জার্মানির দ্রুত বাড়তে থাকা ই-সিগারেট বাজার এখন কার্যত চীনা নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে একই সঙ্গে বেড়েছে চোরাচালান, তরুণদের মধ্যে ভ্যাপ ব্যবহারের প্রবণতা এবং পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ। ফলে বাজারটিকে ঘিরে কড়া নজরদারি শুরু করেছে জার্মান কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিত এক ই-সিগারেট বাণিজ্য মেলায় প্রদর্শনী শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই চীনা কোম্পানিগুলোর স্টলে অভিযান চালায় জার্মান কাস্টমস কর্মকর্তারা। তারা বড় আকারের ট্যাংকযুক্ত ভ্যাপ, কার্টুনচিত্রসম্বলিত প্যাকেজিং এবং করের সিলবিহীন পণ্য খুঁজে দেখেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী, ভ্যাপের ট্যাংক ২ মিলিলিটারের বেশি হতে পারে না।
৫ বিলিয়ন ইউরোর এই বাজারের প্রায় অর্ধেকই অবৈধ পণ্যে ভরে গেছে বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। তাদের সন্দেহ, এসব পণ্যের বেশিরভাগই চীন থেকে আসছে। অবৈধভাবে আমদানি হওয়া এসব পণ্যে কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, পাশাপাশি বাজারে নিয়ন্ত্রণহীন পণ্যের বিস্তারও বাড়ছে।
চীনা নির্মাতাদের বাড়তি নির্ভরতা
বর্তমানে জার্মান ভ্যাপ বাজারের ৯০ শতাংশেরও বেশি বিক্রয়মূল্য চীনা কোম্পানিগুলোর দখলে। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর অনেক নির্মাতা বিদেশি বাজারে ঝুঁকেছে। তাদের জন্য জার্মানি এখন অন্যতম বড় লক্ষ্য।
শেনজেনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কেঞ্জারটেকের বিক্রয় ব্যবস্থাপক অ্যালভিন ওয়াং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পর জার্মানিকেই তারা দ্বিতীয় বড় বিদেশি বাজার হিসেবে দেখছেন। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম থাকায় সীমান্ত পারাপারে জটিলতা তৈরি হয়।
চীনে ২০২২ সালে ই-সিগারেট শিল্পকে রাষ্ট্রের তামাক কর্তৃপক্ষের আওতায় আনা হয়। এরপর উৎপাদন ও বিপণনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় এবং তামাক ছাড়া অন্য সব স্বাদের ভ্যাপ নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশমুখী হয়ে পড়ে।

পরিবেশ ও তরুণদের স্বাস্থ্যঝুঁকি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে ডিসপোজেবল বা একবার ব্যবহারযোগ্য ভ্যাপ নিষিদ্ধের উদ্যোগ নিয়েছে। তরুণদের আসক্তি এবং ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির পরিবেশগত ক্ষতি এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কম বয়সে ভ্যাপ ব্যবহার শুরু করে, তাদের মধ্যে পরবর্তীতে সিগারেট গ্রহণের প্রবণতা বেশি থাকে। এছাড়া কিছু ভ্যাপে আসক্তিকর উপাদান ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান রেমন্ডিসের হিসাব অনুযায়ী, শুধু জার্মানিতেই প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫০ লাখ ভ্যাপ ফেলে দেওয়া হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা ২০২৭ সালের শুরুতে কার্যকর হতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য ডিসপোজেবল ভ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
জার্মান ই-সিগারেট খুচরা বিক্রেতা সমিতির মুখপাত্র হর্স্ট উইঙ্কলার অভিযোগ করেন, উচ্চ কর ও কঠোর নিয়মের কারণে স্থানীয় কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মতে, এর ফলে বাজার সস্তা চীনা ডিসপোজেবল পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
তিনি বলেন, অবৈধ বাজারে বিক্রি হওয়া পণ্যের বড় অংশই নেদারল্যান্ডসের বন্দর হয়ে জার্মানিতে প্রবেশ করে। তার দাবি, মোট বিক্রির অন্তত অর্ধেকই অবৈধ চ্যানেলে হচ্ছে এবং এর পেছনে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রও জড়িত।
জার্মান কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সীমান্তে ভ্যাপবোঝাই গাড়ি আটক করেছে। অনেক দোকানকেও জরিমানা করা হয়েছে। এসব অপরাধে জড়িতদের পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
বাজারের পুরোনো ব্যবহারকারীদের মধ্যেও পরিবর্তন নিয়ে হতাশা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের ভ্যাপ ব্যবহারকারী থমাস লুয়েবেন বলেন, একসময় ভ্যাপ সংস্কৃতি ছিল সৃজনশীল ও ব্যক্তিনির্ভর। কিন্তু এখন পুরো বাজার ডিসপোজেবল চীনা পণ্যে ভরে গেছে এবং ইউরোপীয় নিয়মের কারণে খরচও বেড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















