ব্রিটেনের রাজনীতিতে আবারও অস্থিরতা। ক্ষমতাসীন দল চাপের মুখে, প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নবিদ্ধ, বিরোধীরা বিশৃঙ্খল, আর ভোটারদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। কিন্তু এই সংকটের কেন্দ্র কোথায়? সমস্যা কি শুধু নেতৃত্বে, নাকি পুরো রাজনৈতিক কাঠামোতেই? নাকি আরও গভীরে গিয়ে দেখতে হবে—সমস্যার মূল আসলে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সংঘাতে?
ব্রিটিশ রাজনীতির সাম্প্রতিক চিত্র দেখলে সহজেই মনে হতে পারে, সবকিছুর দায় বর্তায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। কিয়ার স্টারমারকে অনেকে দুর্বল ও অনুপ্রেরণাহীন নেতা হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন লেবার পার্টির ভিতরকার বিভক্তিই আজকের অচলাবস্থার কারণ। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো হয়তো খুবই সরলীকৃত। কারণ একই ধরনের অস্থিরতা কনজারভেটিভদের সময়েও ছিল, এখনো আছে, এবং ভবিষ্যতেও থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
এক দশকের মধ্যে সাতজন প্রধানমন্ত্রী বদলে যাওয়া শুধু নেতৃত্ব সংকটের গল্প নয়; এটি আরও বড় এক জাতীয় বিভ্রান্তির লক্ষণ। রাজনৈতিক দল পাল্টেছে, মুখ বদলেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে জনমতের যে অস্বস্তিকর অস্বীকার, তা বদলায়নি।
সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে এক ধরনের সম্মিলিত আত্মপ্রবঞ্চনা। ব্রিটিশ ভোটাররা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা থাকবে শক্তিশালী, পেনশন বাড়বে নিয়মিত, কল্যাণমূলক ব্যয় কমবে না, সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা কর বৃদ্ধির বিরোধী। অর্থাৎ রাষ্ট্র থেকে আরও বেশি সেবা প্রত্যাশা করা হচ্ছে, কিন্তু সেই ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে—সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে কেউ রাজি নয়।

কখনো ব্রিটিশ রাজনীতিতে আর্থিক সংযমকে রাজনৈতিক সততার অংশ হিসেবে দেখা হতো। মার্গারেট থ্যাচারের সময়কার রাজনীতিতে “যত আয়, তত ব্যয়” ধারণাটি ছিল কেন্দ্রীয় নীতি। রাষ্ট্রের অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ শেষ পর্যন্ত জনগণের পকেট থেকেই আসে—এই বাস্তবতাকে তিনি রাজনৈতিক ভাষ্যে পরিণত করেছিলেন।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছিল, বৈশ্বিক পরিবেশ ছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল, ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যয়ও কমে এসেছিল। ফলে সরকারগুলো কর না বাড়িয়েও ব্যয় বাড়াতে পেরেছিল। ধীরে ধীরে জনগণের মধ্যে এমন এক প্রত্যাশা তৈরি হয় যে রাষ্ট্র সবসময় আরও বেশি দিতে পারবে।
সমস্যা হলো, সেই অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখন আর নেই। বিশ্বজুড়ে ধাক্কার পর ধাক্কা—মন্দা, মহামারি, যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট—সরকারি অর্থভান্ডারকে চাপে ফেলেছে। প্রবৃদ্ধি কমেছে, ঋণ বেড়েছে, কিন্তু জনমানসে সেই পুরোনো প্রত্যাশা অটুট রয়েছে। যেন অর্থনীতি বদলালেও রাষ্ট্রের সক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকবে।
রাজনীতিবিদরাও এই মানসিকতার সুযোগ নিচ্ছেন। কেউই ভোটারদের সামনে কঠিন সত্য বলতে চান না। কারণ বাস্তবতা স্বীকার করে সংস্কারের চেষ্টা করলে তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়। সামাজিক সেবা খাতে ব্যয় সংস্কার বা কর বৃদ্ধির মতো প্রস্তাব নিয়ে যে রাজনীতিক সামনে আসেন, তিনি প্রায়ই জনরোষের মুখে পড়েন।
ফলে রাজনীতি পরিণত হয়েছে এমন এক প্রতিযোগিতায়, যেখানে সবাই বেশি প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু ব্যয়ের উৎস নিয়ে নীরব থাকে। বরিস জনসনের জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ ছিল এই মানসিকতাকে রাজনৈতিক ভাষা দেওয়া—কল্যাণও থাকবে, করও বাড়বে না। বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে যার মিল কম, কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে যার আবেদন প্রবল।

লেবারও সেই একই ফাঁদে হাঁটছে। নির্বাচনের আগে “কর্মজীবী মানুষের ওপর কর বাড়ানো হবে না” বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যদিও সরকারি হিসাবই দেখাচ্ছিল যে রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে ফাঁক ক্রমশ বাড়ছে। একই সময়ে কল্যাণ ব্যয় সংস্কারের সামান্য উদ্যোগও দলীয় চাপে পিছিয়ে গেছে।
এদিকে রাষ্ট্রীয় ঋণ জিডিপির প্রায় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ অর্থনীতি এখনো পূর্ণমাত্রার সংকটে না পড়লেও ঋণ কমানোর কোনো বাস্তব পরিকল্পনা নেই। বরং ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি অব্যাহত। জ্বালানি নীতি থেকে শুরু করে সামাজিক ব্যয়—অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে জনপ্রিয়তার হিসাব কষে, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতি বিবেচনা না করে।
এই অবস্থায় ভোটারদের হতাশা বাড়ছে। তারা মনে করছে সরকার “ডেলিভার” করতে পারছে না। কিন্তু একই সঙ্গে সেই ভোটাররাই এমন নীতির বিরোধিতা করছেন, যা বাস্তবে অর্থনীতিকে টেকসই করতে পারে। ফলে এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে: অবাস্তব প্রত্যাশা, তার ভিত্তিতে দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, তারপর ব্যর্থতা, এবং শেষে নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি।
নাইজেল ফারাজের মতো রাজনীতিকরা এই অসন্তোষের রাজনৈতিক ফসল তুলছেন। কিন্তু তারাও কঠিন আর্থিক বাস্তবতা নিয়ে স্পষ্ট নন। বরং জনপ্রিয় কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি ধরে রেখেই তারা বিকল্প রাজনীতির দাবি তুলছেন। এতে জনঅসন্তোষের রাজনৈতিক রূপ তৈরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিক সমাধান তৈরি হচ্ছে না।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের প্রতিক্রিয়া। ব্রিটেনের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি আর্থিক শৃঙ্খলার অভাবও লক্ষ্য করছেন। কয়েক বছর আগেও ব্রিটেন তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নিতে পারত; এখন পরিস্থিতি অনেক কঠিন। এর অর্থ ভবিষ্যতে সরকারি ব্যয়ের আরও বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যাবে।
ইতিহাস বলে, রাষ্ট্র একদিনে ধসে পড়ে না। কিন্তু যখন ঋণ, রাজনৈতিক অস্বীকার আর অর্থনৈতিক বাস্তবতার ফারাক খুব বেশি হয়ে যায়, তখন পরিস্থিতি হঠাৎ করেই ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপের ঋণ সংকট তার উদাহরণ। একসময় এসে সরকারকে ব্যয় কাটতে হয়, জীবনযাত্রার মান পড়ে যায়, সমাজে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়।
ব্রিটেন এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু যে পথে এগোচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। এই সংকটের সমাধান শুধু নতুন নেতা নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক সততা। এমন নেতৃত্ব, যারা জনগণকে খুশি করার বদলে বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে প্রস্তুত থাকবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আবার ভোটারদের কাছেই ফিরে আসে। জনগণ কি সত্য শুনতে প্রস্তুত? নাকি তারা এমন প্রতিশ্রুতিই শুনতে চাইবে, যা অর্থনীতির অঙ্কের সঙ্গে মেলে না?
এমা ডানকান 



















