আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে যাত্রী আকর্ষণে বিলাসবহুল কেবিন তৈরির প্রতিযোগিতা এখন তুঙ্গে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, আরামদায়ক শোয়ার ব্যবস্থা, বড় স্পর্শনির্ভর পর্দা, অতিরিক্ত সংরক্ষণ সুবিধা ও আধুনিক নকশার আসন নিয়ে নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়িক ও প্রথম শ্রেণির কেবিন তৈরি করা হলেও সেগুলোর অনেকই এখনো যাত্রী বহনের অনুমোদন পায়নি। ফলে নতুন উড়োজাহাজে আসন বসানো থাকলেও সেগুলো খালি রেখেই উড়তে বাধ্য হচ্ছে একাধিক বিমান সংস্থা।
নতুন কেবিনে বিলাসিতা, কিন্তু ব্যবহারে বাধা
একটি ইউরোপীয় বিমান সংস্থা সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দূরপাল্লার উড়োজাহাজে ৩৪টি সম্পূর্ণ শোয়ার উপযোগী ব্যবসায়িক শ্রেণির আসন চালুর পরিকল্পনা করেছে। এসব আসনে রয়েছে ব্যক্তিগত দরজা, বড় স্পর্শনির্ভর পর্দা এবং উন্নত আরামদায়ক সুবিধা। তবে নিরাপত্তা অনুমোদন না পাওয়ায় উদ্বোধনী ফ্লাইটে আসনগুলো ব্যবহার করা যাবে না।
একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে আরও কয়েকটি শীর্ষ আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা। অনেকেই নতুন ব্যবসায়িক শ্রেণির ব্যক্তিগত কেবিন উন্মোচন করলেও নিরাপত্তা সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদন না আসায় সেগুলো এখনো যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা যায়নি।
কেন এত কঠোর পরীক্ষা?
বিমানে ব্যবহৃত আসন শুধু আরামের বিষয় নয়, এটি যাত্রীর নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসনের দরজার লক, সিটবেল্টের গঠন, আসনের কোণ কিংবা ব্যবহৃত উপকরণ—সবকিছুই দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীর নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বর্তমানের নতুন নকশার আসনগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। বিশেষ করে তির্যকভাবে বসানো আসন, ব্যক্তিগত কেবিন এবং বড় আকারের আসনের কারণে দুর্ঘটনার সময় যাত্রীর শরীরে আঘাতের ধরনও বদলে যেতে পারে। এজন্য প্রতিটি নতুন নকশাকে কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
কঠিন পরীক্ষার দীর্ঘ প্রক্রিয়া
নতুন আসনগুলোকে এমন পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয় যেখানে প্রবল ধাক্কার পরিস্থিতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়। আসনের স্থায়িত্ব, যাত্রীর সম্ভাব্য আঘাত, আগুন প্রতিরোধক্ষমতা এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ—সবকিছু যাচাই করা হয়।
বিশেষ পরীক্ষায় কৃত্রিম মানবদেহ ব্যবহার করে দেখা হয় দুর্ঘটনার সময় শরীরে কী ধরনের চাপ পড়ে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করা হয়, ব্যবহৃত হালকা উপকরণ আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে কি না।
বিমান সরবরাহেও তৈরি হচ্ছে জট
শুধু বিমান সংস্থাই নয়, উড়োজাহাজ নির্মাতারাও এই জটিলতার প্রভাব অনুভব করছে। অনেক নতুন উড়োজাহাজ সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকলেও আসনের অনুমোদন না মেলায় সেগুলো গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা যাচ্ছে না।
কিছু ক্ষেত্রে নতুন উড়োজাহাজে সীমিত সংখ্যক আসন ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় বাকি আসনগুলো অস্থায়ীভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে উন্নত সেবার জন্য অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার পরিকল্পনাও পিছিয়ে গেছে।
সময়ের সঙ্গে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক কেবিনের নকশা যত উন্নত হচ্ছে, নিরাপত্তা মূল্যায়নও তত জটিল হয়ে উঠছে। আগে যেখানে সাধারণ আসনের অনুমোদন তুলনামূলক সহজ ছিল, এখন ব্যক্তিগত কেবিন, নতুন উপকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় প্রতিটি নকশার জন্য আলাদা বিশ্লেষণ প্রয়োজন হচ্ছে।
এদিকে কিছু নতুন বিমান সংস্থা সময়মতো উড্ডয়ন শুরু করতে আসনের নকশায় পরিবর্তন এনে অনুমোদন পেলেও অনেক প্রতিষ্ঠিত সংস্থা এখনো দীর্ঘ অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে যাত্রীদের জন্য আরও আরামদায়ক ভ্রমণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা চালু হতে আরও সময় লাগতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















