৈষম্য। কারণ দরিদ্র মানুষের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় ভোগেফলে তাদের আয়ের তুলনায় করের বোঝা বেশি হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারেএক কেজি দুধের দাম ৫০ টাকাএর ওপর ১০ টাকা ভ্যাট আরোপ করা হলে ক্রেতাকে ৬০ টাকা দিতে হবে। এই অতিরিক্ত ১০ টাকা সবার জন্য সমান হলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি তুলনামূলক বড় চাপ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছেবাংলাদেশে পরোক্ষ কর কাঠামো কার্যত প্রত্যাবর্তনশীল (রিগ্রেসিভ)। অর্থাৎএটি ধনীদের তুলনায় দরিদ্রদের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। গবেষণায় বলা হয়েছেদৈনিক ২০০ টাকা আয়কারী ব্যক্তি ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেন। একইভাবে ৫ হাজার টাকা আয়কারী ব্যক্তিও একই হারে ভ্যাট দেন। ফলে দরিদ্র ব্যক্তির আয়ের তুলনায় করের অংশ অনেক বেশি হয়ে যায়। এছাড়া গবেষণায় আরও দেখা যায়মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ ধনী শ্রেণিআয়কর প্রদানে অংশগ্রহণ মাত্র ৩৩ শতাংশ টিআইএনধারীর। অথচ ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ করের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই রাজস্বের বড় অংশ জোগান দেয়। জীবনযাত্রার খরচ বাড়বে পরোক্ষ কর বাড়ানোর একটি তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে বাজারে। পণ্যের দাম বেড়ে যায়যার ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। একইসঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়তে পারেযার ফলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎআজ যে টাকায় একজন মানুষ নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কিনতে পারছেনভবিষ্যতে সেই একই টাকায় কম পণ্য পাবেন। এতে সঞ্চয় কমে যেতে পারেবিনিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নতুন বাজেটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হচ্ছেব্যাংক আমানতের মুনাফার ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানো। বর্তমানে যেখানে এই হার প্রায় ১৫ শতাংশতা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার চিন্তাভাবনা চলছে। এর ফলে এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার বড় অংশ কর হিসেবে কেটে নেওয়া হবে। সঞ্চয়ে আগ্রহ কমে যেতে পারে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেযা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ আগামী অর্থবছরের জন্য কম ব্যয়ের বাজেট করার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় তাঁরা বলেছেনআগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে ও রক্ষণশীলভাবে। কারণলক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। একদিকে আছে যুদ্ধের প্রভাব ও বৈশ্বিক অস্থিরতাঅন্যদিকে আছে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থের অভাব। তাই খরচের ক্ষেত্রে সরকারকে সাশ্রয়ী হতে হবে। অর্থনীতিবিদেরা আরও বলেছেনজ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হয়ে উঠলে আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি ভর্তুকির চাপ বাড়বেযা বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। আরও আছে প্রবাসী আয়ের সম্ভাব্য ধাক্কা। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান কমে গেলে প্রবাসী আয় কমে যেতে পারে। ফলে বাজেট নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। বরং রাজস্ব আদায়ের বাস্তব সক্ষমতাবৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে ব্যয় কাঠামো ঠিক করতে হবে। অর্থনীতিবিদেরা করের আওতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা বলছেনপ্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায় বাড়ানো যাবে না। এ জন্য এনবিআরের আধুনিকায়নস্বয়ংক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংস্কারবিরোধী অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধও বড় বাধা হতে পারেযা রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া মোকাবিলা করা কঠিন হবে বলেও মত দেন তাঁরা। এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। তাই নির্বাচনী অঙ্গীকারবর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্যসবকিছুরই প্রতিফলন আগামী বাজেটে থাকতে হবে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। তারা মনে করেনসামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে হবেটেকসই অর্থায়নের ভিত্তিতে। অন্যথায় বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ বাড়তে পারে। এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতিনীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর জোর দেন অর্থনীতিবিদেরা। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য নীতিগত বার্তা দেওয়া জরুরি বলে মত দেন তাঁরা। বাজেট নিয়ে সরকারের করণীয় বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশে কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, “সাশ্রয়ী হওয়াটা এখন কোনো বিকল্প নাএটা এখন বাধ্যবাধকতা।” বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এখন মূল কথা হল- অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং মানুষের এই দরিদ্র মানুষের কষ্টটা যাতে আর না বাড়েএমনিতে তারা কষ্টে আছেথাকত সব সময়এইটা যাতে আর বৃদ্ধি না পায় সে ব্যবস্থা নেওয়া।” অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আগামী বাজেটে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘এডিপিতে আমরা সাশ্রয়ী না হয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ এডিপি দিচ্ছি। গ্যাস-সারের দাম বেড়েছেভর্তুকি বাড়ছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণ বেশ দুর্বলঅর্থনীতিও দুর্বল। তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থায়ন থাকতে হবে।

