এক সময় পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল এথেন্স ও স্পার্টা। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যেই সেই দুই শক্তিশালী নগর-রাষ্ট্র পরিণত হয় একে অপরের ভয়ংকর শত্রুতে। ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক সংঘাত পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ শুধু দুই শহরের লড়াই ছিল না, এটি পুরো গ্রিক বিশ্বের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছিল।
স্পাক্টেরিয়া দ্বীপে অপমান
খ্রিস্টপূর্ব ৪২৫ সালে ছোট্ট স্পাক্টেরিয়া দ্বীপে ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। এথেনীয় নৌবাহিনী সেখানে স্পার্টার সৈন্যদের ঘিরে ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে স্পার্টান যোদ্ধারা ছিল অজেয় সাহসের প্রতীক। থার্মোপাইলির যুদ্ধে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করা ৩০০ স্পার্টানের গল্প তখনও কিংবদন্তি হয়ে ছিল। কিন্তু স্পাক্টেরিয়ায় পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। এথেন্সের তীরন্দাজ ও দূরপাল্লার যোদ্ধাদের আক্রমণে স্পার্টানরা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা পুরো গ্রিক বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল।
পারস্যবিরোধী জোট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
পঞ্চম শতকের শুরুতে পারস্য সাম্রাজ্যের বিশাল আক্রমণ ঠেকাতে গ্রিসের বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্র একজোট হয়। স্পার্টা নেতৃত্ব দেয় স্থলযুদ্ধে, আর এথেন্স শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলে। সালামিস ও প্লাতেয়ার যুদ্ধে গ্রিকদের জয় পারস্যকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
তবে যুদ্ধ শেষে দুই শক্তির মধ্যে ধীরে ধীরে অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। স্পার্টা নিজেদের গ্রিসের প্রধান সামরিক শক্তি মনে করত। অন্যদিকে এথেন্স সমুদ্রপথে বাণিজ্য, গণতন্ত্র এবং শক্তিশালী নৌবাহিনীর মাধ্যমে দ্রুত ধনী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

এথেন্সের উত্থান ও স্পার্টার উদ্বেগ
এথেন্স তাদের রূপার খনি থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে শত শত যুদ্ধজাহাজ তৈরি করে। এর ফলে তারা এজিয়ান সাগরে সবচেয়ে শক্তিশালী নৌশক্তিতে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে ছোট ছোট গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলো এথেন্সের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়। কিন্তু এই জোট পরে কার্যত এথেন্সের সাম্রাজ্যে রূপ নেয়।
এথেন্সের ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস যত বাড়তে থাকে, স্পার্টার উদ্বেগও তত গভীর হয়। স্পার্টা কখনও এথেন্সকে নিজেদের সমান মর্যাদা দিতে রাজি ছিল না। দুই শক্তির মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠে।
সম্পর্ক ভাঙনের শুরু
খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৫ সালের দিকে স্পার্টায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়। এরপর হেলট নামে পরিচিত কৃষিদাসদের বিদ্রোহ শুরু হলে স্পার্টা মিত্রদের সাহায্য চায়। এথেন্স সৈন্য পাঠালেও পরে স্পার্টানরা শুধু এথেনীয়দেরই অপমানজনকভাবে ফেরত পাঠায়। এই ঘটনার পর দুই পক্ষের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হয়ে যায়।
এরপর পারস্যের হুমকি কমে গেলে গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যেই শক্তির লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। এথেন্স ও স্পার্টার প্রতিদ্বন্দ্বিতা তখন পুরো গ্রিসকে অস্থির করে তোলে।

পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের ধ্বংস
খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ সালে শুরু হয় পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ। দীর্ঘ ২৭ বছরের এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। এথেন্স স্থলযুদ্ধে স্পার্টাকে এড়িয়ে নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে স্পার্টা পারস্যের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিয়ে নতুন নৌবহর গড়ে তোলে।
শেষ পর্যন্ত খ্রিস্টপূর্ব ৪০৫ সালে এজোস্পোটামির যুদ্ধে স্পার্টা এথেন্সের নৌবাহিনী ধ্বংস করে দেয়। এক বছর পর এথেন্স আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। স্পার্টা সাময়িকভাবে গ্রিসের প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে, কিন্তু সেই আধিপত্যও বেশিদিন টেকেনি।
গ্রিক শক্তির পতন
এথেন্স ও স্পার্টার দীর্ঘ সংঘাত পুরো গ্রিক বিশ্বকে দুর্বল করে ফেলে। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পরে ম্যাসিডোনিয়ার রাজা ফিলিপ দ্বিতীয় গ্রিস দখল করেন। এরপর তার ছেলে আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ের পথে এগিয়ে যান। এভাবেই একসময়ের শক্তিশালী গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্য ইতিহাসে পরিণত হয়।
গ্রিসের ইতিহাসের এই অধ্যায় দেখায়, বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শক্তি যখন নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন সেই সংঘাত শেষ পর্যন্ত পুরো সভ্যতাকেই দুর্বল করে দেয়।
এথেন্স ও স্পার্টার দ্বন্দ্ব কীভাবে প্রাচীন গ্রিসকে দুর্বল করে দিয়েছিল, সেই ইতিহাস ও পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের বিশ্লেষণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















