ইন্দোনেশিয়ায় একের পর এক আলোচিত দুর্নীতি মামলা দেশটির ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা, শিক্ষিত আমলা এবং বিদেশফেরত পেশাজীবীদের মধ্যে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, সরকারি দায়িত্ব নেওয়া কি শেষ পর্যন্ত আইনি ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
দেশটির বহুল পরিচিত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও গোজেকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাদিয়েম মাকারিম বর্তমানে গৃহবন্দি অবস্থায় দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি। কোভিড মহামারির সময় শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রোমবুক কেনার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে নাদিয়েম সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রযুক্তি খাতের মধ্যে বাড়ছে ভয়
নাদিয়েম মাকারিম একসময় ইন্দোনেশিয়ার তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক ছিলেন। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তাকে সরকারে আনা হয়েছিল। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, দেশটি মেধাবী ও আন্তর্জাতিক মানের পেশাজীবীদের রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত করতে চায়।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অনেকের কাছে উল্টো বার্তা দিচ্ছে। নাদিয়েমের সঙ্গে অভিযুক্ত ইব্রাহিম আরিফ নামে এক প্রযুক্তি পরামর্শককে ইতোমধ্যে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার প্রমাণ না থাকলেও তার কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের ক্ষতির কারণ হয়েছে।
এই ধরনের মামলা প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আজ যে সিদ্ধান্ত বৈধ বলে বিবেচিত হচ্ছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে ভবিষ্যতে সেটিকেই অপরাধ হিসেবে দেখানো হতে পারে।

সাবেক মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও মামলা
শুধু প্রযুক্তি খাত নয়, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী থমাস লেমবংয়ের বিরুদ্ধেও পুরোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মামলা হয়েছে। এক দশক আগের চিনি আমদানি নীতির কারণে তাকে সাজা দেওয়া হয়। সমালোচকদের দাবি, একই ধরনের সিদ্ধান্ত পরে আরও কয়েকজন মন্ত্রী নিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া রাষ্ট্রীয় ফেরি কোম্পানির সাবেক প্রধান নির্বাহী ইরা পুস্পাদেউইর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। তার আইনজীবীরা বলছেন, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তটি সদিচ্ছা থেকেই নেওয়া হয়েছিল। এমনকি মামলার এক বিচারক সতর্ক করে বলেছেন, ব্যবসায়িক ঝুঁকিকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হলে ভবিষ্যতে দক্ষ মানুষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে ভয় পাবেন।
বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, এসব মামলার প্রভাব শুধু আদালতের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন ইন্দোনেশিয়ার আইনি পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও দেশটি প্রত্যাশিত পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছে না।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়াতে বড় তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে একই সময়ে উচ্চপর্যায়ের এসব মামলা সরকারের বার্তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
মেধা হারানোর ঝুঁকি
সাবেক কূটনীতিক ডিনো পট্টি জালাল সতর্ক করে বলেছেন, এখন অনেক মেধাবী মানুষ ভাবছেন, সরকারে যোগ দিলে তারাও হয়তো একদিন আইনি জটিলতায় পড়বেন। বিদেশে থাকা ইন্দোনেশীয় পেশাজীবীরাও দেশে ফিরে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে এবং আগামী কয়েক বছরে এর আকার কয়েকশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও বিশ্বমানের মানবসম্পদ। যদি ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে, তাহলে দেশটি তার সেরা মেধাগুলো হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















