ইন্দোনেশিয়ায় মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমান সি-১৩০ হারকিউলিসের জন্য একটি আঞ্চলিক রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নতুন করে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিতর্ক তৈরি করেছে। দেশটির সরকার এই প্রস্তাব নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিলেও আইনপ্রণেতা ও বিশ্লেষকদের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে সার্বভৌমত্ব ও পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্যাফরি শামসুদ্দিন সম্প্রতি দেশটির পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিশনের বৈঠকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে আলোচনায় পশ্চিম জাভার মাজালেংকায় অবস্থিত কার্তাজাতি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে হারকিউলিস বিমানের মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল বা এমআরও কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বর্তমানে বড় পরিসরের হারকিউলিস রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রের অভাব রয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে ইন্দোনেশিয়াকে আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াশিংটন। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে পরিকল্পনার কারিগরি দিক নিয়ে আরও পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কার্তাজাতি বিমানবন্দর কেন আলোচনায়
ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত কার্তাজাতি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রায় ১ হাজার ৮০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। আধুনিক অবকাঠামো ও দীর্ঘ রানওয়ে থাকা সত্ত্বেও যাত্রী ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বিমানবন্দরটিকে কার্গো, লজিস্টিকস ও বিমানশিল্প উন্নয়নের মাধ্যমে কার্যকর ব্যবহারের পথ খুঁজছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রিকো সিরাইত বলেছেন, এই সহযোগিতার লক্ষ্য ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা ও বিমানশিল্প সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং দেশটিকে আঞ্চলিক রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এখন পর্যন্ত এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি যাতে কার্তাজাতিকে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

বিতর্কের কেন্দ্রে সার্বভৌমত্ব
তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে রাজনৈতিক মহলে। পার্লামেন্ট সদস্য টিবি হাসানুদ্দিন বলেছেন, এটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ বিমান চলাচল প্রকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, যদি এই স্থাপনা ভবিষ্যতে কেবল মার্কিন সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা কার্যত বিদেশি সামরিক ঘাঁটির ধারণা তৈরি করতে পারে, যা ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীন ও সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ইন্দোনেশিয়া ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বেনি সুকাদিস বলেছেন, শুরু থেকেই স্বচ্ছতা ও স্পষ্ট সীমারেখা নিশ্চিত না করা হলে এই প্রকল্প ঘিরে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ ও আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমের পরিধি বাড়লে জনমনে ইন্দোনেশিয়ার নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
বিতর্কের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইভোন মেওয়েংকাং বলেছেন, যেকোনো প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেই জাতীয় সার্বভৌমত্ব, কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কার্তাজাতি প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হলে তা শুধু বিমান রক্ষণাবেক্ষণ খাতেই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি ও ইন্দোনেশিয়ার কূটনৈতিক অবস্থানেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ায় মার্কিন হারকিউলিস হাব নিয়ে সার্বভৌমত্ব বিতর্ক ও আঞ্চলিক কৌশলগত উদ্বেগ বাড়ছে।
Sarakhon Report 



















