আমাদের সমাজে এখনও বিয়েকে অনেক সময় মানুষের জীবনের চেয়েও বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়। সংসার টিকিয়ে রাখা যেন এক ধরনের নৈতিক কর্তব্য, আর বিচ্ছেদ যেন ব্যর্থতার চূড়ান্ত প্রতীক। এই মানসিকতা এত গভীরে গেঁথে গেছে যে বহু পরিবার সন্তানের অসহায় আর্তনাদকেও “সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে” বলে পাশ কাটিয়ে দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি সম্পর্ক রক্ষার জন্য কতদূর যাওয়া যায়? একজন মানুষের মানসিক ভাঙন, আতঙ্ক কিংবা মৃত্যুর বিনিময়েও কি একটি বিয়ে টিকিয়ে রাখা জরুরি?
সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনার পর এই প্রশ্ন আরও নির্মমভাবে সামনে এসেছে। এক তরুণী বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় মায়ের কাছে জানাচ্ছেন, তিনি শ্বাসরুদ্ধ অনুভব করছেন, তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে যেতে হবে। আরেকজন তরুণ, বৈবাহিক অস্থিরতার মধ্যে বাবাকে বারবার সাহায্যের জন্য ফোন করছেন। কিন্তু পরিবারের হস্তক্ষেপ পৌঁছানোর আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। ঘটনাগুলো আদালতের বিবেচনায় থাকায় কার দোষ, কার দায়—তা নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: বিপদের সংকেত ছিল, সাহায্যের আবেদন ছিল, আর সেই আবেদন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
আমরা সন্তানদের ছোটবেলায় শেখাই, বিপদে পড়লে বাবা-মায়ের কাছে যেতে। কিন্তু বড় হয়ে গেলে যেন সেই অধিকার বদলে যায়। বিশেষ করে বিয়ের পর অনেক তরুণ-তরুণীকে বলা হয়, “সব সংসারেই সমস্যা থাকে”, “মেয়েদের একটু মানিয়ে নিতে হয়”, “পুরুষ মানুষ কষ্ট সহ্য করতেই পারে”, কিংবা “লোকজন কী বলবে?”। এই কথাগুলো আপাতদৃষ্টিতে পরামর্শের মতো শোনালেও বাস্তবে অনেক সময় তা বিপজ্জনক নীরবতা তৈরি করে।

সব সম্পর্ক ভাঙনের দিকে যায় না, আবার প্রতিটি অভিযোগও চূড়ান্ত সত্য নয়। কিন্তু যখন কেউ বারবার জানায় যে সে অসহনীয় চাপের মধ্যে আছে, তখন সেই কথাকে অবহেলা করার অধিকার কারও নেই। মানসিক যন্ত্রণা চোখে দেখা যায় না বলেই সেটি কম বাস্তব নয়। অনেক মানুষ বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকলেও ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়েন। আর পরিবার যদি তখনও “সমাজের মান-সম্মান” নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে, তাহলে সেই মানুষটি একসময় নিজেকে সম্পূর্ণ একা ভাবতে শুরু করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ এখনও সামাজিক কলঙ্কের মতো আচরণ পায়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এটি আরও কঠিন। কিন্তু পুরুষরাও যে বৈবাহিক নির্যাতন, মানসিক চাপে বা সামাজিক প্রত্যাশার বোঝায় ভেঙে পড়তে পারেন, তা নিয়েও খুব কম আলোচনা হয়। ফলে উভয় পক্ষই অনেক সময় এমন সম্পর্কে আটকে থাকেন, যা তাদের ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাকে সফলতা মনে করি, কিন্তু সুস্থভাবে বেঁচে থাকাকে ততটা মূল্য দিই না। অথচ একটি ভেঙে যাওয়া বিয়ে থেকে মানুষ আবার নতুন জীবন শুরু করতে পারে। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জীবন আর কখনও ফিরে আসে না।
প্রতিটি বাবা-মায়ের জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি বিষয় হওয়া উচিত সন্তানের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা। ছেলে হোক বা মেয়ে—যদি সে অসহায়ভাবে সাহায্য চায়, তাহলে প্রথম দায়িত্ব হলো তাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা। সমাজের বিচার, আত্মীয়দের মন্তব্য কিংবা “মানিয়ে নেওয়ার” উপদেশ পরে আসতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি বিচ্ছিন্ন সন্তানকে ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু মৃত সন্তানকে নয়।
সোনাল কালরা 


















