আজকের দিনে সন্তান জন্মের সময় হাসপাতাল, চিকিৎসক আর আধুনিক ব্যবস্থার কথাই বেশি শোনা যায়। কিন্তু কয়েকশ বছর আগে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চলে সন্তান জন্মকে ঘিরে ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের সামাজিক রীতি। সেই রীতির অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘গ্রোনিং এল’ নামে বিশেষ এক পানীয়।
নামের কারণে অনেকের মনে হতে পারে এটি অতিরিক্ত মদ্যপানের পরের কষ্টের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু আসলে ‘গ্রোনিং’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো প্রসববেদনার সময় মায়ের কষ্টের আওয়াজ বোঝাতে। সেই কারণেই সন্তান জন্মের সময় খোলা হতো এই বিশেষ এল বা মদ্যজাত পানীয়ের পিপে।
গর্ভধারণের খবরেই শুরু হতো প্রস্তুতি
তৎকালীন সমাজে কোনো নারী গর্ভবতী হওয়ার খবর জানা গেলেই পরিবারের সদস্যরা বিশেষ এই এল তৈরি শুরু করতেন। তারপর সেটি কয়েক মাস ধরে সংরক্ষণ করে রাখা হতো। সন্তান জন্মের সময় প্রসববেদনা শুরু হলে তবেই খোলা হতো সেই পানীয়ের পিপে।

এটি শুধু আনন্দের বিষয় ছিল না, বরং পুরো ঘটনাকে ঘিরে ছিল সামাজিক ও পারিবারিক অংশগ্রহণ। ধাত্রী ও প্রসবের সময় পাশে থাকা নারীরা একসঙ্গে এই পানীয় পান করতেন। অনেক ক্ষেত্রে ধারণা করা হতো, মা-ও সামান্য পান করলে ব্যথা কিছুটা কম অনুভব করতে পারেন।
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মানা হতো। নবজাতককে পরিষ্কার করার জন্য কিছু এল অবশ্যই রেখে দিতে হতো।
শুধু পানীয় নয়, থাকত বিশেষ খাবারও
সন্তান জন্ম উপলক্ষে শুধু এল পরিবেশনেই শেষ হতো না আয়োজন। একটি বড় পনিরও ভাগ করে খাওয়ার রীতি ছিল। পনিরের বাইরের গোলাকার আবরণ অক্ষত রাখা হতো, কারণ বিশ্বাস করা হতো সেই ফাঁকা অংশের ভেতর দিয়ে নবজাতককে পার করালে শিশুর জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে।

এছাড়া তৈরি করা হতো ‘গ্রোনিং কেক’। আপেল ও বিভিন্ন মসলার স্বাদে বানানো এই মিষ্টি রুটি প্রসবের সময়ই প্রস্তুত করা হতো। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, মা নিজ হাতে যদি কেকের ডিম ভাঙেন, তাহলে সন্তান জন্ম তুলনামূলক দ্রুত ও কম কষ্টে সম্পন্ন হবে।
সামাজিক উৎসবে পরিণত হতো সন্তান জন্ম
বর্তমান সময়ে সন্তান জন্ম অনেকটাই ব্যক্তিগত ও চিকিৎসাকেন্দ্রিক বিষয় হলেও সেই সময় এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান। পরিবার, প্রতিবেশী ও সহায়তাকারী নারীরা সবাই এতে অংশ নিতেন। খাবার, পানীয় ও নানা কুসংস্কার মিলিয়ে পুরো ঘটনাটি এক ধরনের পারিবারিক উৎসবে রূপ নিত।
‘গ্রোনিং এল’ এখন ইতিহাসের অংশ হলেও এটি দেখায়, অতীতে মানুষ সন্তান জন্মকে শুধু চিকিৎসার বিষয় হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনার অংশ হিসেবেও দেখত।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















