ভারতের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার মনে করেন, ইতিহাসের বড় অংশ পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দিলে সমাজ নিজের অতীতকেই আর ব্যাখ্যা করতে পারবে না। ৯৪ বছর বয়সী এই ইতিহাসবিদ তাঁর নতুন স্মৃতিকথা জাস্ট বিইং প্রকাশ উপলক্ষে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ইতিহাস, শিক্ষা, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নিজের উদ্বেগ ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
নয়াদিল্লির মহারানি বাগের বাসভবনে বসে থাপার বলেন, ইতিহাস এখন রাজনৈতিক সংঘাতের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। অতীতকে ব্যবহার করা হচ্ছে বর্তমান রাজনীতিকে বৈধতা দিতে। তাঁর মতে, মুঘল যুগকে ইতিহাসের পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভারতের বাস্তবতাকেই ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যদি ইতিহাসের বিশাল অংশ সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে চারপাশে যে ইতিহাসের উপস্থিতি দেখা যায়, তা ব্যাখ্যা করা হবে কীভাবে?” তাঁর মতে, উত্তর ভারতের বহু অঞ্চলে মুঘল স্থাপত্য ও সংস্কৃতির ছাপ আজও দৃশ্যমান, অথচ সেই অধ্যায়কে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।
রোমিলা থাপারের স্মৃতিকথা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি স্বাধীন ভারতের গঠন ও পরিবর্তনের ইতিহাসও তুলে ধরেছে। করোনাকালীন সময়ে লেখা এই বই প্রকাশ নিয়ে প্রথমে দ্বিধায় ছিলেন তিনি। পরে বন্ধুদের উৎসাহে জীবদ্দশাতেই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন।
স্বাধীনতার সময় তিনি ছিলেন স্কুলছাত্রী। পুনের একটি স্কুলে ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের দায়িত্বও পেয়েছিলেন। সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর সবাই নতুন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখছিল। তবে তাঁর মতে, সেই স্বপ্নের অনেকটাই পরে থমকে যায়।
ইতিহাস নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। যদিও প্রথম ভালোবাসা ছিল উদ্ভিদবিদ্যা। পরে বাবার অনুপ্রেরণায় প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন। লন্ডনের ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ স্কুলে পড়াশোনার সময় ইতিহাসকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন তিনি। সেখানে ইতিহাসকে শুধু ঘটনাবলির ধারাবিবরণী নয়, বরং ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’—এই প্রশ্নের মাধ্যমে বিশ্লেষণের বিষয় হিসেবে শেখানো হতো।

পরে অশোককে নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। তাঁর মতে, ইতিহাসকে সমাজবিজ্ঞানের অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা সেই সময়ই শক্তিশালী হতে শুরু করে।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি কুরুক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। জেএনইউর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, একটি প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে, যা বেদনাদায়ক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, একসময় বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন জায়গা হিসেবে দেখা হতো, যেখানে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় বা উত্তর খোঁজার পথ শেখানো হয়। কিন্তু এখন সেই আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে।
সমাজে ভিন্নমত দমনের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানাতে ভয় পাচ্ছে। অনেকটা ঔপনিবেশিক সময়ের মতোই নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে চুপ থাকার চাপ তৈরি হয়েছে।
ইতিহাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবি সম্পর্কেও মন্তব্য করেন থাপার। বিশেষ করে আর্যদের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পেশাদার ইতিহাসবিদদের গবেষণা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। অনেক দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায় না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও তাঁর উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ ইচ্ছামতো তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে, যা বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। বরং এর ভালো ও খারাপ—দুই দিক সম্পর্কেই মানুষকে সচেতন থাকতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