What is inflation, how it impacts the economy | CurrencyTransfer

অথচ সাশ্রয়ের বড় জায়গা এডিপি।’ তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ভাবতে হবে কোন কাজটা না করলে নয়কোন কাজটা বাদ দিতে হবেকোন খাতে ব্যয় কমাতে হবে। আইএমএফ আমাদের বাজেট সাপোর্টের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে এডিপি-জাইকা থেকেও বাজেট সাপোর্ট মিলিবে কি না সন্দেহে। তাই বলবোএডিপির আকার সময়োপযোগী নয়এমনকি বাস্তবায়নযোগ্যও নয়।’ সামাজিক সুরক্ষা খাতের সরকারের ব্যয় বাড়ানোর পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে তিনি বলেন, “এখন ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিটা অবশ্যই এটা সময়োপযোগী কর্মসূচি। যুদ্ধের পরেতো এটা আরো বেশি সময়োপযোগী হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিষয়টা হলো ডেলিভারি সিস্টেমটাযে এটা যাদেরকে লক্ষ্য করে দেওয়া হচ্ছে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে কি না। বড় বাজেট উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চাকাঙ্খাসদিচ্ছা ও প্রতিশ্রুতির দেখা মিললেও বর্তমানে পর্যাপ্ত টাকা না থাকাকেই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তার মতে, ‘সাধারণত বাজেটের আকার বছরে ১২ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ে। কিন্তু সরকার একাধিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ২৫ শতাংশের বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেযা রাজস্ব আহরণকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত করবে।’ এক্ষেত্রে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে দেশি উৎস থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরামর্শ তার। সামগ্রিক পরিস্থিতি সরকারের ব্যয় মেটাতে শুধু অর্থের সংস্থানের অভাব নয়অর্থনীতির প্রধান সব সূচকই বেশ কিছু দিন থেকে নিম্নমুখী। মূল্যস্ফীতিতারল্য সংকটসরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতারাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতিবিনিয়োগে খরাকর্মসংস্থানে ভাটাইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি ভোগাচ্ছে সরকারকে। এনবিআর চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ৯৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখেছে। অর্থবছরের শেষ নাগাদ চার লাখ কোটি টাকা আহরণের নজির স্থাপন করতে পারবে কিনা সেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থায়নের আরেক উৎস বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তিতেও দেখা গিয়েছে ধীর গতি। আইএমএফ চলমান ঋণ কর্মসূচির অর্থছাড় থামিয়ে দিয়েছে। নতুন শর্তের বেড়াজালে কীভাবে আইএমএফের ঋণ মিলবে সেটির সুরাহাও হয়নি। সেক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় কম হলে বাজেট বাস্তবায়নে কী ব্যাংক খাতের ওপর ভর করবে সরকারসরকার বেশি বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের কী হবেঅর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেনদীর্ঘদিন দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে আশার আলো নেই। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সুদহারের সীমা যেখানে রাখা হয়েছে তাতে বিনিয়োগের গেরো সহসা কাটবে এমনটা মনে করছেন না ব্যবসায়ীরা। তবে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটের আকার বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই’ বলে তার ভাষ্য। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের চিন্তায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ার প্রতিফলন এ বাজেটেই দেখা মিলবে বলেও তার পরিকল্পনার তুলে ধরেন। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় দাফতরিক জটিলতাহয়রানি এবং অদক্ষতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক সম্ভাব্য করদাতা এই কারণে প্রত্যক্ষ কর দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ফলে সরকার পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছেযা আবার বৈষম্য বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেনকর প্রশাসন আধুনিকায়ন না করলে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কর আহরণ বাড়ানো কঠিন হবে। সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেট একটি নতুন কর বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরোক্ষ করের বিস্তারসঞ্চয়ে করের চাপ বৃদ্ধিউত্তরাধিকার কর চালুর মতো নতুন উদ্যোগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই তিনটি বিষয় দেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোএই কর কাঠামো কতটা ন্যায্য এবং টেকসই হবেযদি করের বোঝা অসমভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর পড়েতাহলে তা সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে। আবার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে পারে। সুতরাংকর কাঠামোর এই রূপান্তর কতটা জনবান্ধব হবেতা নির্ভর করবে নীতিনির্ধারণের সূক্ষ্মতাবাস্তবায়নের দক্ষতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের ন্যায্যতার প্রতি অঙ্গীকারের ওপর। