ভারতের তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা সি. জোসেফ বিজয়ের উত্থান শ্রীলঙ্কায় নতুন রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে দেশটির সিনহলি সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতৃত্ব ও তামিল সংখ্যালঘু রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য আবারও সামনে এনেছে দ্বীপরাষ্ট্রটির দীর্ঘদিনের জাতিগত বিভাজন।
গত সপ্তাহে শপথ নেওয়ার পরপরই শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে সামাজিক মাধ্যমে বিজয়কে অভিনন্দন জানান। তিনি ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার আশাবাদও প্রকাশ করেন। শ্রীলঙ্কার সিনহলি নেতৃত্বের বড় অংশই বিজয়ের উত্থানকে মূলত দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে দেখছে।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার তামিল রাজনীতিকরা বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তারা মনে করছেন, তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বিজয় শ্রীলঙ্কার তামিল জনগোষ্ঠীর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তামিল আইনপ্রণেতা গাজেন্দ্রকুমার পন্নাম্বলম পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত তামিলদের ন্যায্য দাবির পক্ষে বিজয়ের সমর্থন প্রত্যাশা করেছেন।
ঐতিহাসিক প্রভাব ও নতুন বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর রাজনীতি বরাবরই শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ তামিল প্রশ্নে প্রভাব ফেলেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মাত্র দুই বছর আগে গঠিত বিজয়ের দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগম রাজ্যের নির্বাচনে ২৩৪ আসনের মধ্যে ১০৮টি জিতে চমক সৃষ্টি করেছে। বহু দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা দুই প্রধান আঞ্চলিক দলকে হারিয়ে বিজয়ের এই জয়কে ঐতিহাসিক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বিজয়ের উত্থানের সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে সাবেক অভিনেতা ও তামিলনাড়ুর কিংবদন্তি মুখ্যমন্ত্রী এম.জি. রামাচন্দ্রনের। আশির দশকে তিনি প্রকাশ্যে শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহীদের সমর্থন করেছিলেন। ফলে শ্রীলঙ্কার তামিল সমাজের একাংশের মধ্যে এখনও সেই রাজনৈতিক স্মৃতি জীবন্ত।
শ্রীলঙ্কার মানবাধিকারকর্মী ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শেরিন জেভিয়ারের মতে, বিজয়ের সিনেমা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। তার শপথ অনুষ্ঠান শ্রীলঙ্কার বহু তামিল মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন। সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজয়ের ভাবমূর্তিই তাকে আলাদা জনপ্রিয়তা দিয়েছে।
তবে বর্তমান বাস্তবতা যে অতীতের মতো নয়, সেটিও স্পষ্ট করে বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ ২০০৯ সালে শেষ হওয়ার পর ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ক নতুন কৌশলগত মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এখন নয়াদিল্লির বড় উদ্বেগ।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এখন শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার মতো ঝুঁকি নিতে চায় না। বাংলাদেশ, নেপাল ও মালদ্বীপের সঙ্গে সম্পর্কের নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্য ধরে রাখতে শ্রীলঙ্কাকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে দিল্লি। তাই শ্রীলঙ্কার তামিল প্রশ্নে অতীতের মতো সক্রিয় অবস্থান নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
জেলেদের ইস্যুতে নতুন চাপ
তবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরই বিজয় শ্রীলঙ্কা-ভারত সম্পর্কের আরেকটি স্পর্শকাতর ইস্যু সামনে এনেছেন। শ্রীলঙ্কার জলসীমায় মাছ ধরার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া তামিলনাড়ুর জেলেদের মুক্তির দাবিতে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণাতেও তিনি এই ইস্যুতে সরব ছিলেন।
কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এই প্রশ্নে খুব দ্রুত কোনো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ভারতের কিছু জেলে অবৈধভাবে তাদের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ শিকার করছে। তবুও দিল্লির অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত এখনও দেখা যাচ্ছে না।
ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে শ্রীলঙ্কা-সংক্রান্ত ইস্যুতে প্রায় সব দলকেই অবস্থান নিতে হয়। তবে পররাষ্ট্রনীতির বড় সিদ্ধান্তে বিজয়ের সরাসরি প্রভাব সীমিতই থাকবে।
তামিলনাড়ুতে বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা তাই শুধু ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয় নয়, এটি শ্রীলঙ্কার জাতিগত রাজনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়কে ঘিরে শ্রীলঙ্কায় আবারও সামনে এসেছে তামিল-সিনহলি রাজনৈতিক বিভাজন ও আঞ্চলিক কূটনীতির বাস্তবতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















