আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধকে সাধারণত তেরো উপনিবেশ, জর্জ ওয়াশিংটন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণার ভেতরেই দেখা হয়। কিন্তু সারাহ এম এস পিয়ারসলের বই ফ্রিডম রাউন্ড দ্য গ্লোব সেই পরিচিত ফ্রেমকে ভেঙে দেয়। ইতিহাসবিদ বেঞ্জামিন এল কার্পের আলোচনায় বইটি উঠে এসেছে এক বিস্তৃত বৈশ্বিক ইতিহাস হিসেবে, যেখানে আমেরিকার স্বাধীনতা কেবল আমেরিকানদের গল্প নয়, বরং দাস, সৈনিক, উপনিবেশবাসী, আদিবাসী, বণিক, কর্মকর্তা ও সাম্রাজ্যবিরোধী নানা মানুষের প্রতিযোগী স্বাধীনতার ইতিহাস।
১৭৬৩ সালের ডেট্রয়েটে ফাঁসির অপেক্ষায় থাকা এক আদিবাসী দাসী নারী, ১৭৮০ সালের জিব্রাল্টারে সৈন্যসংকটে উদ্বিগ্ন এক ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন, ১৭৮১ সালে হাভানা থেকে রওনা হওয়া এক কৃষ্ণাঙ্গ অভিজ্ঞ সৈনিক, কিংবা ১৭৮৪ সালে আমেরিকান বণিকদের আপ্যায়ন করা এক ধনী চীনা কর্মকর্তা—এমন বিচিত্র দৃশ্য দিয়ে পিয়ারসল দেখান, আমেরিকার বিপ্লবের ঢেউ আটলান্টিক পাড় ছাড়িয়ে বহু সমাজে পৌঁছেছিল।
স্বাধীনতা, সম্মান ও ভাগ্যের ভিন্ন অর্থ
বইটির প্রতিটি অধ্যায় শুরু হয়েছে তেরো উপনিবেশের বাইরের কোনো ঘটনা বা চরিত্র দিয়ে। পাশাপাশি প্রতিটি অধ্যায়ে স্বাধীনতার ঘোষণায় ব্যবহৃত একটি করে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ—যেমন স্বাধীনতা, সম্মান, ভাগ্য—নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পিয়ারসল দেখান, এসব শব্দ শুধু আমেরিকান বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেনি; বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের সংগ্রাম, আশঙ্কা ও স্বপ্নেও এগুলোর আলাদা আলাদা অর্থ ছিল।
কারও কাছে স্বাধীনতা ছিল সাম্রাজ্যিক কর থেকে মুক্তি, কারও কাছে দাসত্ব থেকে পালানোর অধিকার, কারও কাছে ভূমি ও সমাজ রক্ষার অস্তিত্বসংগ্রাম। ফলে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এখানে কোনো একমুখী মুক্তিযুদ্ধ নয়; বরং এটি হয়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বী স্বাধীনতার যুদ্ধ।
বোস্টন থেকে কলকাতা, ক্যারিবিয়ান থেকে সিয়েরা লিওন
পিয়ারসলের আলোচনায় ১৭৬৫ সালের স্ট্যাম্প অ্যাক্ট শুধু উত্তর আমেরিকার ক্ষোভের কারণ ছিল না। ক্যারিবিয়ানের আবাদি জমির মালিকরাও এ আইন নিয়ে বিরক্ত ছিল। একইভাবে বোস্টনের চা ধ্বংসকারীদের ক্ষোভ এবং কলকাতার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের দুর্দশা দুটিই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার বৃহত্তর সংকটের সঙ্গে যুক্ত।
বইটি আরও দেখায়, দাসপ্রথার শিকার মানুষ এবং তাদের আমেরিকান দাসমালিকেরা উভয়েই স্বাধীনতার ভাষা ব্যবহার করলেও তাদের উদ্দেশ্য ছিল একেবারে বিপরীত। একজন স্বাধীনতা চাইছিল মানবিক মুক্তির জন্য, অন্যজন নিজের সম্পত্তি ও ক্ষমতা রক্ষার জন্য। এই দ্বন্দ্বই আমেরিকান বিপ্লবের নৈতিক জটিলতাকে সামনে আনে।
আদিবাসী বিদ্রোহও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামরিক পরিকল্পনাকে দুর্বল করেছিল—ক্যারিবিয়ান, দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকার নানা অঞ্চলে সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সিয়েরা লিওনের মতো নতুন রাজনৈতিক প্রকল্পেও সমতা ও নিরাপত্তার টানাপোড়েন দেখা যায়।

আমেরিকার বিপ্লব, কিন্তু শুধু আমেরিকার নয়
পিয়ারসলের মূল যুক্তি হলো, এই সময়ের সব ঘটনা আমেরিকান উপনিবেশবাসীদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে ঘুরছিল না। বরং আমেরিকার বাইরে বহু শক্তি, সংকট ও প্রতিরোধ ব্রিটিশ পরাজয়ের পটভূমি তৈরি করেছিল। একই সঙ্গে এটিও সত্য, আমেরিকানরা এমন এক পূর্ণমাত্রার বিপ্লব ঘটিয়েছিল, যা একসময় বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়।
তবে সেই বিপ্লব সব স্বপ্ন পূরণ করেনি। কানাডাকে সঙ্গে নেওয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। যুদ্ধ ও অস্থিরতার ফলে অনেকেই শৃঙ্খলার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ১৭৭৬ সালের আদর্শবাদী সমতার ভাষা পরবর্তী বাস্তব রাজনীতিতে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়।
বড় ইতিহাসের ভেতরে ছোট মানুষের গল্প
বইটির শক্তি তার বিস্তারে। পিয়ারসল একই সঙ্গে বড় কূটনীতি, সামরিক সংঘর্ষ, সাম্রাজ্যিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করেছেন। বেঞ্জামিন এল কার্পের মতে, লেখকের ভাষা প্রাণবন্ত; কোথাও কোথাও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও হাস্যরসও আছে। ফলে বইটি কোনো শুষ্ক ঘটনাক্রম নয়, বরং বহু মানুষের জীবন্ত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এক ইতিহাস।
এখানে নারী আত্মমুক্তির গল্প আছে, যুদ্ধকালীন নৃশংসতার কথা আছে, পুরুষ সমকামিতার প্রসঙ্গ আছে, আবার ইয়েলো ফিভারের আতঙ্কও আছে। পরিচিত রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক বিবরণের পাশাপাশি এইসব উপেক্ষিত স্তর বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে।
নতুন ফ্রেমে পুরনো বিপ্লব
পিয়ারসল বহু গবেষকের কাজের ওপর দাঁড়িয়ে একটি সৃজনশীল সংশ্লেষ তৈরি করেছেন। যারা আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে আগেই জানেন, তাদের কাছেও এই বই নতুন মনে হতে পারে। কারণ এটি যুদ্ধকে শুধু বিখ্যাত পুরুষ, বড় যুদ্ধ ও উচ্চ আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না।
বরং ফ্রিডম রাউন্ড দ্য গ্লোব দেখায়, আমেরিকান বিপ্লব ছিল এমন এক যুগের অংশ, যখন বিশ্বজুড়ে মানুষ স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, সমতা, সম্মান ও ভাগ্যের অর্থ নতুন করে নির্ধারণ করছিল। সেই অর্থে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুধু একটি জাতির জন্মকথা নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতা, সাম্রাজ্য, দাসত্ব ও মুক্তির প্রতিযোগী স্বপ্নের ইতিহাস।
গ্রন্থ-পর্যালোচনার লেখক: বেঞ্জামিন এল কার্প
আলোচিত বইয়ের লেখক: সারাহ এম এস পিয়ারসল
বেঞ্জামিন এল কার্প 


