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেনআসন্ন বাজেটে বড় ধরনের কর ছাড় দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে ব্যবসা পরিচালনায় বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তার মতেবেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে। তাই কর বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি বলছেনব্যাংক থেকে টাকা নেওয়া কিংবা টাকা ছাপিয়ে বাজেট অর্থায়নে তার সরকার অত্যন্ত সতর্ক’ থাকবে। বারবার একই করদাতাদের উপরে চাপ প্রয়োগ না করে তিনি আবারও কর জাল বাড়ানোর তাগিদ দেন। সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে পুনরুদ্ধারমুখী হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতাসুশাসন নিশ্চিতকরণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের টানা ডলার কেনা, বাড়ছে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি

কঠিন সময়ে কেমন বাজেট আসছে

০৬:৫১:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

অধ্যাপক ইউনূসের অন্তবর্তী সরকার দেশে উচ্চ মুল্যস্ফীতির এক ফোকলা অর্থনীতি রেখে গেছে। শুধু ফোকলা অর্থনীতিই নয়নব নির্বাচিত তারেক রহমানের বিএনপি সরকারকে দায়িত্ব নিয়েই পড়তে হয়েছে ইরাক যুদ্ধের এক বৈশ্বিক চাপের মধ্যে। বিশেষ করেআন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেলের উচ্চমূল্য ক্রমবর্ধমান মুল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে। অর্থনীতির এমন কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই প্রথম বাজেট দিতে হচ্ছে বিএনপি সরকারকে। এই বাজেট প্রদানকে কেন্দ্র করে সরকারের সামনে নানামুখী চ্যালেঞ্জ এসে ভীড় করেছে। একদিকে উচ্চ মুল্যস্ফীতিবেকারত্ববিনিয়োগে স্থবিরতাআইএমএফের সংস্কারের চাপ এবং চরম অর্থ সংকটঅন্যদিকে নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের পাহাড় সমান প্রত্যাশা। অর্থনীতির এই অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কেমন বাজেট দিতে যাচ্ছেন সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় অর্থমন্ত্রীর সামর্থ সীমিত। তার ওপর ইরান যুদ্ধ সেই সামর্থকে আরও সংকীর্ণ করে তুলেছে। সেই অবস্থায় অর্থমন্ত্রীর বাজেট পরিকল্পণা কতটা বাস্তবসম্মত বা বাস্তবায়নযোগ্য হবেসেই প্রশ্নও সমানে আছে। বিশেষ করেঅর্থ সংকটের মধ্যে এই প্রশ্নগুলো বড় করে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থমন্ত্রী কোন পথে হাটছেন আমাদের বাজেটের দুটি অংশ থাকে। একটি রাজস্ব বাজেটঅপরটি উন্নয়ন বাজেট। ইতোমধ্যে উন্নয়ন বাজেট চূড়ান্ত হয়েছে। উন্নয়ন বাজেটে দেখা যাচ্ছেআগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরেরর জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সংশোধিত আকার ছিল ২ লাখ কোটি টাকা। এক লাফে এক লাখ কোটি টাকা বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরের এডিপির আকার করা হয়েছে তিন লাখ কোটি। এতেই বুঝা যায়সরকার অন্তবর্তী সরকারের সংকোচন বা সাশ্রয়ের বাজেট বাদ দিয়ে প্রবৃদ্ধিভিত্তিক সম্প্রসারণ বাজেটের দিকে যাচ্ছে। তাতে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা যাচ্ছেআগামী অর্থবছরে ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার আকার ধরে বাজেট পরিকল্পনার ছক কষছে অর্থ বিভাগ। বর্তমান রাজনৈতিক সরকার অতীতের রাজনৈতিক সরকারের মতোই বাজেট দিতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেট হতে যাচ্ছে প্রবৃদ্ধিমুলক ও কর্মসংস্থানমুখী। বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটাতে যে সরকারের এই উদ্যোগ তাতে কোন সন্দেহ নেই। উচ্চ মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আইএমএফের পরামর্শে গত তিন বছর ধরেই বাংলাদেশে সংকোচনমুলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছি। বিশেষ করেঅন্তবর্তী সরকার এসে কঠোর সংকোচনমুলক পথে হাটে। কিন্তু তাতে মুল্যস্ফীতি তেমন নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আইএমএফের প্রেসক্রিপশন যে সব দেশে খাটে না তা বাংলাদেশে আবারো প্রমাণিত হয়েছে।

এ কারণেই বিএনপি সরকার এই পথে না হেটে ভিন্ন পথে হাটতে চাইছে। আর মুল্যস্ফীতি বিষয়টি অতীতের রাজনৈতিক সরকারের মডেল অনুযায়ী ভিন্ন পথে অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। আর প্রথম বাজেটেই বড় ধরণের কোন সংস্কারে যাচ্ছেন না অর্থমন্ত্রী। প্রথম বাজেট দেয়ার পর ঘাটতিগুলো পর্যবেক্ষণ কওে তার ভিত্তিতে সংস্কারে করা হবে। অর্থ সচিব ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যদিয়েই আসন্ন বাজেটের এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে। অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেছেন, “বাজেটের আকার বড় হয়ে যাচ্ছে। আসলে গত তিন বছর ধরে সংকোচনমূলক বাজেট করছি। এটার একটা বড় সমস্যা হলো যে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের নীতি নিলে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটা কাঠামোগত দুর্বলতা দেখা দেয়। এবং প্রবৃদ্ধিটা আবার নিম্নগতির দিকে আসার সম্ভাবনা থাকে। এই একটা বড় চিন্তা আমাদের মাথায় আছে। দ্বিতীয় বিষয়টা হলো যে- সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার।” তার ভাষ্যমূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর জন্য টার্গেটেড সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রাম’ নেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেন। এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে যারা উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বেশি চাপে পড়েছে তাদের সহায়তা করা হবে। স্বাস্থ্য-শিক্ষায় জিডিপির বিচারে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি মূলধনি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘শিল্পের ক্ষেত্রে যে অন্য আনুষঙ্গিক পরিবেশের অভাব আছে যার জন্য বেসরকারি খাতে অর্থায়ন কমে যাচ্ছেসেটাও দূর হবে না। এই সার্বিক চিন্তা থেকেই বাজেটকে বড় করছি।’ বাজেটের আকার বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির ট্রেনে আবার সরকারের উঠে পড়ার চিন্তাভাবনার বিষয়টির আভাস পাওয়া যায় তার বক্তব্যে। বিনিয়োগকে গতিশীল করতেও তা ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সরকারের ব্যয় বাড়াতে গিয়ে টাকা ছাপানো হবে না বলে সরকারের অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু। বলেন, ‘টাকা ছাপানোহাই পাওয়ার মানি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদের যে বড় বড় ঋণ- এটা এড়িয়ে চলা আমাদের এক নম্বর অগ্রাধিকার। আমরা চেষ্টা করছি।’ আর বাজেটের আকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনি যদি দেশের প্রবৃদ্ধি চানআপনি যদি বিনিয়োগ চান আপনাকে তো বাজেট বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। বাজেট বাড়ানো ছাড়া দেশেরতো প্রবৃদ্ধি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যেতো বাজেট দিতে হবে।

শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ছে ৫২৮৭ কোটি টাকা

শিক্ষায় বাজেট দিতে হবে। আপনি যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা সবসময় বলে আসছেন- কোনো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সফল করতে হলে সবার আগে বিনিয়োগ করতে হবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়।’ বাজেট কাঠামো আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের আকার বাড়ছে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকাযা চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত এডিপির তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকাযা সংশোধন করে ২ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ কোটি টাকা। ফলে গত বছরের তুলনায় এডিপির আকার বেড়েছে ৫০ শতাংশ। নতুন এডিপিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে এডিপি বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। ফলে এক অর্থবছরের ব্যবধানে খাতটিতে এডিপি বরাদ্দ বাড়ছে ৯ হাজার কোটি টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণায় জানায়প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বরাবরের মতো এবারও বেশি বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ৩৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ প্রায় ৩২ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ পেয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এছাড়া আসন্ন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রায় ১৬ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকামাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রায় ১৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকানৌপরিবহন মন্ত্রণালয় প্রায় ১১ হাজার ৩১৯ কোটি টাকাপানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রায় ৯ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা আর কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপির ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যেই বড় এডিপি দিয়েছে সরকার। এর পেছনে যুক্তি হিসাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেনসরকার ১ টাকা বিনিয়োগ করলে বেসরকারিখাত এর কয়েকগুণ বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। ফলে বেসরকারিখাতে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার বেড়ে ২৪.৯ শতাংশে উন্নীত হবে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এডিপির আকার বাস্তবায়নযোগ্য নয়’ দাবি করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, ‘একটা প্রেক্ষাপটের আচমকা পরিবর্তন ঘটেছে। বাজেট যে প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছে তার গুরুত্ব বিবেচনার বিষয়। ওভারঅল বাজেট কত হওয়া উচিতএডিপির আকার কত হওয়া উচিতএগুলো বিবেচনার বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিঅন্যদিকে উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্বল প্রবৃদ্ধি। যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছেজ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়ছে। বাইরের একটা শকড আছে। এর সঙ্গে আমাদের খাপ খাওয়াতে হবে। প্রথম কথা হলোএ ধরনের পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। কতটা সাশ্রয়ী হতে হবেকীভাবে সাশ্রয়ী হতে হবে তা সময়ের দাবি। সবকিছু বিবেচনায় বাজেটের এই আকার মিলছে নাএডিপির আকার মিলছে না।’ বাজেট সামনে রেখে বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা। এ লক্ষ্যে নতুন বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের অতি উচ্চাভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে অর্থবিভাগ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকাযা সংশোধন করে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে শেষ পর্যন্ত ৪ লাখ কোটি টাকা আদায় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছেরাজস্ব আয়ের এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় অতীতে এনবিআর নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এবার কঠোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়কে মোট দেশজ উৎপাদনের ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছেযা পূরণের জন্যই এই উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় ও আয়ের এই কাঠামোর ভিত্তিতে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকাযা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৯ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রণীত এ বাজেটে দারিদ্র্য নিরসনকর্মসংস্থান সৃষ্টিমানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজেটকে বাস্তবসম্মত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নযোগ্য করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত দেশে মোট ৫৪টি জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছেআর সেই ধারাবাহিকতায় সদ্য রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করা বিএনপি সরকার এবার দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। আর আগামী বাজেট হবে বিএনপি সরকারের জন্য ১৫তম বাজেট। এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে ১১ জুনবৃহস্পতিবার বেলা ৩টায়। টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশের অর্থনীতির চরম এক দুঃসময়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। এর আগে সর্বশেষ ২০০৫-০৬ অর্থবছরের জন্য মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিলেন সে সময়ের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমান। এই মুহর্তে সরকারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো। ব্যাংক খাতের অচলাবস্থা কাটিয়ে এখানে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্যবসাবাণিজ্যে অস্থিরতা ও মন্দাবস্থা কাটিয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। নিত্যপণ্যের বাজারে অরাজকতা বন্ধ করা। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। এত সব অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে একটি স্বস্তিদায়ক বাজেট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। সরকারের বাস্তবায়ন সামর্থ্য উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সরকারকে তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে দেখা গেছে। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড দেওয়াকৃষি ঋণ মওকুফের পদক্ষেপ নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। আরও বেশ কিছু প্রণোদনা দিচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনী বাড়ানোর কথাও আসছে। এসব পদক্ষেপে প্রান্তিক মানুষের উপকার হলেও এগুলো মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। আবার এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থের দরকার। কিন্তু অর্থের জোগানই এখন বাজেট বাস্তবায়ন ও নতুন বাজেট করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় সমস্যা আকারে হাজির হচ্ছে এবারও। অর্থের জোগান পরিকল্পনায় সেই এনবিআরের ওপরই ভরসা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের অতি উচ্চাভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে অর্থবিভাগ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেনচলতি অর্থবছরের নয় মাস শেষে বিশাল ঘাটতির পরও যদি এনবিআর ৪ লাখ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয় তাহলে আগামী অর্থবছরে কর আদায়কারী এ সংস্থার ওই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে। এটি আদতে সম্ভব না। আসছে করের বাড়তি চাপ রাজস্ব ঘাটতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশের কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলাআন্তর্জাতিক ঋণচাপ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনসব মিলিয়ে সরকার এবার কর আহরণ বাড়াতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। তবে সেই আহরণ কাঠামো কীভাবে সাজানো হচ্ছেসেটিই এখন বড় প্রশ্ন। রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছেন তিনি ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করতে চান। এতেই বোঝা যায়প্রত্যক্ষ করের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে আয়ভিত্তিক কর থেকে ভোগভিত্তিক করের দিকে একটি স্পষ্ট ঝোঁক তৈরি হচ্ছেযার প্রভাব পড়বে সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষের ওপর। প্রস্তাবিত কর কাঠামোর সবচেয়ে আলোচিত দিক হলোউত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর কর আরোপের উদ্যোগ। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ীকেউ যদি এক টাকার সম্পদও উত্তরাধিকার হিসেবে পানতাতেও কর দিতে হবে। যদিও এক টাকার নিচে প্রাপ্ত সম্পদের ক্ষেত্রে কর প্রযোজ্য হবে নাকিন্তু এই সীমা অতিক্রম করলেই করের আওতায় পড়তে হবে। ফলে কার্যত ভিক্ষুক বা সম্পদহীন মানুষ ছাড়া প্রায় সবাই করের আওতায় চলে আসবেন। