খাদ্য নিয়ে আমাদের জনআলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় উৎপাদন। কত ধান হলো, কত গম উঠল, কত টন খাদ্য মজুত আছে—এসব পরিসংখ্যানই যেন নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়: উৎপাদিত খাদ্যের কতটা সত্যিই মানুষের পাতে পৌঁছায়, আর পৌঁছানোর পর কতটা ব্যবহৃত হয়?
সমস্যার মূল এখানেই। বহু দেশেই এখন খাদ্য সংকটের সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। এটি কেবল খাদ্যের ঘাটতির প্রশ্ন নয়; বরং ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা, অপচয় এবং বণ্টনের দুর্বলতার প্রশ্ন। খাদ্য পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও যখন অপুষ্টি, অনাহার বা খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা টিকে থাকে, তখন বোঝা যায় সমস্যাটি উৎপাদনে নয়, ব্যবহারে।
বিশ্বজুড়ে খাদ্য অপচয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কিন্তু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে একদিকে খাদ্যের উদ্বৃত্ত থাকে, অন্যদিকে বড় জনগোষ্ঠী পুষ্টিহীনতায় ভোগে। অর্থাৎ একই ব্যবস্থার ভেতরেই প্রাচুর্য ও বঞ্চনা পাশাপাশি অবস্থান করে।
অনেক সরকার এখন বৃহৎ পরিসরে স্কুলভিত্তিক বা সামাজিক পুষ্টি কর্মসূচি চালু করছে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট—খাদ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু খাবার বিতরণ করলেই কি পুষ্টি নিশ্চিত হয়?
বাস্তবতা বলছে, না।
একটি খাবার রান্না হলো, পরিবহন করা হলো, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাল—এতেই সাফল্য সম্পূর্ণ হয় না। শেষ পর্যন্ত সেই খাবার মানুষ খেল কি না, কতটা খেল, কেন খেল না—এসব তথ্য ছাড়া পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা বোঝা অসম্ভব। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই অংশটাই অদৃশ্য থেকে যায়।
প্রাতিষ্ঠানিক খাদ্য ব্যবস্থায় অপচয় সাধারণত দুই স্তরে ঘটে। প্রথমটি সরবরাহ ও পরিচালনাগত দুর্বলতায়—অতিরিক্ত রান্না, ভুল চাহিদা অনুমান, সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা বা বিতরণে বিলম্ব। দ্বিতীয়টি আচরণগত কারণে—খাবারের স্বাদ, সংস্কৃতি, অভ্যাস, পরিবেশনের পরিমাণ কিংবা মানুষের পছন্দের সঙ্গে খাবারের অমিল।
এই দুই ধরনের অপচয়কে আলাদা করে না দেখলে সমাধানও সম্ভব নয়। কারণ তখন নীতিনির্ধারণ কেবল সরবরাহ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়, কিন্তু ভোক্তার বাস্তব আচরণকে বোঝে না। ফলে খাবার পৌঁছায় ঠিকই, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পুষ্টিগত ফল তৈরি হয় না।
বিশেষ করে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত খাদ্য তালিকার ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। একটি অঞ্চলের জন্য যে খাবার গ্রহণযোগ্য, অন্য অঞ্চলে সেটি জনপ্রিয় নাও হতে পারে। আবার একই পরিমাণ খাবার সবার প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খায় না। তবু ঘাটতির ভয় এড়াতে রান্নাঘরগুলো প্রায়ই অতিরিক্ত প্রস্তুতি নেয়। শেষ পর্যন্ত উদ্বৃত্ত অংশ নীরবে আবর্জনায় পরিণত হয়।
খাদ্য অপচয়কে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত অভ্যাসের সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। কারণ অপচয় মানে শুধু খাবারের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িত পানি, বিদ্যুৎ, শ্রম, পরিবহন ব্যয় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থও। একটি প্লেটে ফেলে দেওয়া খাবারের পেছনে পুরো উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সম্পদ নষ্ট হয়।

এ কারণে এখন অনেক দেশ খাদ্যব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবছে। তারা ‘উৎপাদন-ব্যবহার-ফেলে দেওয়া’ এই সরলরৈখিক ধারণা থেকে সরে এসে চক্রাকার ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। সেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে চাহিদা পূর্বাভাস, স্থানীয় রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্য পরিকল্পনা, পরিমিত পরিবেশন এবং উদ্বৃত্ত খাবার পুনর্ব্যবহারের উপায়।
কিন্তু এসব উদ্যোগের ভিত্তি একটাই—তথ্য।
খাদ্য কোথায় নষ্ট হচ্ছে, কতটা নষ্ট হচ্ছে, কোন অংশ এড়ানো সম্ভব, কোন অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য—এসবের নির্ভরযোগ্য হিসাব ছাড়া কার্যকর নীতি তৈরি করা যায় না। পরিমাপ না থাকলে অপচয় অদৃশ্যই থেকে যায়। আর যা অদৃশ্য, তা কখনও অগ্রাধিকারের তালিকায় আসে না।
এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ। দীর্ঘদিন ধরে যদি অপচয়কে আমরা মাপতেই না পারি, তবে একসময় সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করি। তখন অদক্ষতাই ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়।
খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে ভবিষ্যতের আলোচনায় তাই শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, ব্যবহারের দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। কারণ একটি সমাজের সক্ষমতা কেবল কত খাদ্য উৎপাদন করে তাতে নির্ভর করে না; বরং সেই খাদ্য কত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করে।
প্রাচুর্যের যুগেও যদি অপুষ্টি থেকে যায়, তবে বুঝতে হবে সংকট খাদ্যে নয়, সংকট দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমরা যা দেখি না, তা নিয়ে কাজও করি না। আর যা মাপি না, তা কখনও সত্যিকার অর্থে নিয়ন্ত্রণও করতে পারি না।
আই দেৱা মাদে আগুং কের্থা নুগ্রাহা 


















