দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনলাইন প্রতারণা চক্র নিয়ে গত কয়েক বছরে যত আলোচনা হয়েছে, তার বেশিরভাগই ঘুরেছে মিয়ানমার, কম্বোডিয়া কিংবা লাওসকে কেন্দ্র করে। সীমান্তঘেঁষা বিচ্ছিন্ন অঞ্চল, দুর্বল প্রশাসনিক নজরদারি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছিল বিশাল সব সাইবার প্রতারণা কেন্দ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, কড়া অভিযান কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেয় না যদি সেই অপরাধের আর্থিক কাঠামো ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকে। ফলে এক দেশ থেকে উৎখাত হওয়া চক্র আরেক দেশে আশ্রয় নিচ্ছে। এখন সেই নতুন গন্তব্য হিসেবে উঠে আসছে শ্রীলঙ্কার নাম।
এটি কেবল একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা সংকট নয়; বরং গোটা অঞ্চলের জন্য নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। কারণ এই অপরাধ আর প্রচলিত সীমান্তের ভেতরে আবদ্ধ নেই। একটি দেশে বসে অন্য দেশের নাগরিককে প্রতারণা করা, তৃতীয় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা এবং চতুর্থ দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে কাজে লাগানো এখন খুবই সাধারণ ঘটনা। এই বহুমাত্রিক অপরাধের বিরুদ্ধে এককভাবে কোনো রাষ্ট্র কার্যকর হতে পারছে না।
শ্রীলঙ্কায় চলতি বছরের কয়েক মাসেই হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হওয়া ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্তদের বড় অংশ এসেছে সেইসব অঞ্চল থেকে যেখানে আগে থেকেই সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শত শত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ পাচারের মতো ঘটনা, যা বড় পরিসরের ডিজিটাল জালিয়াতির প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
এই অপরাধচক্রগুলোর কার্যক্রমের ধরনও বদলেছে। শুরুতে তারা প্রধানত চীনা ভাষাভাষী মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করলেও এখন বহু ভাষায় পরিচালিত হচ্ছে প্রতারণা। ভুয়া প্রেমের সম্পর্ক, ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগ, অনলাইন জুয়া কিংবা উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই শিল্পে জোরপূর্বক শ্রম ও মানব পাচারের উপাদানও জড়িয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু প্রতারণা কেন্দ্রে মানুষকে চাকরির প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে বন্দি করে কাজ করানোর অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।

শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর, কারণ দেশটি দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটের পর পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। পর্যটন খাতকে পুনর্জীবিত করতে সহজ ভিসা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নত হয়েছে। কিন্তু যেসব নীতি বৈধ অর্থনীতিকে সহায়তা করার জন্য নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকেই এখন অপরাধী নেটওয়ার্ক নিজেদের সুবিধায় ব্যবহার করছে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বৈশ্বিক অপরাধচক্র সবসময় সেইসব রাষ্ট্রকে বেছে নেয় যেখানে অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে উপস্থিত থাকে।
এখানে আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো, আঞ্চলিক দমন অভিযান অনেক সময় অপরাধকে নির্মূল না করে শুধু স্থানান্তরিত করে। মিয়ানমার বা কম্বোডিয়ায় অভিযান বাড়ার পর চক্রগুলো নতুন নিরাপদ আশ্রয় খুঁজবে—এটি অনুমান করা কঠিন ছিল না। প্রশ্ন হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কি সেই সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত ছিল? বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, প্রস্তুতি ছিল সীমিত।
চীনের উদ্বেগও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতারণা চক্রের বড় অংশ বহু বছর ধরে চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে। বেইজিং এখন বুঝতে পারছে, এটি আর কেবল সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকার সমস্যা নয়; বরং একটি চলমান আঞ্চলিক অপরাধ অর্থনীতি। ফলে আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ অভিযানের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে শুধুমাত্র পুলিশি অভিযান যথেষ্ট হবে না। কারণ এই নেটওয়ার্কগুলো অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম। একটি দেশে চাপ বাড়লে তারা অন্য দেশে সরে যায়, নতুন ভাষা ব্যবহার করে, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করে এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। অভিবাসন তদারকি, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—সবকিছু একসঙ্গে প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মানবিক দিকটিও ভুলে গেলে চলবে না। জাতিসংঘের হিসাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতারণা কেন্দ্রে লাখ লাখ মানুষ পাচারের শিকার হয়েছে। ফলে এই শিল্পকে কেবল সাইবার অপরাধ হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্র ধরা পড়বে না। এটি একই সঙ্গে মানব পাচার, আর্থিক অপরাধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট।
শ্রীলঙ্কা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলে দেশটি আন্তর্জাতিক প্রতারণা নেটওয়ার্কের স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে। আর যদি সেটি ঘটে, তবে ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক হবে না; আন্তর্জাতিক আস্থাও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটাই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা—ডিজিটাল অপরাধের যুগে কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