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কৃষকশ্রমিকদিনমজুরকারও জন্যই কোনও বিশেষ ছাড় থাকছে নাযদি তারা উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ পান। অর্থাৎ কর ব্যবস্থায় একটি সর্বজনীনতার ধারা তৈরি হচ্ছেযেখানে সম্পদের মালিকানা থাকলেই কর দিতে হবেতা যতই সামান্য হোক না কেন। উত্তরাধিকার করের ক্ষেত্রে দুটি শ্রেণি নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছেযথা নিকটাত্মীয় ও দূরসম্পর্কের আত্মীয়। নিকটাত্মীয়ের ক্ষেত্রে (মাবাবাভাইবোন) ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ শতাংশপরবর্তী ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ২ শতাংশ। পরবর্তী ধাপে ৩ শতাংশউচ্চ স্তরে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ। দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের ক্ষেত্রে: ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ৩ শতাংশপরবর্তী ৫ কোটি টাকা ৫ শতাংশএরপর ৭ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ স্তরে ১০ শতাংশ। এই কর হিসাব করা হবে সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে। এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন এক জটিলতা। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই সম্পদের ঘোষিত মূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকে। ফলে কর নির্ধারণে কর কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বেযা হয়রানি বা স্বেচ্ছাচারিতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাককোনও ব্যক্তি জীবদ্দশায় ১০ লাখ টাকার একটি সম্পদের মালিক ছিলেন। মৃত্যুর পর দেখা গেলো সেই সম্পদের বাজারমূল্য বেড়ে এক কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এখন উত্তরাধিকারী সেই সম্পদ পাওয়ার সময় তাকে ১ শতাংশ হারে এক লাখ টাকা কর দিতে হবে। যদি একাধিক উত্তরাধিকারী থাকেতাহলে প্রত্যেককে তাদের অংশ অনুযায়ী কর দিতে হবে। এই ধরনের কর কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সম্পদ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় একটি নতুন আর্থিক চাপ তৈরি হবেযা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই উত্তরাধিকার কর চালু রয়েছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রযুক্তরাজ্যজার্মানি ও জাপান। তবে কিছু দেশ এই কর বাতিলও করেছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছেএই খাত থেকে রাজস্ব আসে তুলনামূলক কম। তবে সম্পদবৈষম্য কমাতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে এই কর চালু হলে কয়েক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর সামাজিক প্রভাব কী হবেসেটিই বড় প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেনকর আহরণ বাড়ানো জরুরি হলেও তা হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। তাদের সুপারিশ হলোএকটি নির্দিষ্ট করমুক্ত সীমা (থ্রেশহোল্ড) নির্ধারণ। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা। কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ডিজিটাল কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। উল্লেখ্যদেশে আগেও সম্পদ কর চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালে ওই সম্পদ কর বাতিল করে সারচার্জ চালু করা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমানের দাবিসম্পদ কর নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারও সম্পদ থেকে আয় না হলে আয়করও শূন্যসম্পদ করও শূন্য হবে। পাশাপািশ দেশের অতি ধনীদের ওপর আয়করের হার আরও বাড়তে যাচ্ছে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ করহার বিদ্যমান ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আবশ্য ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে এই নতুন কর হার কার্যকর হতে পারে। এছাড়া ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংকে বার্ষিক জমার ওপর বিদ্যমান আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)যা বর্তমানে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। স্বল্প অঙ্কের আমানতকারীদের করের বোঝা থেকে কিছুটা রেহাই দিতে আগামী বাজেটে সরকার এই শুল্ক অব্যাহতি দিতে পারে। বর্তমানে ৩ লাখ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক রয়েছে ১৫০ টাকা। পরোক্ষ করের বিস্তার কর কাঠামোর আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে পরোক্ষ করের বিস্তার। পরোক্ষ কর এমন একটি ব্যবস্থাযেখানে কর সরাসরি আয়ের ওপর নয়বরং পণ্য ও সেবার ভোগের ওপর আরোপ করা হয়।

Breaking down the FY2024-25 education budget | The Daily Star

ফলে একজন ধনী ব্যক্তি ও একজন দরিদ্র ব্যক্তি একই পণ্য কিনলে একই হারে কর দেন। এখানেই তৈরি হয় বৈষম্য। কারণ দরিদ্র মানুষের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় ভোগেফলে তাদের আয়ের তুলনায় করের বোঝা বেশি হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারেএক কেজি দুধের দাম ৫০ টাকাএর ওপর ১০ টাকা ভ্যাট আরোপ করা হলে ক্রেতাকে ৬০ টাকা দিতে হবে। এই অতিরিক্ত ১০ টাকা সবার জন্য সমান হলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি তুলনামূলক বড় চাপ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছেবাংলাদেশে পরোক্ষ কর কাঠামো কার্যত প্রত্যাবর্তনশীল (রিগ্রেসিভ)। অর্থাৎএটি ধনীদের তুলনায় দরিদ্রদের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। গবেষণায় বলা হয়েছেদৈনিক ২০০ টাকা আয়কারী ব্যক্তি ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেন। একইভাবে ৫ হাজার টাকা আয়কারী ব্যক্তিও একই হারে ভ্যাট দেন। ফলে দরিদ্র ব্যক্তির আয়ের তুলনায় করের অংশ অনেক বেশি হয়ে যায়। এছাড়া গবেষণায় আরও দেখা