ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত, শুল্কযুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ বিস্তার কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে তাঁর নীতিকে অনেকেই অস্থির ও অনির্দেশ্য বলে মনে করেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ট্রাম্প হয়তো এমন এক বাস্তবতা বুঝতে শুরু করেছেন, যা ওয়াশিংটনের বহু নীতিনির্ধারক এখনও পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি। সেটি হলো—চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল শত্রুতার কাঠামোয় ফেলে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যোগাযোগে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। ট্রাম্পের ভাষা আগের তুলনায় অনেক বেশি সংযত, কখনও কখনও শ্রদ্ধাশীলও। এর পেছনে নিছক ব্যক্তিগত কৌশল নয়, বরং শক্তির বাস্তব হিসাব কাজ করছে। ট্রাম্প এমন একজন নেতা, যিনি সম্পর্ককে আদর্শ বা নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতা ও প্রভাবের দৃষ্টিতে দেখেন। ইউরোপকে তিনি চাপে ফেলতে পারেন, কারণ তিনি জানেন ইউরোপ এখনও মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে সেই সমীকরণ একেবারেই ভিন্ন।
চীন এখন এমন একটি রাষ্ট্র, যার অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতা উপেক্ষা করা অসম্ভব। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া ছাড়াও বেইজিং এখন শতাধিক দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি কিংবা ড্রোন শিল্প—প্রতিটি ক্ষেত্রেই চীন দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। এমন একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল প্রতিরোধ বা বিচ্ছিন্নতার কৌশলে সীমাবদ্ধ রাখা বাস্তবসম্মত নয়।

ওয়াশিংটনের একটি বড় সমস্যা হলো, সেখানে চীনবিরোধিতা এখন প্রায় রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে “চীনের প্রতি নরম” হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয় প্রবল। ফলে তারা প্রায়ই প্রতীকী কড়া অবস্থান নেয়, যা বাস্তব কূটনীতিকে দুর্বল করে। জো বাইডেন প্রশাসনও এর বাইরে ছিল না। ট্রাম্প আমলে আরোপিত অনেক শুল্ক নিয়ে আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলোর বেশিরভাগই বহাল রাখা হয়। একই সঙ্গে মানবাধিকার ইস্যুতে প্রকাশ্য সংঘাতমূলক ভাষা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তোলে।
মানবাধিকার প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। শিনজিয়াংয়ে উইঘুরদের প্রতি চীনের আচরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতা হলো, নৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত প্রয়োজন প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। যদি প্রতিটি বিরোধকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে সহযোগিতার ক্ষেত্র দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়।
এই জায়গাতেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান তাঁকে আলাদা সুবিধা দেয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চীনের বিরুদ্ধে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন। ফলে এখন যদি তিনি কিছুটা বাস্তববাদী অবস্থান নেন, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকেরা সেটিকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখবে না। ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। কখনও কখনও সবচেয়ে কঠোর অবস্থানের নেতারাই বড় সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারেন, কারণ তাঁদের দেশপ্রেম বা কঠোরতা নিয়ে সন্দেহ তোলার সুযোগ কম থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকে সোভিয়েত অর্থনীতি ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন। কিন্তু চীন আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির গভীরে সংযুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র যদি পূর্ণমাত্রার নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করতে চায়, তাহলে সেটি শুধু দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে না; বরং পুরো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারে।

এর প্রভাব প্রথমে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, পণ্যের দাম বাড়বে, প্রযুক্তি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মার্কিন কোম্পানিগুলো বিশ্বের অন্যতম বড় বাজারে প্রবেশাধিকার হারাতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক প্রতিভা হারাবে। একই সঙ্গে বিশ্ব ধীরে ধীরে দুই বিপরীত প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়বে, যেখানে পারস্পরিক অবিশ্বাস ক্রমাগত সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াবে।
অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রতিদ্বন্দ্বী। আগামী কয়েক দশকেও তারা অর্থনীতি, সামরিক শক্তি ও কৌশলগত প্রভাবের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করবে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতা বলছে, প্রতিযোগিতার মধ্যেও যোগাযোগ ও সহযোগিতার ন্যূনতম ভিত্তি বজায় রাখা জরুরি।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার যুদ্ধ, পারমাণবিক অস্ত্র কিংবা মহামারির যুগে দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে স্থায়ী সংলাপের বিকল্প নেই। অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কিংবা প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা না থাকলে ক্ষতির পরিমাণ সীমাহীন হতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও ওয়াশিংটন ও মস্কো সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল, কারণ তারা বুঝত নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
আজকের বিশ্বে সেই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বাস্তবতা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ট্রাম্প হয়তো আদর্শগত কারণে নয়, বরং প্রবৃত্তিগতভাবে সেই বাস্তবতাটি উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। আর যদি সেটি সত্যি হয়, তাহলে অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে তাঁর বাস্তববাদ আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
ফরিদ জাকারিয়া 


















