০৯:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬
শিশুকে বহনের জন্যই কি তৈরি হয়েছিল মানুষের প্রথম সরঞ্জাম? নতুন গবেষণায় উঠে এলো চমকপ্রদ তথ্য আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধকে নতুন চোখে দেখার বিশ্বইতিহাস ক্যানেস চলচ্চিত্র উৎসবে শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণা, নতুন মুখদের বৈশ্বিক স্বীকৃতি ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শিক্ষাতেও ধাক্কা দিয়েছে আদালতে বাণিজ্যিক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির আইনে চারটি সমস্যা সারানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন আইনমন্ত্রী এডিবির হিসাবে ইরান যুদ্ধ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ১.৩ শতাংশ কমাতে পারে, বাংলাদেশ বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রোমান সাম্রাজ্যের অহংকার ভেঙে দিয়েছিল ইহুদি বিদ্রোহ, ধ্বংস হয়েছিল পুরো একটি লিজিয়ন এথেন্স-স্পার্টার রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব: যেভাবে ভেঙে পড়েছিল প্রাচীন গ্রিসের ঐক্য ভিক্টোরিয়ান যুগে ট্রেনভ্রমণের আতঙ্ক, ‘রেলওয়ে উন্মাদনা’ কীভাবে ছড়িয়েছিল ব্রিটেনে নারী যৌনতার ইতিহাসে লুকানো ক্ষমতার রাজনীতি, নতুন বই ঘিরে আলোড়ন

ভিক্টোরিয়ান যুগে ট্রেনভ্রমণের আতঙ্ক, ‘রেলওয়ে উন্মাদনা’ কীভাবে ছড়িয়েছিল ব্রিটেনে

উনিশ শতকের ব্রিটেনে রেলপথ ছিল আধুনিকতা ও অগ্রগতির প্রতীক। দ্রুতগতির ট্রেন মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছিল, শহরকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করছিল, আর শিল্পবিপ্লবের শক্তিকে আরও দৃশ্যমান করছিল। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেই জন্ম নিয়েছিল এক অদ্ভুত ভয়—‘রেলওয়ে উন্মাদনা’। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, ট্রেনে ভ্রমণ মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।

ইতিহাসবিদদের মতে, বিশেষ করে ১৮৬০ ও ১৮৭০-এর দশকে এই আতঙ্ক ব্রিটিশ সমাজে বড় ধরনের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সংবাদপত্রগুলোতে একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে ট্রেনে যাত্রীদের ওপর হামলার খবর। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ধারণা জন্মায়, যেকোনো সময় কোনো সহযাত্রী হঠাৎ উন্মাদ হয়ে উঠতে পারে।

ভয়ের পেছনের বাস্তবতা

১৮৬৪ সালে লন্ডনে ট্রেনে ভ্রমণের সময় থমাস ব্রিগস নামে এক যাত্রী নিহত হন। এর পরপরই এক নাবিকের সহিংস আচরণের ঘটনা আরও আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়। সে সময় ট্রেনের কামরাগুলো ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ ধরনের। কামরার ভেতর থেকে বের হওয়ার সুযোগ ছিল না, অন্য কামরায় যাওয়ার পথও ছিল না। জরুরি পরিস্থিতিতে চালককে জানানোরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

এই কারণে যাত্রীরা নিজেদেরকে অসহায় মনে করতেন। যদি কোনো সহযাত্রী আচমকা সহিংস হয়ে উঠত, তাহলে পালানোর পথ থাকত না। সমাজে এমন ধারণাও ছড়িয়ে পড়ে যে ট্রেনের শব্দ, গতি ও দুলুনি মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

Railway Mania - Wikipedia

শিল্পবিপ্লবের চাপ ও মানসিক উদ্বেগ

সেই সময় শিল্পায়নের দ্রুত পরিবর্তন মানুষের জীবনে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছিল। বিশেষ করে শ্রমজীবী পুরুষদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। অনেকে মনে করতেন, কঠিন কর্মপরিবেশ ও যান্ত্রিক জীবনের চাপ পুরুষদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে দিচ্ছে।

এই আতঙ্কে নারীদেরও গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরা হতো। সংবাদপত্রে প্রায়ই নারী যাত্রীদের অসহায় ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানো হতো, আর পুরুষদের সম্ভাব্য আক্রমণকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। ফলে ‘রেলওয়ে উন্মাদনা’ শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, সমাজের লিঙ্গভিত্তিক ভয় ও ধারণাকেও সামনে নিয়ে আসে।

আতঙ্ক যত বড়, বাস্তবতা তত নয়

ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাস্তবে এমন ঘটনার সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। পরিসংখ্যান বলছে, ওই সময়েও ট্রেনযাত্রীর সংখ্যা নিয়মিত বাড়ছিল। অর্থাৎ মানুষ ভয় পেলেও ট্রেনে ভ্রমণ বন্ধ করেনি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি ছিল মূলত সামাজিক আতঙ্কের একটি উদাহরণ। সংবাদপত্রের অতিরঞ্জিত প্রচার এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। পরে নতুন নতুন বিষয় সামনে আসায় গণমাধ্যমের মনোযোগও অন্যদিকে সরে যায়।

কীভাবে শেষ হয় ‘রেলওয়ে উন্মাদনা’

