০৮:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
বান্দরবানে মাটি ধসে ইটভাটার শ্রমিক নিহত ডুয়েটে নতুন ভিসি প্রত্যাখ্যান, টানা দ্বিতীয় দিনের অবরোধে শিক্ষার্থীরা ভারতীয় রুপির ঐতিহাসিক পতন, আমিরাতের ১ দিরহাম এখন ২৬ রুপির বেশি আরও ১২ শিশুর মৃত্যু, দুই মাসে হামে প্রাণ গেল ৪৫১ জনের সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোদী-শেখ মোহাম্মদের বৈঠক, কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদারের বার্তা অমজাদ খানের পাওনা ফেরাতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন স্ত্রী স্টারমারের নেতৃত্বে ভাঙনের শঙ্কা, পদত্যাগ করলেন ওয়েস স্ট্রিটিং, সামনে লেবার পার্টির ক্ষমতার লড়াই টিকা নেওয়ার বয়সের আগেই হামে আক্রান্ত শিশুরা, মারা যাচ্ছে তারাই বেশি হাইলাইট: ২০০ টাকার জন্য অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলায় রোগীর মৃত্যু মহাকাশে ডেটা সেন্টারের দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন, এআই ভবিষ্যৎ ঘিরে নতুন প্রতিযোগিতা

স্টারমারের সংকট আসলে ব্রিটিশ রাজনীতির গভীর অসুখ

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এখন এমন এক রাজনৈতিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত স্থিতি ও লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ প্রায় এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেছে। গত কয়েক দিনের নাটকীয় অস্থিরতা শুধু একজন নেতার জনপ্রিয়তা হারানোর গল্প নয়; এটি এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন, যেখানে দল, নীতি ও আদর্শ ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে পড়ে, আর ক্ষমতায় টিকে থাকাই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য।

স্টারমারের সমর্থকেরা বলছেন, এই সংকটের মধ্যেও তিনি দায়িত্বশীল আচরণ করছেন। তাঁদের যুক্তি, নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রতিযোগিতা শুরু হলে অর্থনীতি আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, বাজারে আতঙ্ক বাড়বে এবং সরকার কার্যত অচল হয়ে যাবে। স্টারমার নিজেও বিশ্বাস করেন, তিনি সরে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তাঁর দৃষ্টিতে এটি ব্যক্তিগত ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়াস।

কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—একটি রাজনৈতিক দল কি কেবল তার নেতাকে রক্ষা করার যন্ত্রে পরিণত হতে পারে?

লেবার পার্টির ইতিহাস, দর্শন ও সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল সমষ্টিগত রাজনীতির ধারণার ওপর। দলটি বহুবার নিজেদের পুনর্গঠন করেছে, আদর্শ বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু একটি বিষয় সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল: দল নেতার চেয়ে বড়। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, পুরো রাজনৈতিক কাঠামো যেন স্টারমারের ব্যক্তিগত টিকে থাকার যুক্তিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।

Britain in Turmoil: Why Keir Starmer is Now Fighting for Survival as  Cabinet Resignations and a 'Reform UK' Surge Rock Labour

এই সংকটকে কেবল নেতৃত্বের সংকট বললে ভুল হবে। এটি আসলে ধারণার সংকট। ব্রিটিশ রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ভিশনের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতা, মধ্যপন্থা ও “স্থিতিশীলতা” শব্দগুলো এত বেশি ব্যবহার হয়েছে যে রাজনীতির প্রাণশক্তিই যেন নিঃশেষ হতে বসেছে। স্টারমার সেই ধারারই প্রতিনিধি—সতর্ক, হিসেবি, ঝুঁকি এড়িয়ে চলা এক রাজনীতিক, যিনি বিরোধী দলে থাকাকালে হয়তো কার্যকর ছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই একই পদ্ধতি তাঁকে দুর্বল করে তুলেছে।

সমস্যা হলো, জনগণ কেবল দক্ষ ব্যবস্থাপক চায় না; তারা দিকনির্দেশনাও চায়। তারা জানতে চায়, সরকার দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জনসেবার অবনতি, শিল্পখাতের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ব্রিটেন এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন শুধু “স্থিতিশীলতা” শব্দ দিয়ে জনগণের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়।

