দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক শক্তি হিসেবে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্যদিকে নিজেদের গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা—সব মিলিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ শীতল যুদ্ধের যুগ। এই সময়ে আমেরিকার ভেতরেও চলেছে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন। নাগরিক অধিকার আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ, নারীর অধিকার এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলতার উত্থান—সবকিছু মিলে আমেরিকার সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলে।
শীতল যুদ্ধের ছায়া
১৯৪০-এর দশকের শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। ইউরোপে প্রভাব বিস্তার, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশে প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে এই সংঘাত কয়েক দশক ধরে চলতে থাকে। কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল সেই দ্বন্দ্বের বড় উদাহরণ। পারমাণবিক ধ্বংসের আশঙ্কা বিশ্বকে এক অদ্ভুত আতঙ্কের মধ্যে রাখলেও সরাসরি যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল পারস্পরিক ধ্বংসের ভয়ের কারণে।

টেলিভিশনের যুগে বদলে যাওয়া আমেরিকা
১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে টেলিভিশন আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন, পুলিশের নির্যাতন এবং যুদ্ধের নির্মম চিত্র টেলিভিশনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে আসে। এতে নাগরিক অধিকার আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একই সময়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে আমেরিকার এক আদর্শিক চিত্র তুলে ধরা হচ্ছিল।
কেনেডির উত্থান ও অসমাপ্ত স্বপ্ন
জন এফ কেনেডি ছিলেন টেলিভিশন যুগের প্রথম বড় রাজনৈতিক তারকা। তরুণ ও আত্মবিশ্বাসী এই প্রেসিডেন্ট আমেরিকাকে নতুন এক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় তার কূটনৈতিক দক্ষতা বিশ্বকে সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে রক্ষা করে। তবে ১৯৬৩ সালে তার হত্যাকাণ্ড আমেরিকাকে গভীর শোকের মধ্যে ফেলে দেয়। অনেকের কাছে কেনেডি রয়ে যান অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে।
নাগরিক অধিকার আন্দোলনের জয়
এই সময়ে কৃষ্ণাঙ্গদের সমঅধিকারের দাবিতে শুরু হয় শক্তিশালী আন্দোলন। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। টেলিভিশনে বর্ণবাদী সহিংসতার দৃশ্য প্রচারিত হওয়ার পর জনমত দ্রুত বদলাতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত নাগরিক অধিকার আইন ও ভোটাধিকার আইন পাস হয়, যা আমেরিকার ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আনে। তবে ১৯৬৮ সালে কিং হত্যাকাণ্ড আবারও দেশকে অস্থির করে তোলে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও জনরোষ
ভিয়েতনাম যুদ্ধ আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে। কমিউনিজম ঠেকানোর নামে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে লাখো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকান জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যুদ্ধফেরত সেনা ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সরকারবিরোধী আন্দোলন তখন এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক বিদ্রোহে পরিণত হয়।
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ও আস্থার সংকট
১৯৭০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় ধাক্কা দেয়। ডেমোক্রেটিক পার্টির কার্যালয়ে আড়িপাতার ঘটনার তদন্ত শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তদন্তে নিক্সনের ক্ষমতার অপব্যবহার সামনে এলে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। এই ঘটনার পর সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ব্যাপকভাবে কমে যায়।

রক্ষণশীল রাজনীতির উত্থান
একই সময়ে আমেরিকায় নতুন করে ধর্মীয় ও রক্ষণশীল রাজনীতির উত্থান ঘটে। গর্ভপাতের অধিকার, নারীবাদ ও সামাজিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করে নতুন ডানপন্থী শক্তি। ধর্মীয় নেতারা রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তী কয়েক দশকে এই শক্তি আমেরিকার রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