১৮৭০-এর দশকের শেষ দিকে ট্রেনের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। জরুরি অবস্থায় চালককে সংকেত দেওয়ার জন্য যোগাযোগব্যবস্থা যোগ করা হয়। পাশাপাশি করিডরযুক্ত কামরা চালু হওয়ায় যাত্রীরা প্রয়োজনে এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যেতে পারতেন।

এই পরিবর্তনের ফলে মানুষের নিরাপত্তাবোধ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে ‘রেলওয়ে উন্মাদনা’ নিয়ে আতঙ্কও কমে যায়। একসময় এটি ব্রিটিশ সমাজের ইতিহাসে অদ্ভুত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এক সামাজিক ভয়ের উদাহরণ হয়ে রয়ে যায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

শিশুকে বহনের জন্যই কি তৈরি হয়েছিল মানুষের প্রথম সরঞ্জাম? নতুন গবেষণায় উঠে এলো চমকপ্রদ তথ্য

ভিক্টোরিয়ান যুগে ট্রেনভ্রমণের আতঙ্ক, ‘রেলওয়ে উন্মাদনা’ কীভাবে ছড়িয়েছিল ব্রিটেনে

০৮:৩৩:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬

উনিশ শতকের ব্রিটেনে রেলপথ ছিল আধুনিকতা ও অগ্রগতির প্রতীক। দ্রুতগতির ট্রেন মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছিল, শহরকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করছিল, আর শিল্পবিপ্লবের শক্তিকে আরও দৃশ্যমান করছিল। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেই জন্ম নিয়েছিল এক অদ্ভুত ভয়—‘রেলওয়ে উন্মাদনা’। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, ট্রেনে ভ্রমণ মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।

ইতিহাসবিদদের মতে, বিশেষ করে ১৮৬০ ও ১৮৭০-এর দশকে এই আতঙ্ক ব্রিটিশ সমাজে বড় ধরনের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সংবাদপত্রগুলোতে একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে ট্রেনে যাত্রীদের ওপর হামলার খবর। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ধারণা জন্মায়, যেকোনো সময় কোনো সহযাত্রী হঠাৎ উন্মাদ হয়ে উঠতে পারে।

ভয়ের পেছনের বাস্তবতা

১৮৬৪ সালে লন্ডনে ট্রেনে ভ্রমণের সময় থমাস ব্রিগস নামে এক যাত্রী নিহত হন। এর পরপরই এক নাবিকের সহিংস আচরণের ঘটনা আরও আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়। সে সময় ট্রেনের কামরাগুলো ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ ধরনের। কামরার ভেতর থেকে বের হওয়ার সুযোগ ছিল না, অন্য কামরায় যাওয়ার পথও ছিল না। জরুরি পরিস্থিতিতে চালককে জানানোরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

এই কারণে যাত্রীরা নিজেদেরকে অসহায় মনে করতেন। যদি কোনো সহযাত্রী আচমকা সহিংস হয়ে উঠত, তাহলে পালানোর পথ থাকত না। সমাজে এমন ধারণাও ছড়িয়ে পড়ে যে ট্রেনের শব্দ, গতি ও দুলুনি মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

Railway Mania - Wikipedia

শিল্পবিপ্লবের চাপ ও মানসিক উদ্বেগ

সেই সময় শিল্পায়নের দ্রুত পরিবর্তন মানুষের জীবনে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছিল। বিশেষ করে শ্রমজীবী পুরুষদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। অনেকে মনে করতেন, কঠিন কর্মপরিবেশ ও যান্ত্রিক জীবনের চাপ পুরুষদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে দিচ্ছে।

এই আতঙ্কে নারীদেরও গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরা হতো। সংবাদপত্রে প্রায়ই নারী যাত্রীদের অসহায় ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানো হতো, আর পুরুষদের সম্ভাব্য আক্রমণকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। ফলে ‘রেলওয়ে উন্মাদনা’ শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, সমাজের লিঙ্গভিত্তিক ভয় ও ধারণাকেও সামনে নিয়ে আসে।

আতঙ্ক যত বড়, বাস্তবতা তত নয়

ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাস্তবে এমন ঘটনার সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। পরিসংখ্যান বলছে, ওই সময়েও ট্রেনযাত্রীর সংখ্যা নিয়মিত বাড়ছিল। অর্থাৎ মানুষ ভয় পেলেও ট্রেনে ভ্রমণ বন্ধ করেনি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি ছিল মূলত সামাজিক আতঙ্কের একটি উদাহরণ। সংবাদপত্রের অতিরঞ্জিত প্রচার এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। পরে নতুন নতুন বিষয় সামনে আসায় গণমাধ্যমের মনোযোগও অন্যদিকে সরে যায়।

কীভাবে শেষ হয় ‘রেলওয়ে উন্মাদনা’

১৮৭০-এর দশকের শেষ দিকে ট্রেনের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। জরুরি অবস্থায় চালককে সংকেত দেওয়ার জন্য যোগাযোগব্যবস্থা যোগ করা হয়। পাশাপাশি করিডরযুক্ত কামরা চালু হওয়ায় যাত্রীরা প্রয়োজনে এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যেতে পারতেন।

এই পরিবর্তনের ফলে মানুষের নিরাপত্তাবোধ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে ‘রেলওয়ে উন্মাদনা’ নিয়ে আতঙ্কও কমে যায়। একসময় এটি ব্রিটিশ সমাজের ইতিহাসে অদ্ভুত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এক সামাজিক ভয়ের উদাহরণ হয়ে রয়ে যায়।