ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বেইজিং বৈঠক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করলেও, এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে একই সময়ে আরও দুটি সমান্তরাল প্রক্রিয়া নীরবে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। একদিকে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক, অন্যদিকে সাংহাই ও সুজৌজুড়ে এপেকের বিস্তৃত আলোচনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে—বিশ্ব রাজনীতি এখন কেবল দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নেই। বরং লড়াইটি ক্রমেই রূপ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার চরিত্র নিয়ে: একক আধিপত্য, নাকি বহু-পক্ষীয় সমন্বয়।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় দরকষাকষি। তাঁর কাছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মানে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজের সুবিধাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। “আমেরিকা ফার্স্ট” কৌশল মূলত এই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু এই পদ্ধতি বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে, কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এখন গভীরভাবে আন্তঃনির্ভরশীল এবং বহুস্তরীয় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক।
চীন এই জায়গাতেই নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরতে চাইছে। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু এখানেই রয়েছে এক ধরনের দ্বৈততা। একদিকে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর পক্ষে কথা বলছে; অন্যদিকে অনেক দেশ এখনও সন্দিহান—চীন আসলে কতটা নীতিগতভাবে উন্মুক্ত, আর কতটা কৌশলগত প্রয়োজনের কারণে এই অবস্থান নিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প-শি বৈঠককে অনেকেই সীমিত প্রত্যাশার একটি কূটনৈতিক আয়োজন হিসেবেই দেখছেন। ইরান যুদ্ধের প্রভাব, তাইওয়ান প্রশ্ন, শুল্কনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে বড় কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা আগে থেকেই ক্ষীণ ছিল। বরং উভয় পক্ষের লক্ষ্য ছিল উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং এমন কিছু প্রতীকী অগ্রগতি দেখানো, যা নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দর্শকদের সামনে গ্রহণযোগ্য হয়।
চীনের জন্য এই সংযত কৌশল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বছরের মধ্যেই আরও কয়েকটি বহুপাক্ষিক সম্মেলনে শি জিনপিংয়ের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বেইজিং চাইবে নিজেকে এমন একটি শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে, যে একতরফা চাপের বদলে সহযোগিতাভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থাকে সমর্থন করে।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস বৈঠক সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের আরেকটি প্রতিচ্ছবি। সংগঠনটির ভেতরে এখন স্বার্থের জটিল সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া, ভারত ও চীনের মতো রাষ্ট্রগুলো একই ছাতার নিচে থাকলেও তাদের ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার এক নয়। ফলে ব্রিকস এখন শুধু পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প মঞ্চ নয়; এটি নিজেই ভেতরকার প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্বে জর্জরিত এক জটিল জোটে পরিণত হচ্ছে।
ভারতের অবস্থান সবচেয়ে কঠিন। একদিকে দিল্লি রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখতে চায়। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে ভারত এমন এক কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে কোনো পক্ষকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট রাখা প্রায় অসম্ভব।

এর পাশাপাশি রয়েছে আরেকটি বড় প্রশ্ন: বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতৃত্ব কে দেবে? চীন বহু বছর ধরে নিজেকে উন্নয়নশীল বিশ্বের মুখপাত্র হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু ভারতও এখন একই ভূমিকায় এগোতে চাইছে। ফলে ব্রিকসের ভেতরে নীরব নেতৃত্ব-সংগ্রামও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে আছে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় লেনদেনের জন্য বিকল্প অর্থপ্রদানের কাঠামো তৈরির যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা মূলত মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমানোর প্রচেষ্টা। কিন্তু ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এটি শুধু আর্থিক পরীক্ষা নয়; এটি আমেরিকার নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক কূটনৈতিক শক্তির প্রতি চ্যালেঞ্জ। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক।
এদিকে সাংহাই ও সুজৌতে এপেক বৈঠকগুলো আরও স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বড় অংশ এখনও সহযোগিতাভিত্তিক বাণিজ্য কাঠামোর পক্ষেই রয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ প্রযুক্তি, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ—এসব ইস্যুতে এপেক সদস্যদের অবস্থান মূলত সমন্বয়মুখী। তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়, যৌথ মান নির্ধারণে আগ্রহী এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিকে এগিয়ে নিতে চায়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের একতরফা অর্থনৈতিক কৌশলের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই বেইজিং সফরে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির উপস্থিতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সুজৌতে এপেক বৈঠকে তুলনামূলক নিম্নপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিত্বও ততটাই তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখিয়ে দেয়, ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার এখন বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে নিজের স্বার্থ নিশ্চিত করা।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি ফিরে আসে: বিশ্ব কি আবার শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপক্ষীয় দরকষাকষির যুগে ফিরে যাচ্ছে, নাকি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার নতুন সংস্করণ গড়ে উঠছে?
বাস্তবতা হলো, আজকের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এতটাই জটিল যে কোনো একক শক্তির পক্ষে একে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্র ধীরে ধীরে বহুমুখী হয়ে উঠছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন শুধু নিয়ম মেনে চলতে চায় না; তারা নিয়ম তৈরির টেবিলেও জায়গা দাবি করছে।
এই কারণেই ট্রাম্প-শি বৈঠকের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সেই নীরব আলোচনাগুলো, যেখানে ভবিষ্যতের বাণিজ্য কাঠামো, আর্থিক মানদণ্ড এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের নতুন রূপরেখা আঁকা হচ্ছে। কারণ আগামী বিশ্বের চরিত্র নির্ধারণ করবে কেবল দুই নেতার করমর্দন নয়, বরং কোন ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা টিকে থাকবে—সংঘাতনির্ভর একক আধিপত্য, নাকি জটিল কিন্তু অংশগ্রহণমূলক বহুপাক্ষিকতা।
ডেভিড ডডওয়েল 



















