বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন শুধু পশ্চিমা বিশ্বের সংকট নয়, এর প্রভাব ধীরে ধীরে এশিয়ার দেশগুলোকেও ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং অস্ত্র সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এশিয়ার মধ্যম শক্তিধর দেশগুলো নতুন করে নিজেদের নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজাতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ইউরোপ ছিল স্থিতিশীল অংশীদার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ায় ইউরোপও এখন নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেছে। আর এই পরিবর্তন এশিয়ার জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
ইউরোপের বদলে যাওয়া অবস্থান
ইউরোপ এখন দ্রুত নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে রেকর্ড পরিমাণে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টাও জোরদার হয়েছে। এতে অনেকেই মনে করছেন, ইউরোপ ভবিষ্যতে এশিয়ার জন্য আরও শক্তিশালী অংশীদার হতে পারে। তবে বাস্তবতা এতটা সহজ নয়।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে যেখানে প্রতিটি দেশ নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থকে সবার আগে রাখবে। ফলে দীর্ঘদিনের মিত্রতাও প্রয়োজনের মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য পুরোনো নির্ভরতার মডেল আর কার্যকর নাও থাকতে পারে।
মালয়েশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট
এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। দেশটি নরওয়ের একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুদ্ধজাহাজের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ চুক্তি করেছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের ঠিক আগে নরওয়ে সেই সরবরাহ স্থগিত করে দেয়।

এই সিদ্ধান্তে মালয়েশিয়ায় তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কারণ যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য ওই ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন বিকল্প ব্যবস্থা নিতে গেলে জাহাজের নকশা পর্যন্ত বদলাতে হতে পারে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়বে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, স্বাক্ষরিত চুক্তিকে এভাবে হঠাৎ বাতিল করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
স্বার্থের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ইউরোপ নিজেদের নিরাপত্তা চাহিদা মেটাতেই ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ আটকে দিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের অস্ত্র মজুত বাড়াতে ব্যস্ত। ফলে বাইরের দেশগুলোর চেয়ে নিজেদের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এতে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ এতদিন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা হতো। এখন সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরছে। বিশেষ করে সংকটের সময় বড় শক্তিগুলো কতটা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
নতুন কৌশলের পথে এশিয়া
এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার দেশগুলো এখন বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজছে। শুধু পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভর না করে দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্কসহ অন্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির দিকেও নজর বাড়ছে। তবে এতে নতুন সমস্যাও তৈরি হতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের অস্ত্র ব্যবস্থার কারণে সমন্বয়, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তারপরও অনেক দেশের কাছে এটিই এখন বাস্তবসম্মত পথ। কারণ বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় একক কোনো শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই এখন এশিয়ার দেশগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















