এক সময় সংগ্রহযোগ্য কয়েন কেনাবেচা হতো দোকানে, নিলামঘরে বা বিশেষ প্রদর্শনীতে। এখন সেই ব্যবসার বড় একটি অংশ চলে এসেছে অনলাইনের সরাসরি সম্প্রচারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নয়, টানা কয়েক দিন ধরে সরাসরি সম্প্রচার চালিয়ে হাজারো দর্শকের সামনে কয়েন নিলামে তুলে কোটি কোটি টাকার বিক্রি করছেন এক মার্কিন ব্যবসায়ী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এই নতুন বাণিজ্যিক ধারা সংগ্রহযোগ্য পণ্যের বাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নতুন যুগের কেনাবেচা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কার একটি ছোট শহরে কয়েনের দোকান পরিচালনা করেন ৪১ বছর বয়সী বিয়র্ন বার্গস্ট্রম। ব্যবসায় নতুন গতি আনতে তিনি কয়েক বছর আগে অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে কয়েন বিক্রি শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান ব্যবসার মাধ্যম।
সম্প্রতি তিনি টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে প্রায় বিরতিহীনভাবে সরাসরি সম্প্রচার চালিয়ে সংগ্রহযোগ্য কয়েন নিলামে তোলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এক সপ্তাহে প্রায় ২০ লাখ ডলারের কয়েন বিক্রি করা। দীর্ঘ সময় সম্প্রচার চালালে নতুন দর্শক যুক্ত হবে এবং নিয়মিত ক্রেতারাও বেশি কেনাকাটা করবেন—এই ধারণা থেকেই তিনি এমন উদ্যোগ নেন।
দর্শকই এখন সবচেয়ে বড় সম্পদ
এই ধরনের সরাসরি সম্প্রচারে শুধু কেনাবেচাই হয় না, দর্শকদের সঙ্গে নিয়মিত কথোপকথনও চলে। অনেকেই প্রতিদিন একই অনুষ্ঠান দেখেন, মন্তব্য করেন এবং নিলামে অংশ নেন। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে এক ধরনের সামাজিক সম্পর্কও তৈরি হয়।
বার্গস্ট্রমের মতে, মানুষ শুধু পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখতে চায় না; তারা মানুষের গল্প, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব যোগাযোগের অংশ হতে চায়। সেই কারণেই সরাসরি সম্প্রচারের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।
দ্রুত নিলামের রোমাঞ্চ
এই সম্প্রচারের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কয়েক সেকেন্ডের নিলাম। একটি কয়েন পর্দায় দেখানোর পর মাত্র দুই সেকেন্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা সেটি কিনে নিতে পারতেন। কখনও কম দামের কয়েন, আবার হঠাৎই অনেক বেশি মূল্যবান কয়েন তুলে ধরা হতো। ফলে দর্শকদের পুরো সময় মনোযোগ ধরে রাখতে হতো।
অনেক ক্রেতার ভাষায়, এটি অনেকটা প্রতিযোগিতামূলক ভিডিও গেম খেলার মতো অভিজ্ঞতা, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় বিষয়।
দোকান থেকে ডিজিটাল ব্যবসায়
প্রায় এক দশক ধরে প্রচলিতভাবে কয়েনের ব্যবসা করলেও ২০২৩ সালে বিক্রি কমে যাওয়ার পর তিনি অনলাইনভিত্তিক এই পদ্ধতিতে বেশি গুরুত্ব দেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩০ জন কর্মী কাজ করছেন।
দীর্ঘ সম্প্রচারের সময় যাতে বিক্রি, প্যাকেজিং ও পণ্য পাঠানোর কাজ একসঙ্গে চলতে পারে, সে জন্য আগে থেকেই আলাদা পরিকল্পনা করা হয়। তিনি ও তাঁর সহ-উপস্থাপকরা পালাক্রমে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
লক্ষ্য ছাড়িয়ে বিক্রি
দীর্ঘ এই সম্প্রচারের শুরুটা খুব আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রথম দিনে বিক্রি ছিল গড়ের কাছাকাছি। পরে বিরল কয়েন ও মূল্যবান কাগুজে মুদ্রা বিক্রির মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলে যায়।
শেষ দিকে বড় অঙ্কের কয়েকটি বিক্রি হওয়ার পর মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ ৪৭ হাজার ডলার। এই সময়ে প্রায় ২০ হাজার ৭০০টি পণ্য বিক্রি হয় এবং ৭১৭ জন নতুন ক্রেতা যুক্ত হন। টানা ১৭৭ ঘণ্টা ১০ মিনিটের সম্প্রচারে দর্শকদের কাছ থেকে অন্তত ২৬ হাজার মন্তব্য আসে।
লাভের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে উপস্থিতি
বিক্রির অঙ্ক বিশাল হলেও এত দীর্ঘ আয়োজনের খরচও ছিল অনেক। উপহার হিসেবে বিপুল মূল্যের কয়েন বিতরণ, কর্মী ব্যয় ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে লাভ হয় তুলনামূলক কম। তবু ব্যবসায়ীর মতে, নতুন ক্রেতা অর্জন এবং দর্শকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলাই ছিল এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সরাসরি কেনাবেচা এখন সংগ্রহযোগ্য পণ্যের বাজারে নতুন ধারা তৈরি করছে। শুধু কয়েন নয়, পোশাক, খেলাধুলার স্মারক, সংগ্রহযোগ্য কার্ডসহ নানা ধরনের পণ্য এভাবে বিক্রি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে ডিজিটাল সম্প্রচারভিত্তিক বাণিজ্যের পরিধি আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















