বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিপজ্জনক এলাকায় সতর্কতা থাকলেও পর্যাপ্ত নজরদারি, লাইফগার্ড এবং আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে প্রতিবছরই বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সতর্কতা থাকলেও নেই কার্যকর ব্যবস্থা
কক্সবাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করতে লাল পতাকা টাঙানো থাকলেও অধিকাংশ পর্যটক এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। অনেক এলাকায় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, পর্যাপ্ত লাইফগার্ড কিংবা স্পষ্ট নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড নেই। ফলে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের মধ্যেও পর্যটকরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সমুদ্রস্নান করছেন।
পর্যটকদের অভিযোগ, কোন এলাকা নিরাপদ আর কোন এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ সে বিষয়ে তারা পর্যাপ্ত তথ্য পান না। হোটেল কিংবা সৈকত এলাকায়ও নিরাপত্তা নির্দেশনা খুব কম দেখা যায়।

সীমিত জনবল, বাড়ছে ঝুঁকি
বর্তমানে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের সীমিত এলাকায় লাইফগার্ড সেবা রয়েছে। প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের মধ্যে মাত্র দেড় কিলোমিটার এলাকায় এই সেবা কার্যকর রয়েছে। মোট ২৭ জন লাইফগার্ড কর্মী থাকলেও প্রতি শিফটে দায়িত্ব পালন করেন মাত্র ১৮ জন।
লাইফগার্ড কর্মীদের ভাষ্য, প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক পানিতে নামলেও জনবল ও সরঞ্জাম সেই তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বর্তমানে তাদের হাতে রয়েছে সীমিত সংখ্যক উদ্ধার নৌকা ও রেসকিউ টিউব। আধুনিক উদ্ধার প্রযুক্তির অভাবে অনেক সময় দ্রুত সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
গত ১২ বছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অন্তত ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ২৫ জনকে। ২০২৫ সালে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন পর্যটক। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ জনে।
বিশেষ করে সি-গাল পয়েন্টকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সেখানে গত বছর একাধিক পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে।

সচেতনতার ঘাটতি বড় কারণ
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক পর্যটক সমুদ্রের স্রোত, জোয়ার-ভাটা কিংবা লাল পতাকার অর্থ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই পানিতে নামেন। হোটেলে চেক-ইনের সময় নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয় না, আবার সৈকত এলাকায়ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম সীমিত।
তাদের মতে, যাত্রাপথ থেকেই পর্যটকদের সতর্কবার্তা দেওয়া, হোটেলে নিরাপত্তা নির্দেশিকা বাধ্যতামূলক করা এবং সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড স্থাপন করা জরুরি।
উন্নয়নের উদ্যোগ
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লাইফগার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন এবং আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম এবং ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম ছাড়া বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আনন্দ ভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হতে পারে অপূরণীয় ট্র্যাজেডিতে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















