ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাণিজ্যনীতি বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর প্রশাসন “পারস্পরিকতা”র কথা বললেও বাস্তবে যে কৌশল অনুসরণ করছে, তা সমতার ভিত্তিতে বাণিজ্য নয়; বরং চাপ সৃষ্টি করে সুবিধা আদায়ের এক নতুন ধরন। মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী—দুই পক্ষের দেশগুলোর ওপরই শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন এমন এক বার্তা দিতে চাইছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো ছাড় দেবে না। কিন্তু এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে।
গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা মূলত একটি ভারসাম্যের ধারণার ওপর দাঁড়িয়েছিল। দেশগুলো নিজেদের বাজার খুলেছে এই প্রত্যাশায় যে অপর পক্ষও একইভাবে সুযোগ দেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই ব্যবস্থার অন্যতম স্থপতি ছিল। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি—সবখানেই মূল ধারণা ছিল পারস্পরিক সুবিধা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই ধারণা বদলে গেছে।
বর্তমান হোয়াইট হাউস মনে করে, অতীতে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে এবং তার সুযোগ নিয়েছে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও আরও বহু মিত্র। ট্রাম্পের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র শুধু বিদেশি পণ্য আমদানি করেনি, একই সঙ্গে এসব দেশের নিরাপত্তার বড় অংশের খরচও বহন করেছে। ফলে এখন অন্যদের “মূল্য পরিশোধের” সময় এসেছে। এই মানসিকতা থেকেই তাঁর প্রশাসন বাণিজ্যকে আর পারস্পরিক সহযোগিতা হিসেবে দেখছে না; বরং অতীতের তথাকথিত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপেক্ষা করছে। কোনো দেশ একা বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থাকে নিজের মতো করে পুনর্গঠন করতে পারে না। বৈশ্বিক অর্থনীতি পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র যত শক্তিশালীই হোক, তার অংশীদারদেরও বিকল্প রয়েছে। স্বল্পমেয়াদে অনেক দেশ ট্রাম্পের চাপ মেনে সমঝোতায় যেতে পারে, কারণ তারা হঠাৎ করে মার্কিন বাজার হারানোর ঝুঁকি নিতে চায় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারা নতুন অংশীদার খুঁজতে বাধ্য হবে।
ইতোমধ্যে সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এশিয়ার বহু দেশ নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন মুক্তবাণিজ্য চুক্তির দিকে এগোচ্ছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে সুরক্ষাবাদী অবস্থানে থাকা ভারতও নতুন অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করছে। কারণ অনেক দেশ এখন উপলব্ধি করছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো চীনকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বাণিজ্যচুক্তিতে এমন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যা কার্যত অংশীদার দেশগুলোকে বেইজিং থেকে দূরে সরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু এখানেও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একপক্ষ বেছে নিতে আগ্রহী নয়। অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতি একই সঙ্গে দুই বাজারের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ফলে ওয়াশিংটনের কৌশল তাদের অস্বস্তিতে ফেলছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন যে ধরনের চুক্তি করছে, সেগুলোর অনেকগুলোই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল কাঠামোর বদলে রাজনৈতিক চাপের ফল। এগুলোর মধ্যে নিরপেক্ষ বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা দুর্বল, অনেক ক্ষেত্রেই কংগ্রেসের পূর্ণ অনুমোদন নেই, আবার চুক্তির শর্তও অস্পষ্ট। ফলে অংশীদার দেশগুলো এগুলোকে স্থায়ী প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখছে না। বরং তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে হোয়াইট হাউস চাইলে সহজেই নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী অর্জন করতে চাইছে। যদি লক্ষ্য হয় বিশ্বজুড়ে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করা, তাহলে মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন। কারণ চীনের বিকল্প হিসেবে কার্যকর জোট গড়তে হলে বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্থায়ী সহযোগিতা দরকার। কিন্তু ট্রাম্পের নীতি সেই আস্থাকেই ক্ষয় করছে।
এই কৌশলের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। শুল্ক বাড়ানো মানে শেষ পর্যন্ত আমেরিকান ভোক্তা ও ব্যবসার ব্যয় বাড়ানো। একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী রাজনৈতিক মনোভাব শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। আগে যেখানে সমঝোতার মাধ্যমে বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়া যেত, এখন সেখানে চাপ ও প্রতিশোধের রাজনীতি জায়গা নিচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিকল্প কাঠামো খুঁজতে উৎসাহিত করছে। ওয়াশিংটন যখন একতরফা ক্ষমতা প্রয়োগের পথে হাঁটছে, তখন মধ্যম শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে নতুন নিয়মভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা হয়তো এমন এক রূপ নেবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু আর একক নেতৃত্বের অবস্থানে নয়।
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে তারা পারস্পরিকতার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করছে। বাস্তবে তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে অন্য দেশগুলো আবার সত্যিকারের পারস্পরিক সহযোগিতার মূল্য বুঝতে শুরু করেছে। আর সেটিই হতে পারে এই নীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
অ্যালিসন স্মিথ 



















