ব্যাংককের রাস্তায় হাঁটলে একসময় চোখে পড়ত ছোট ছোট খাবারের ঠেলাগাড়ি। কোথাও গরম নুডলস, কোথাও ঝাল ভাত, আবার কোথাও অফিসপাড়ার মানুষের দ্রুত দুপুরের খাবারের ভরসা ছিল এসব স্ট্রিট ফুডের দোকান। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই পরিচিত দৃশ্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শহরের ফুটপাত থেকে একের পর এক উধাও হয়ে যাচ্ছে খাবারের ঠেলাগাড়ি।
২০২২ সালের পর থেকে ব্যাংককের ফুটপাত থেকে প্রায় ১০ হাজার পথের খাবার বিক্রেতা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নগর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, যান চলাচল সহজ করা এবং পথচারীদের জন্য ফুটপাত খালি রাখার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ।
ফুটপাত ছিল শুধু হাঁটার জায়গা নয়
ব্যাংককের স্ট্রিট ফুড শুধু খাবারের উৎস ছিল না, এটি ছিল শহরের সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই দোকানে অফিস কর্মী থেকে মোটরসাইকেল চালক—সবাই একসঙ্গে বসে কম দামে খাবার খেতেন। ফুটপাতগুলো কেবল চলাচলের পথ নয়, বরং মানুষের মিলনস্থল হিসেবেও পরিচিত ছিল।
অনেকের মতে, এসব ঠেলাগাড়ি হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের একটি প্রাণবন্ত সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে।
নগর পরিকল্পনার যুক্তিও শক্তিশালী
তবে নগর কর্তৃপক্ষের যুক্তিও একেবারে অমূলক নয়। ব্যাংককের ফুটপাত দীর্ঘদিন ধরেই ভিড় ও বিশৃঙ্খলার জন্য পরিচিত। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও শারীরিকভাবে অসুবিধায় থাকা পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হতো। তাই ফুটপাত খালি করা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছে প্রশাসন।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, যেসব বিক্রেতা উচ্ছেদ হচ্ছেন তারা কোথায় যাবেন এবং সাধারণ মানুষ কি আগের মতো সাশ্রয়ী খাবার পাবেন?

নতুন হকার সেন্টারে আশার আলো
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সম্প্রতি লুম্পিনি পার্কের কাছে নতুন একটি হকার সেন্টার চালু করেছে ব্যাংকক প্রশাসন। সেখানে প্রায় ১৩০টি দোকান সকাল ও সন্ধ্যা শিফটে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি দোকানের জন্য দৈনিক ভাড়া রাখা হয়েছে প্রায় ৬০ বাথ, যাতে ছোট বিক্রেতারাও সহজে ব্যবসা চালাতে পারেন।
অনেক বিক্রেতা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় এখন তারা বেশি নিরাপদ বোধ করছেন। কারণ আগে ফুটপাতে ব্যবসা করতে গিয়ে নানা অনানুষ্ঠানিক খরচ ও চাপের মুখে পড়তে হতো। এখন নিয়মিত পানি, বিদ্যুৎ ও ছাউনি সুবিধা পাওয়ায় কাজ করাও সহজ হয়েছে।
একজন নুডলস বিক্রেতা জানান, তিনি ২০০৪ সাল থেকে পার্কের পাশে খাবার বিক্রি করতেন। নতুন স্থানে চলে আসার পর তীব্র গরম বা বৃষ্টির মধ্যেও এখন স্বস্তিতে ব্যবসা করা যাচ্ছে।
প্রযুক্তির সহায়তায় নতুন সুযোগ
ব্যাংকক প্রশাসন অনলাইন খাবার বিক্রি ও ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা দিতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করছে। এতে বিক্রেতারা শুধু সরাসরি ক্রেতার ওপর নির্ভর না করে অনলাইনেও অর্ডার নিতে পারছেন।
শহরের গভর্নরের মতে, এই উদ্যোগ শুধু রাস্তা পরিষ্কার রাখার জন্য নয়, বরং স্বল্পমূল্যের খাবার নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তা দেওয়া এবং শহরের খাদ্য সংস্কৃতি ধরে রাখার অংশ।
সিঙ্গাপুরের মডেলের পথে ব্যাংকক
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকক এখন এমন একটি পথ অনুসরণ করছে, যা বহু বছর আগে সিঙ্গাপুর সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছিল। সেখানে রাস্তার খাবারের সংস্কৃতি পুরোপুরি হারিয়ে না গিয়ে সংগঠিত হকার সেন্টারের মাধ্যমে নতুন রূপ পেয়েছে।
ব্যাংককের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যেতে পারে। হয়তো ঠেলাগাড়িগুলো আগের জায়গায় আর থাকবে না, কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নতুন পরিবেশে টিকে থাকবে শহরের জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতি।
ব্যাংককের ফুটপাত থেকে খাবারের ঠেলাগাড়ি সরিয়ে হকার সেন্টারে স্থানান্তরের উদ্যোগে বদলে যাচ্ছে শহরের খাদ্য সংস্কৃতি ও নগর জীবন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