যায়মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ ধনী শ্রেণিআয়কর প্রদানে অংশগ্রহণ মাত্র ৩৩ শতাংশ টিআইএনধারীর। অথচ ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ করের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই রাজস্বের বড় অংশ জোগান দেয়। জীবনযাত্রার খরচ বাড়বে পরোক্ষ কর বাড়ানোর একটি তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে বাজারে। পণ্যের দাম বেড়ে যায়যার ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। একইসঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়তে পারেযার ফলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎআজ যে টাকায় একজন মানুষ নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কিনতে পারছেনভবিষ্যতে সেই একই টাকায় কম পণ্য পাবেন। এতে সঞ্চয় কমে যেতে পারেবিনিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নতুন বাজেটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হচ্ছেব্যাংক আমানতের মুনাফার ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানো। বর্তমানে যেখানে এই হার প্রায় ১৫ শতাংশতা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার চিন্তাভাবনা চলছে। এর ফলে এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার বড় অংশ কর হিসেবে কেটে নেওয়া হবে। সঞ্চয়ে আগ্রহ কমে যেতে পারে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেযা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ আগামী অর্থবছরের জন্য কম ব্যয়ের বাজেট করার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় তাঁরা বলেছেনআগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে ও রক্ষণশীলভাবে। কারণলক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। একদিকে আছে যুদ্ধের প্রভাব ও বৈশ্বিক অস্থিরতাঅন্যদিকে আছে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থের অভাব। তাই খরচের ক্ষেত্রে সরকারকে সাশ্রয়ী হতে হবে। অর্থনীতিবিদেরা আরও বলেছেনজ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হয়ে উঠলে আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি ভর্তুকির চাপ বাড়বেযা বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। আরও আছে প্রবাসী আয়ের সম্ভাব্য ধাক্কা। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান কমে গেলে প্রবাসী আয় কমে যেতে পারে। ফলে বাজেট নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। বরং রাজস্ব আদায়ের বাস্তব সক্ষমতাবৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে ব্যয় কাঠামো ঠিক করতে হবে। অর্থনীতিবিদেরা করের আওতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা বলছেনপ্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায় বাড়ানো যাবে না। এ জন্য এনবিআরের আধুনিকায়নস্বয়ংক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংস্কারবিরোধী অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধও বড় বাধা হতে পারেযা রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া মোকাবিলা করা কঠিন হবে বলেও মত দেন তাঁরা। এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। তাই নির্বাচনী অঙ্গীকারবর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্যসবকিছুরই প্রতিফলন আগামী বাজেটে থাকতে হবে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। তারা মনে করেনসামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে হবেটেকসই অর্থায়নের ভিত্তিতে। অন্যথায় বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ বাড়তে পারে। এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতিনীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর জোর দেন অর্থনীতিবিদেরা। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য নীতিগত বার্তা দেওয়া জরুরি বলে মত দেন তাঁরা। বাজেট নিয়ে সরকারের করণীয় বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশে কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, “সাশ্রয়ী হওয়াটা এখন কোনো বিকল্প নাএটা এখন বাধ্যবাধকতা।” বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এখন মূল কথা হল- অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং মানুষের এই দরিদ্র মানুষের কষ্টটা যাতে আর না বাড়েএমনিতে তারা কষ্টে আছেথাকত সব সময়এইটা যাতে আর বৃদ্ধি না পায় সে ব্যবস্থা নেওয়া।” অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আগামী বাজেটে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘এডিপিতে আমরা সাশ্রয়ী না হয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ এডিপি দিচ্ছি। গ্যাস-সারের দাম বেড়েছেভর্তুকি বাড়ছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণ বেশ দুর্বলঅর্থনীতিও দুর্বল। তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থায়ন থাকতে হবে।

What is inflation, how it impacts the economy | CurrencyTransfer

