ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান এবং বৈশ্বিক দুর্যোগের প্রসঙ্গ তোলার পর দেশটির কৌশলগত তেল মজুত নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ ভারত তার মোট তেল চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। ফলে ওই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বা জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহে সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তেলের দামে চাপ বাড়ছে
গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একই সময়ে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলো খুচরা জ্বালানির দাম স্থির রাখতে গিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কোটি রুপি ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে সরকারি তথ্য উঠে এসেছে।
এরই মধ্যে সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ রুপি বাড়িয়েছে। বর্তমানে দিল্লিতে পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে ৯৭ দশমিক ৭৭ রুপি এবং ডিজেল ৯০ দশমিক ৬৭ রুপিতে।
কৌশলগত তেল মজুতের গুরুত্ব
যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা সরবরাহ সংকটের সময় অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন দেশ কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ ধারণা গুরুত্ব পেতে শুরু করলেও ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের পর বিষয়টি বিশ্বজুড়ে বড় আকারে আলোচনায় আসে। যুক্তরাষ্ট্র এরপর জরুরি তেল মজুত নীতি গ্রহণ করে এবং বিশাল আকারের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ গড়ে তোলে।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৌশলগত তেল মজুত রয়েছে চীনের হাতে। দেশটি শুধু তেল নয়, খাদ্যশস্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যেরও বিপুল রিজার্ভ তৈরি করেছে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার জন্য।

ভারতের মজুত কতটা?
ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় ২০০৪ সালে। পরে ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ লিমিটেড বা আইএসপিআরএল গঠন করা হয়। বর্তমানে বিশাখাপত্তনম, মাঙ্গালুরু এবং পাডুরে ভারতের প্রধান তেল মজুত কেন্দ্র রয়েছে। এসব স্থাপনায় মোট ৫ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণ করা যায়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র কৌশলগত মজুত দিয়ে ভারতের প্রায় ৯ দশমিক ৫ দিনের তেলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক মজুত যুক্ত করলে মোট রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৭৪ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
নতুন মজুত প্রকল্পের পরিকল্পনা
ভারত ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ধাপের কৌশলগত মজুত প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ওডিশার চাঁদিখোল এবং কর্ণাটকের পাডুরে নতুন সংরক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রাজস্থানে লবণগুহা ব্যবহার করে অতিরিক্ত মজুত তৈরির উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশাল আকারের ভূগর্ভস্থ তেল মজুত কেন্দ্র তৈরি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। উপকূলীয় অঞ্চলের শক্ত শিলাস্তরে বড় গুহা খনন করে এসব রিজার্ভ গড়ে তুলতে হয়। ফলে সংকট শুরু হওয়ার পর দ্রুত নতুন মজুত তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাড়বে ঝুঁকি
ইরানকে ঘিরে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ভারতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত নজরদারি ও বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা প্রশমনের কোনও স্থায়ী সমাধান এখনও দেখা যাচ্ছে না।
ফলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানির দাম এবং অর্থনীতির ওপর এই সংকটের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
হরমুজ সংকটের কারণে ভারতের তেল আমদানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কৌশলগত মজুত নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















