আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ব্যবসা ও অভিজাত সমাজের অন্দরমহলে বহু বছর ধরে প্রভাব বিস্তার করা জেফ্রি এপস্টেইনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও কংগ্রেস সাম্প্রতিক সময়ে লাখ লাখ নথি প্রকাশ করার পর সামনে এসেছে বহু অজানা তথ্য। সেই নথি, আদালতের কাগজপত্র এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস, অপরাধের ধরন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কী ছিল এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
জেফ্রি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী ও তরুণীদের যৌন নির্যাতন, পাচার এবং ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে উঠে আসে, ফ্লোরিডা ও নিউইয়র্কে তিনি প্রভাব ও অর্থ ব্যবহার করে এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। তার দীর্ঘদিনের সহযোগী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল তরুণীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে এপস্টেইনের কাছে নিয়ে আসতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি, ম্যাসাজ থেরাপি বা মডেলিংয়ের সুযোগের কথা বলা হতো।
২০১৯ সালে এপস্টেইনের মৃত্যুর পর শত শত নারী সামনে এসে অভিযোগ করেন যে, তারা কিশোরী বয়সেই তার নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ভুক্তভোগীদের একজন ভার্জিনিয়া জিউফ্রেও পরবর্তীতে আত্মহত্যা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কীভাবে এতদিন পার পেয়েছিলেন
নতুন প্রকাশিত নথিগুলোতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা একাধিকবার সুযোগ পাওয়ার পরও এপস্টেইনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। ১৯৯৬ সালে এফবিআইয়ের কাছে অভিযোগ গিয়েও তা গুরুত্ব পায়নি। পরে ২০০৮ সালে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোরীর সঙ্গে যৌন অপরাধের মামলায় তুলনামূলক হালকা সাজা পান। সেই চুক্তির ফলে তার সম্ভাব্য সহযোগীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কারাগারে থাকলেও তাকে অফিসে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। মাত্র ১৩ মাসের মধ্যে মুক্তি পেয়ে আবারও তিনি উচ্চবিত্ত সমাজে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পরবর্তী কয়েক বছরেও একাধিক ফেডারেল তদন্ত হলেও তাকে নতুন করে অভিযুক্ত করা হয়নি।

অর্থ ও প্রভাবের বিস্তার
তদন্তে উঠে এসেছে, এপস্টেইন ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে বিপুল সম্পদের মালিক হন। তিনি প্রথমে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বেয়ার স্টার্নসে কাজ করতেন। পরে বিভিন্ন আর্থিক কৌশল ও বিতর্কিত বিনিয়োগ পরিকল্পনার মাধ্যমে ধনীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেন।
ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের মালিক লেসলি ওয়েক্সনারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ওয়েক্সনার পরবর্তীতে অভিযোগ করেন, এপস্টেইন তার কাছ থেকে ১০০ মিলিয়নের বেশি ডলার আত্মসাৎ করেছিলেন। এছাড়া বড় বড় ব্যাংকও বহু বছর ধরে তার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন চালিয়ে যায়, যদিও ভেতরে ভেতরে উদ্বেগ ছিল অর্থপাচারের সম্ভাবনা নিয়ে।
ট্রাম্প ও ক্লিনটনের সঙ্গে সম্পর্ক
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিল ক্লিনটনের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ১৯৮০–এর দশকে। তারা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে সময় কাটাতেন। কিছু ভুক্তভোগী ট্রাম্পের মার-আ-লাগো ক্লাব থেকেই এপস্টেইনের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি বহু আগেই এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন।
অন্যদিকে বিল ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এপস্টেইন একাধিকবার হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন। পরে ক্লিনটনকে নিয়ে আফ্রিকা সফরও করেছিলেন এপস্টেইন। তবে ট্রাম্প ও ক্লিনটন দুজনই দাবি করেছেন, তারা এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে কিছু জানতেন না।
মৃত্যু ঘিরে রহস্য
২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে এপস্টেইনের মৃত্যু আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করা হয়। তবে সেই ঘটনার পর থেকেই নানা প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। তদন্তে জানা যায়, মৃত্যুর আগের রাতে তাকে একা রাখা হয়েছিল এবং দায়িত্বরত দুই নিরাপত্তাকর্মী নিয়ম অনুযায়ী তদারকি করেননি।
সম্প্রতি আদালত একটি হাতে লেখা নোট প্রকাশ করেছে, যা এপস্টেইনের লেখা বলে দাবি করা হলেও তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। বিচার বিভাগ ২০২৩ সালে নতুন করে তদন্ত করেও হত্যার কোনো প্রমাণ পায়নি বলে জানায়।
এপস্টেইন ফাইলস নিয়ে বিতর্ক
এপস্টেইন সম্পর্কিত নথিপত্র প্রকাশের পর নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথির মধ্যে আদালতের কাগজপত্র, ফ্লাইট লগ, ব্যাংক নথি এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য রয়েছে। তবে অনেক নথি আংশিক গোপন রাখা হয়েছে বা সম্পাদনা করা হয়েছে। এতে করে গোপন তথ্য আড়াল করার অভিযোগও উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