স্টারমারের নেতৃত্বের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো তাঁর রাজনৈতিক কল্পনার অভাব। তিনি প্রায়ই এমন ভাষায় কথা বলেন, যা বিরোধ সৃষ্টি এড়িয়ে চলে, কিন্তু একই সঙ্গে অনুপ্রেরণাও জাগাতে ব্যর্থ হয়। তাঁর সরকার কী ধরনের পরিবর্তন আনতে চায়, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে বিরোধীরা তাঁকে আক্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছে, আবার নিজের দলও আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে।

এই অবস্থায় দলের ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই জোরালো হচ্ছে। ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের মতো নেতারা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন, সরকারের ভেতরে আদৌ কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা আছে কি না। আবার অ্যান্ডি বার্নহামের মতো জনপ্রিয় আঞ্চলিক নেতাদের নামও সামনে আসছে। এসব ইঙ্গিত দেখাচ্ছে, সংকটটি আর কেবল গুঞ্জনের পর্যায়ে নেই; এটি এখন বাস্তব রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিয়েছে।

The UK's shrinking centre is Keir Starmer's real crisis | Opinions | Al  Jazeera

 

তবে স্টারমারের সবচেয়ে বড় শক্তি এখনো তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতা। যারা তাঁকে সরাতে চান, তাঁদের মধ্যেও ঐক্য নেই। সংখ্যার রাজনীতিতে সেটিই আপাতত তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকা আর কার্যকরভাবে শাসন করা এক বিষয় নয়। একজন প্রধানমন্ত্রী কেবল পদ ধরে রাখলেই প্রকৃত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি এবং দলের আস্থা—যার অনেকটাই এখন ক্ষয়ে গেছে।

ইতিহাসে বহু নেতা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেছেন যে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। হয়তো প্রতিপক্ষ ভুল করবে, হয়তো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, হয়তো জনমত পাল্টে যাবে। রাজনীতিতে এমন অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের ঘটনাও আছে। কিন্তু প্রতিটি সংকটের একটি বাস্তব সীমা থাকে। যখন দল নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, তখন সংকট আর ব্যক্তিগত থাকে না; সেটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।

স্টারমারের সামনে এখন মূলত দুটি পথ খোলা। তিনি আরও কিছুদিন ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে সময় কিনতে পারেন। অথবা তিনি বুঝতে পারেন যে কখনও কখনও সরে যাওয়াও নেতৃত্বের অংশ। কারণ রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক নেতা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছেন শুধু এজন্য নয় যে তাঁরা ভুল করেছিলেন, বরং এজন্য যে তাঁরা সঠিক সময়টি চিনতে পারেননি।

জনপ্রিয় সংবাদ

বান্দরবানে মাটি ধসে ইটভাটার শ্রমিক নিহত

স্টারমারের সংকট আসলে ব্রিটিশ রাজনীতির গভীর অসুখ

০৬:৪৬:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এখন এমন এক রাজনৈতিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত স্থিতি ও লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ প্রায় এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেছে। গত কয়েক দিনের নাটকীয় অস্থিরতা শুধু একজন নেতার জনপ্রিয়তা হারানোর গল্প নয়; এটি এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন, যেখানে দল, নীতি ও আদর্শ ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে পড়ে, আর ক্ষমতায় টিকে থাকাই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য।

স্টারমারের সমর্থকেরা বলছেন, এই সংকটের মধ্যেও তিনি দায়িত্বশীল আচরণ করছেন। তাঁদের যুক্তি, নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রতিযোগিতা শুরু হলে অর্থনীতি আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, বাজারে আতঙ্ক বাড়বে এবং সরকার কার্যত অচল হয়ে যাবে। স্টারমার নিজেও বিশ্বাস করেন, তিনি সরে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তাঁর দৃষ্টিতে এটি ব্যক্তিগত ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়াস।

কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—একটি রাজনৈতিক দল কি কেবল তার নেতাকে রক্ষা করার যন্ত্রে পরিণত হতে পারে?