অথচ সাশ্রয়ের বড় জায়গা এডিপি।’ তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ভাবতে হবে কোন কাজটা না করলে নয়কোন কাজটা বাদ দিতে হবেকোন খাতে ব্যয় কমাতে হবে। আইএমএফ আমাদের বাজেট সাপোর্টের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে এডিপি-জাইকা থেকেও বাজেট সাপোর্ট মিলিবে কি না সন্দেহে। তাই বলবোএডিপির আকার সময়োপযোগী নয়এমনকি বাস্তবায়নযোগ্যও নয়।’ সামাজিক সুরক্ষা খাতের সরকারের ব্যয় বাড়ানোর পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে তিনি বলেন, “এখন ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিটা অবশ্যই এটা সময়োপযোগী কর্মসূচি। যুদ্ধের পরেতো এটা আরো বেশি সময়োপযোগী হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিষয়টা হলো ডেলিভারি সিস্টেমটাযে এটা যাদেরকে লক্ষ্য করে দেওয়া হচ্ছে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে কি না। বড় বাজেট উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চাকাঙ্খাসদিচ্ছা ও প্রতিশ্রুতির দেখা মিললেও বর্তমানে পর্যাপ্ত টাকা না থাকাকেই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তার মতে, ‘সাধারণত বাজেটের আকার বছরে ১২ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ে। কিন্তু সরকার একাধিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ২৫ শতাংশের বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেযা রাজস্ব আহরণকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত করবে।’ এক্ষেত্রে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে দেশি উৎস থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরামর্শ তার। সামগ্রিক পরিস্থিতি সরকারের ব্যয় মেটাতে শুধু অর্থের সংস্থানের অভাব নয়অর্থনীতির প্রধান সব সূচকই বেশ কিছু দিন থেকে নিম্নমুখী। মূল্যস্ফীতিতারল্য সংকটসরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতারাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতিবিনিয়োগে খরাকর্মসংস্থানে ভাটাইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি ভোগাচ্ছে সরকারকে। এনবিআর চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ৯৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখেছে। অর্থবছরের শেষ নাগাদ চার লাখ কোটি টাকা আহরণের নজির স্থাপন করতে পারবে কিনা সেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থায়নের আরেক উৎস বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তিতেও দেখা গিয়েছে ধীর গতি। আইএমএফ চলমান ঋণ কর্মসূচির অর্থছাড় থামিয়ে দিয়েছে। নতুন শর্তের বেড়াজালে কীভাবে আইএমএফের ঋণ মিলবে সেটির সুরাহাও হয়নি। সেক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় কম হলে বাজেট বাস্তবায়নে কী ব্যাংক খাতের ওপর ভর করবে সরকারসরকার বেশি বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের কী হবেঅর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেনদীর্ঘদিন দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে আশার আলো নেই। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সুদহারের সীমা যেখানে রাখা হয়েছে তাতে বিনিয়োগের গেরো সহসা কাটবে এমনটা মনে করছেন না ব্যবসায়ীরা। তবে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটের আকার বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই’ বলে তার ভাষ্য। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের চিন্তায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ার প্রতিফলন এ বাজেটেই দেখা মিলবে বলেও তার পরিকল্পনার তুলে ধরেন। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় দাফতরিক জটিলতাহয়রানি এবং অদক্ষতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। অনেক সম্ভাব্য করদাতা এই কারণে প্রত্যক্ষ কর দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ফলে সরকার পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছেযা আবার বৈষম্য বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেনকর প্রশাসন আধুনিকায়ন না করলে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কর আহরণ বাড়ানো কঠিন হবে। সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেট একটি নতুন কর বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরোক্ষ করের বিস্তারসঞ্চয়ে করের চাপ বৃদ্ধিউত্তরাধিকার কর চালুর মতো নতুন উদ্যোগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই তিনটি বিষয় দেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোএই কর কাঠামো কতটা ন্যায্য এবং টেকসই হবেযদি করের বোঝা অসমভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর পড়েতাহলে তা সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে। আবার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে পারে। সুতরাংকর কাঠামোর এই রূপান্তর কতটা জনবান্ধব হবেতা নির্ভর করবে নীতিনির্ধারণের সূক্ষ্মতাবাস্তবায়নের দক্ষতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের ন্যায্যতার প্রতি অঙ্গীকারের ওপর। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেনআসন্ন বাজেটে বড় ধরনের কর ছাড় দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে ব্যবসা পরিচালনায় বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তার মতেবেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে। তাই কর বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি বলছেনব্যাংক থেকে টাকা নেওয়া কিংবা টাকা ছাপিয়ে বাজেট অর্থায়নে তার সরকার অত্যন্ত সতর্ক’ থাকবে। বারবার একই করদাতাদের উপরে চাপ প্রয়োগ না করে তিনি আবারও কর জাল বাড়ানোর তাগিদ দেন। সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে পুনরুদ্ধারমুখী হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতাসুশাসন নিশ্চিতকরণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক