১১:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
জাপানি কোম্পানির বিরল খনিজ আমদানি ব্যয় ২২% বেড়েছে, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে চাপ এআই একচেটিয়া হতে পারে না, বিশ্বজুড়ে সহযোগিতার আহ্বান শি জিনপিংয়ের এফবিআইর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার গ্যাং সদস্য নিতিশ কৌশল যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯% কমেছে, দামে ও পরিমাণে একসঙ্গে ধাক্কা বিশ্বকাপের শেষ বাঁশির পর: ফুটবল যে আয়নায় আমেরিকা ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ দেখা গেল প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা? শুধু শ্রদ্ধা নয়, শহীদ সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব এখনই পালন করতে হবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের সতর্কবার্তা: প্রবৃদ্ধি ৩.৫%, মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে নামার শঙ্কা বাগেরহাটে ঘরে মিলল দম্পতির মরদেহ, পাশে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার দেড় মাসের শিশু

সাংবাদিকতার সামনে নতুন যুদ্ধ: সত্য বলার মূল্য কেন এত বেড়ে গেছে

বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতা আজ এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যখন শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই নয়, সত্য প্রকাশ করাও প্রাণঘাতী ঝুঁকির সমান হয়ে উঠেছে। যুদ্ধক্ষেত্র, রাজনৈতিক মেরুকরণ, রাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যে সংবাদকর্মীরা এখন আর কেবল ঘটনাবলির পর্যবেক্ষক নন; অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিজেই সংঘাতের লক্ষ্যবস্তু।

গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। গাজা, পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন কিংবা ইয়েমেন—এসব অঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহ মানে প্রতিদিন মৃত্যুর সম্ভাবনার সঙ্গে বসবাস করা। যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকদের উপস্থিতি একসময় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরপেক্ষ অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এখন সেই সীমারেখা ভেঙে পড়ছে। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন কিংবা প্রেস জ্যাকেট আর নিরাপত্তার প্রতীক নয়।

গাজায় কাজ করা সাংবাদিকদের বাস্তবতা আজ ভয়াবহ। সেখানে কোন রাস্তা নিরাপদ, কোন এলাকায় গুলি শুরু হতে পারে, কোথায় বিমান হামলা নামতে পারে—কেউ নিশ্চিত নয়। প্রতিদিনের কাজ শুরু করার আগে স্থানীয় সাংবাদিকদের নিজেদের রুট যাচাই করতে হয়, আত্মীয়স্বজনকে অবস্থান জানাতে হয়, একা চলাফেরা এড়াতে হয়। তবুও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে এখন তথ্য সংগ্রহকারীরাও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।

পশ্চিম তীরেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সাংবাদিকরা প্রায়ই হামলার মুখে পড়ছেন। শুধু সংঘাতের কেন্দ্র নয়, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব স্পষ্ট হচ্ছে। অনেক প্রতিবেদককে এখন হেলমেট, বডি আর্মার ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামতে হচ্ছে।

লেবানন কিংবা ইউক্রেনের মতো অঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল। আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা—ড্রোন, নজরদারি প্রযুক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী ফ্রন্টলাইন—সাংবাদিকতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করছে। ড্রোন হামলার সতর্কতা পেলে সাংবাদিকদের মুহূর্তের মধ্যে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। তবুও তারা যাচ্ছেন, কারণ দূর থেকে যুদ্ধের বাস্তবতা বোঝা যায় না।

Is Objectivity in Journalism Even Possible? | Columbia Magazine

এই ঝুঁকির পেছনে শুধু পেশাগত দায়বদ্ধতা নয়, আরও বড় একটি প্রশ্ন কাজ করে—যদি সাংবাদিকরা না যান, তাহলে সত্য তুলে ধরবে কে?

বিশ্বের বিভিন্ন সরকার ও শক্তিশালী গোষ্ঠী এখন আগের চেয়ে বেশি চেষ্টা করছে নিজেদের অস্বস্তিকর বাস্তবতা আড়াল করতে। কোথাও সরাসরি সেন্সরশিপ, কোথাও আইনি চাপ, কোথাও আবার রাজনৈতিক ভাষণে সাংবাদিকদের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক গণতান্ত্রিক দেশেও সংবাদমাধ্যমের প্রতি বৈরী মনোভাব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও চরম মেরুকরণের পরিবেশে সাংবাদিকরা এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, জনসমাগম বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ছেন।

এই পরিস্থিতি শুধু সংবাদমাধ্যমের সংকট নয়; এটি গণতন্ত্রের জন্যও গভীর সতর্কবার্তা। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়লে নাগরিক সমাজও অন্ধকারে চলে যায়। রাষ্ট্র, করপোরেশন বা রাজনৈতিক শক্তির জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য যে তথ্যপ্রবাহ প্রয়োজন, সেটি ভেঙে পড়তে শুরু করে।

তবুও বাস্তবতা হলো, ঝুঁকি বাড়লেও সাংবাদিকতার প্রয়োজন কমেনি; বরং বেড়েছে। যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা রাষ্ট্রের অপব্যবহার—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সেই তথ্য সংগ্রহের জন্যই এখনও সংবাদকর্মীরা সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছেন, বোমাবর্ষণের শহরে প্রবেশ করছেন, কিংবা গোলাগুলির মাঝেও ক্যামেরা চালু রাখছেন।

এ ধরনের সাংবাদিকতা ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং বিপজ্জনক। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সুরক্ষা সরঞ্জাম, ঝুঁকি মূল্যায়ন—সবকিছুর খরচ আছে। কিন্তু এর অনুপস্থিতির মূল্য আরও বেশি। কারণ তথ্যহীন সমাজ খুব দ্রুত গুজব, প্রোপাগান্ডা এবং কর্তৃত্ববাদের শিকার হয়ে পড়ে।

আজকের পৃথিবীতে স্বাধীন সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি গণতান্ত্রিক সমাজের আত্মরক্ষার অন্যতম উপায়। সত্য প্রকাশের এই সংগ্রাম যত কঠিন হচ্ছে, তার গুরুত্বও তত বাড়ছে। আর সেই কারণেই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং কাজের পরিবেশ রক্ষা করা এখন শুধু সংবাদমাধ্যমের দাবি নয়, নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপানি কোম্পানির বিরল খনিজ আমদানি ব্যয় ২২% বেড়েছে, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে চাপ

সাংবাদিকতার সামনে নতুন যুদ্ধ: সত্য বলার মূল্য কেন এত বেড়ে গেছে

০৭:১৮:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতা আজ এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যখন শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই নয়, সত্য প্রকাশ করাও প্রাণঘাতী ঝুঁকির সমান হয়ে উঠেছে। যুদ্ধক্ষেত্র, রাজনৈতিক মেরুকরণ, রাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যে সংবাদকর্মীরা এখন আর কেবল ঘটনাবলির পর্যবেক্ষক নন; অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিজেই সংঘাতের লক্ষ্যবস্তু।

গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। গাজা, পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন কিংবা ইয়েমেন—এসব অঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহ মানে প্রতিদিন মৃত্যুর সম্ভাবনার সঙ্গে বসবাস করা। যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকদের উপস্থিতি একসময় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরপেক্ষ অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এখন সেই সীমারেখা ভেঙে পড়ছে। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন কিংবা প্রেস জ্যাকেট আর নিরাপত্তার প্রতীক নয়।

গাজায় কাজ করা সাংবাদিকদের বাস্তবতা আজ ভয়াবহ। সেখানে কোন রাস্তা নিরাপদ, কোন এলাকায় গুলি শুরু হতে পারে, কোথায় বিমান হামলা নামতে পারে—কেউ নিশ্চিত নয়। প্রতিদিনের কাজ শুরু করার আগে স্থানীয় সাংবাদিকদের নিজেদের রুট যাচাই করতে হয়, আত্মীয়স্বজনকে অবস্থান জানাতে হয়, একা চলাফেরা এড়াতে হয়। তবুও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে এখন তথ্য সংগ্রহকারীরাও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।

