কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত চাপ সামাল দিতে এবার মহাকাশে ডেটা সেন্টার গড়ার পরিকল্পনায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। প্রযুক্তি জায়ান্ট, স্টার্টআপ এবং সরকারি সংস্থাগুলো এখন পৃথিবীর কক্ষপথে এআই কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করছে।
গুগলের গবেষণা ইউনিট “প্যারাডাইমস অব ইন্টেলিজেন্স” ইতোমধ্যে “প্রজেক্ট সানক্যাচার” নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটি পৃথিবীর কক্ষপথে এআই কম্পিউটিং পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ২০২৭ সালে গুগল প্রথমবারের মতো বিশেষায়িত এআই প্রসেসরসহ একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে মহাকাশের পরিবেশে চিপগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।
বিদ্যুৎ সংকট ও রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। দেশটির ডেটা সেন্টারগুলো বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রায় ৬ শতাংশ ব্যবহার করছে। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়াও বাড়ছে। অনেক সম্প্রদায় বড় ডেটা সেন্টার স্থাপনের বিরোধিতা করছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপন করলে পৃথিবীর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তির সীমাহীন ব্যবহার সম্ভব হবে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, মহাকাশভিত্তিক অবকাঠামো রাজনৈতিক বিরোধিতাও কমাতে পারে।

চীনের ভিন্ন কৌশল
চীনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। দেশটির ডেটা সেন্টারগুলো জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাত্র ০.৮ শতাংশ ব্যবহার করে। ফলে তাদের প্রধান লক্ষ্য বিদ্যুৎ সংকট নয়, বরং মহাকাশে তৈরি হওয়া বিপুল তথ্য সেখানেই প্রক্রিয়াজাত করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্যাটেলাইট ও ভবিষ্যৎ মহাকাশ শিল্প থেকে উৎপন্ন তথ্য পৃথিবীতে পাঠানো ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠছে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে চীন সম্প্রতি “স্পেস কম্পিউট প্রফেশনাল কমিটি” গঠন করেছে। গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পে বড় অঙ্কের প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে চীনা প্রতিষ্ঠান এডিএ স্পেস এবং ঝেজিয়াং ল্যাব কক্ষপথে কম্পিউটিং সক্ষমতাসম্পন্ন ১২টি স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে।
ব্যয় ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি পরীক্ষামূলক স্যাটেলাইট পাঠানো সহজ হলেও পূর্ণাঙ্গ মহাকাশ ডেটা সেন্টার গড়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। মহাকাশ বিকিরণ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং ধ্বংসাবশেষের ঝুঁকি বড় সমস্যা হিসেবে রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে উৎক্ষেপণ ব্যয়কে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের তুলনায় মহাকাশে পণ্য পাঠানোর খরচ অনেক কমেছে। ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও কমলে মহাকাশ ডেটা সেন্টার বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে পারে। বর্তমানে স্পেসএক্স উৎক্ষেপণ খরচ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বাজারে তাদের আধিপত্য নতুন প্রতিযোগিতাও তৈরি করছে।
নতুন সরবরাহ শৃঙ্খলের সম্ভাবনা
মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টার বাস্তবায়িত হলে প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। ফক্সকন, কোয়ান্টা, উইস্ট্রনের মতো সার্ভার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মহাকাশ উপযোগী স্টোরেজ, কুলিং সিস্টেম এবং সার্ভার প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে সাইবার হামলা, যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রক্ষায় মহাকাশে ব্যাকআপ ডেটা সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে মহাকাশভিত্তিক ডেটা অবকাঠামো শুধু প্রযুক্তিগত নয়, কৌশলগত নিরাপত্তার বিষয় হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