লেবার পার্টির ইতিহাস, দর্শন ও সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল সমষ্টিগত রাজনীতির ধারণার ওপর। দলটি বহুবার নিজেদের পুনর্গঠন করেছে, আদর্শ বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু একটি বিষয় সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল: দল নেতার চেয়ে বড়। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, পুরো রাজনৈতিক কাঠামো যেন স্টারমারের ব্যক্তিগত টিকে থাকার যুক্তিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।

Britain in Turmoil: Why Keir Starmer is Now Fighting for Survival as  Cabinet Resignations and a 'Reform UK' Surge Rock Labour

এই সংকটকে কেবল নেতৃত্বের সংকট বললে ভুল হবে। এটি আসলে ধারণার সংকট। ব্রিটিশ রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ভিশনের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতা, মধ্যপন্থা ও “স্থিতিশীলতা” শব্দগুলো এত বেশি ব্যবহার হয়েছে যে রাজনীতির প্রাণশক্তিই যেন নিঃশেষ হতে বসেছে। স্টারমার সেই ধারারই প্রতিনিধি—সতর্ক, হিসেবি, ঝুঁকি এড়িয়ে চলা এক রাজনীতিক, যিনি বিরোধী দলে থাকাকালে হয়তো কার্যকর ছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই একই পদ্ধতি তাঁকে দুর্বল করে তুলেছে।

সমস্যা হলো, জনগণ কেবল দক্ষ ব্যবস্থাপক চায় না; তারা দিকনির্দেশনাও চায়। তারা জানতে চায়, সরকার দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জনসেবার অবনতি, শিল্পখাতের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ব্রিটেন এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন শুধু “স্থিতিশীলতা” শব্দ দিয়ে জনগণের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়।

স্টারমারের নেতৃত্বের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো তাঁর রাজনৈতিক কল্পনার অভাব। তিনি প্রায়ই এমন ভাষায় কথা বলেন, যা বিরোধ সৃষ্টি এড়িয়ে চলে, কিন্তু একই সঙ্গে অনুপ্রেরণাও জাগাতে ব্যর্থ হয়। তাঁর সরকার কী ধরনের পরিবর্তন আনতে চায়, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে বিরোধীরা তাঁকে আক্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছে, আবার নিজের দলও আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে।

এই অবস্থায় দলের ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই জোরালো হচ্ছে। ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের মতো নেতারা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন, সরকারের ভেতরে আদৌ কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা আছে কি না। আবার অ্যান্ডি বার্নহামের মতো জনপ্রিয় আঞ্চলিক নেতাদের নামও সামনে আসছে। এসব ইঙ্গিত দেখাচ্ছে, সংকটটি আর কেবল গুঞ্জনের পর্যায়ে নেই; এটি এখন বাস্তব রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিয়েছে।

The UK's shrinking centre is Keir Starmer's real crisis | Opinions | Al  Jazeera

 

তবে স্টারমারের সবচেয়ে বড় শক্তি এখনো তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতা। যারা তাঁকে সরাতে চান, তাঁদের মধ্যেও ঐক্য নেই। সংখ্যার রাজনীতিতে সেটিই আপাতত তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকা আর কার্যকরভাবে শাসন করা এক বিষয় নয়। একজন প্রধানমন্ত্রী কেবল পদ ধরে রাখলেই প্রকৃত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি এবং দলের আস্থা—যার অনেকটাই এখন ক্ষয়ে গেছে।

ইতিহাসে বহু নেতা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেছেন যে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। হয়তো প্রতিপক্ষ ভুল করবে, হয়তো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, হয়তো জনমত পাল্টে যাবে। রাজনীতিতে এমন অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের ঘটনাও আছে। কিন্তু প্রতিটি সংকটের একটি বাস্তব সীমা থাকে। যখন দল নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, তখন সংকট আর ব্যক্তিগত থাকে না; সেটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।

স্টারমারের সামনে এখন মূলত দুটি পথ খোলা। তিনি আরও কিছুদিন ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে সময় কিনতে পারেন। অথবা তিনি বুঝতে পারেন যে কখনও কখনও সরে যাওয়াও নেতৃত্বের অংশ। কারণ রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক নেতা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছেন শুধু এজন্য নয় যে তাঁরা ভুল করেছিলেন, বরং এজন্য যে তাঁরা সঠিক সময়টি চিনতে পারেননি।