রাহিল আনসারির গ্রেপ্তারকে ঘিরে দিল্লি পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক অস্ত্র চক্রের তথ্য। অভিযুক্ত রাহিল আনসারি কুখ্যাত অস্ত্র সরবরাহকারী শাহবাজ আনসারির আত্মীয়। মার্চ মাসে পুরান দিল্লির দারিয়াগঞ্জ এলাকায় তাকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তকারীরা দাবি করছেন, রাজধানীজুড়ে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহের এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল।
দিল্লির দারিয়াগঞ্জের ব্যস্ত ব্রিজমোহন চৌকে ১৩ মার্চ রাতে অভিযান চালায় পুলিশ। সাদা একটি স্কুটারে থাকা তিনজনকে থামিয়ে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় একটি অত্যাধুনিক ‘সিজেড শ্যাডো’ হ্যান্ডগান। এটি সাধারণ দেশীয় পিস্তল নয়, বরং পেশাদার শুটার ও বিশেষ কমান্ডো ইউনিটে ব্যবহৃত উচ্চমানের চেক অস্ত্র। পুলিশ জানায়, স্কুটার চালাচ্ছিল রাহিল আনসারি। তার সঙ্গে ছিল ভাই হাসিম ও চাচাতো ভাই সাইম।
তদন্তে উঠে এসেছে, রাহিল দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির তুর্কমান গেট এলাকায় একটি গোপন অস্ত্র সরবরাহ চক্র পরিচালনা করছিল। তার মূল সমন্বয়কারী ছিলেন শাহবাজ আনসারি, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে দাবি তদন্তকারীদের। দিল্লি পুলিশ বলছে, গত সাত থেকে আট মাসে এই চক্রের মাধ্যমে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ বিদেশি অস্ত্র রাজধানীর বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছেছে।
বিদেশি অস্ত্রের নতুন বাজার
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আগে দিল্লি ও এনসিআর অঞ্চলের গ্যাংগুলো মূলত বিহারের মুঙ্গের বা মধ্যপ্রদেশের খারগোন থেকে তৈরি দেশীয় রিভলভার ব্যবহার করত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলে যায়। এখন গ্যাং সদস্যদের আকৃষ্ট করতে বিদেশি পিস্তল ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অস্ট্রিয়ান গ্লক, তুর্কি জিগানা, চেক সিজেড সিরিজ কিংবা একে-৪৭ ধরনের অস্ত্র অপরাধ জগতে নতুন শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তদন্তকারীদের মতে, পাঞ্জাবের জনপ্রিয় গায়ক সিধু মুসেওয়ালার হত্যাকাণ্ডের পরই এই বিদেশি অস্ত্র নেটওয়ার্ক নিয়ে বড় ধরনের অনুসন্ধান শুরু হয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বুলেট শেলের ফরেনসিক বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। এরপরই শাহবাজ আনসারির নেটওয়ার্ক পুলিশের নজরে আসে।

পাকিস্তান থেকে নেপাল হয়ে ভারতে
দিল্লি পুলিশের দাবি, এই অস্ত্র চক্রের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, পাকিস্তানে থাকা এক যোগাযোগের মাধ্যমে অস্ত্র প্রথমে পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানো হতো। সেখানে অস্ত্র খণ্ডিত অবস্থায় পাঠিয়ে পরে নেপালে জোড়া লাগানো হতো। এরপর ভারত-নেপাল সীমান্ত দিয়ে উত্তরপ্রদেশের খুরজায় আনা হতো অস্ত্রের চালান। সেখান থেকে দিল্লি ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হতো।
পুলিশের দাবি, শাহবাজের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় ইমরান নেপাল সীমান্তে অস্ত্র পুনরায় জোড়া লাগানোর দায়িত্বে ছিলেন। আর দিল্লিতে নিরাপদ ঘাঁটি তৈরি ও সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রাহিলকে।
জামিনে বেরিয়ে উধাও শাহবাজ
জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর চিকিৎসাজনিত কারণ দেখিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছিলেন শাহবাজ। আদালত তাকে মোবাইল চালু রাখা ও অবস্থান জানাতে নির্দেশ দিলেও দুই দিনের মধ্যেই তিনি গা ঢাকা দেন। তদন্তকারীদের অভিযোগ, জমা দেওয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু নথিও ছিল জাল। এরপর ভারত-নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে তিনি বাংলাদেশে চলে যান। পরে সেখান থেকে দুবাইয়েও যাতায়াত করেছেন বলে দাবি পুলিশের।
পুরান দিল্লির গলিতে আতঙ্ক
দারিয়াগঞ্জের মোহল্লা আনসারিয়ান এলাকায় এখনও বিষয়টি নিয়ে চাপা আতঙ্ক রয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই দাবি করছেন, রাহিলকে তারা সাধারণ পোশাক ব্যবসায়ী হিসেবেই চিনতেন। তবে তদন্তকারীরা বলছেন, কয়েক বছর আগে থেকেই তাকে অপরাধচক্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। অস্ত্র লুকানো, বহন করা ও সরবরাহের নানা কৌশল শেখানো হয়েছিল তাকে।
পুলিশ জানিয়েছে, রাহিল গ্রেপ্তারের পর এখন পর্যন্ত ১৫ জনের বেশি সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে অস্ত্রের মজুত ও সরবরাহের নানা তথ্য। তদন্তকারীদের মতে, এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় অস্ত্রবিরোধী অভিযান।
প্রজ্ঞনেশ ও অলোক সিং 



