পশ্চিম তীরেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সাংবাদিকরা প্রায়ই হামলার মুখে পড়ছেন। শুধু সংঘাতের কেন্দ্র নয়, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব স্পষ্ট হচ্ছে। অনেক প্রতিবেদককে এখন হেলমেট, বডি আর্মার ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামতে হচ্ছে।

লেবানন কিংবা ইউক্রেনের মতো অঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল। আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা—ড্রোন, নজরদারি প্রযুক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী ফ্রন্টলাইন—সাংবাদিকতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করছে। ড্রোন হামলার সতর্কতা পেলে সাংবাদিকদের মুহূর্তের মধ্যে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। তবুও তারা যাচ্ছেন, কারণ দূর থেকে যুদ্ধের বাস্তবতা বোঝা যায় না।

Is Objectivity in Journalism Even Possible? | Columbia Magazine

এই ঝুঁকির পেছনে শুধু পেশাগত দায়বদ্ধতা নয়, আরও বড় একটি প্রশ্ন কাজ করে—যদি সাংবাদিকরা না যান, তাহলে সত্য তুলে ধরবে কে?

বিশ্বের বিভিন্ন সরকার ও শক্তিশালী গোষ্ঠী এখন আগের চেয়ে বেশি চেষ্টা করছে নিজেদের অস্বস্তিকর বাস্তবতা আড়াল করতে। কোথাও সরাসরি সেন্সরশিপ, কোথাও আইনি চাপ, কোথাও আবার রাজনৈতিক ভাষণে সাংবাদিকদের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক গণতান্ত্রিক দেশেও সংবাদমাধ্যমের প্রতি বৈরী মনোভাব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও চরম মেরুকরণের পরিবেশে সাংবাদিকরা এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, জনসমাগম বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ছেন।

এই পরিস্থিতি শুধু সংবাদমাধ্যমের সংকট নয়; এটি গণতন্ত্রের জন্যও গভীর সতর্কবার্তা। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়লে নাগরিক সমাজও অন্ধকারে চলে যায়। রাষ্ট্র, করপোরেশন বা রাজনৈতিক শক্তির জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য যে তথ্যপ্রবাহ প্রয়োজন, সেটি ভেঙে পড়তে শুরু করে।

তবুও বাস্তবতা হলো, ঝুঁকি বাড়লেও সাংবাদিকতার প্রয়োজন কমেনি; বরং বেড়েছে। যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা রাষ্ট্রের অপব্যবহার—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সেই তথ্য সংগ্রহের জন্যই এখনও সংবাদকর্মীরা সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছেন, বোমাবর্ষণের শহরে প্রবেশ করছেন, কিংবা গোলাগুলির মাঝেও ক্যামেরা চালু রাখছেন।

এ ধরনের সাংবাদিকতা ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং বিপজ্জনক। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সুরক্ষা সরঞ্জাম, ঝুঁকি মূল্যায়ন—সবকিছুর খরচ আছে। কিন্তু এর অনুপস্থিতির মূল্য আরও বেশি। কারণ তথ্যহীন সমাজ খুব দ্রুত গুজব, প্রোপাগান্ডা এবং কর্তৃত্ববাদের শিকার হয়ে পড়ে।

আজকের পৃথিবীতে স্বাধীন সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি গণতান্ত্রিক সমাজের আত্মরক্ষার অন্যতম উপায়। সত্য প্রকাশের এই সংগ্রাম যত কঠিন হচ্ছে, তার গুরুত্বও তত বাড়ছে। আর সেই কারণেই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং কাজের পরিবেশ রক্ষা করা এখন শুধু সংবাদমাধ্যমের দাবি নয়, নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব।