ভুয়া তথ্য আজকের বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি গুজব মুহূর্তেই আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে, কিংবা প্রতারণার শিকার করতে পারে অসংখ্য মানুষকে। ফলে মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের দাবি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এমন আইন যদি সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের ক্ষমতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের হাতে কেন্দ্রীভূত করে, তবে সেটি গণতন্ত্রের জন্য নতুন বিপদও তৈরি করতে পারে।
ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি নিজের এলাকার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করলেন। পরে দেখা গেল তথ্যটি পুরোপুরি সঠিক ছিল না। ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য কি তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা উচিত? নাকি এটি ছিল একটি সদিচ্ছাপ্রসূত ভুল? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করে দেয় একটি আইনের প্রকৃত চরিত্র।
ফিলিপাইনে প্রস্তাবিত “ডিজিটাল মিডিয়া অ্যান্টি-ফলস ইনফরমেশন অ্যাক্ট” প্রথম দৃষ্টিতে ভুয়া তথ্য মোকাবিলার উদ্যোগ মনে হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি কেবল অপরাধ দমন নয়; বরং অনলাইন বক্তব্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কাঠামোও তৈরি করছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সত্য নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?
এই আইনের অধীনে প্রথম সিদ্ধান্ত নেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো। ফেসবুক, এক্স, টিকটক কিংবা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মই আগে ঠিক করবে কোনো পোস্ট থাকবে, সতর্কবার্তা পাবে, নাকি সরিয়ে ফেলা হবে। অর্থাৎ আদালতের বিচার শুরুর আগেই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কার্যত প্রথম বিচারকের ভূমিকা পালন করবে।
এরপর আসে তথাকথিত “ফ্যাক্ট-চেকিং” সংস্থাগুলোর ভূমিকা। আইনে বলা হয়েছে, স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্ল্যাটফর্মগুলো কাজ করবে। কিন্তু সেই স্বীকৃতি দেবে কে? কোন প্রতিষ্ঠান বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটি নয়—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া যদি অস্পষ্ট থাকে, তাহলে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের ঝুঁকি থেকেই যায়। কারণ, যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান সত্য যাচাইয়ের অধিকার পায়, বাস্তবে তিনিই জনমতের ওপর বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর যুক্ত হয়েছে সরকারি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মাধ্যমে। যদিও তারা সরাসরি কোনো পোস্টকে সত্য বা মিথ্যা ঘোষণা করবে না, তবু কোন প্ল্যাটফর্মের ওপর কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে, কারা তথ্য বিশ্লেষণ করবে এবং কোন বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা কার্যকর হবে—এসব ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব থাকবে। এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার অজুহাতে প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে নীরব সমন্বয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যার অনেকটাই জনসমক্ষে দৃশ্যমান হবে না।
সবশেষে আদালতের ভূমিকা আসে। এটিই প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী ঘোষণা করার চূড়ান্ত ক্ষমতা আদালতের কাছেই থাকবে। কিন্তু বাস্তব সমস্যা হলো, আদালতে মামলা পৌঁছানোর আগেই ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। একটি পোস্ট মুছে যেতে পারে, কোনো সংবাদমাধ্যমের আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিংবা একজন ব্যক্তির সামাজিক সুনাম ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। পরে আদালত যদি নির্দোষও ঘোষণা করে, ততক্ষণে সেই ক্ষতি আর পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয় না।

এই কারণেই বিষয়টি কেবল ভুয়া তথ্য দমন নয়; এটি মূলত বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো তৃতীয় পক্ষ যদি ঠিক করে দেয় কোন মতামত গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়, তাহলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
গণতান্ত্রিক সমাজে সত্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব কখনোই একক কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা উচিত নয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কিংবা নাগরিক উদ্যোগের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সত্য যাচাই সবচেয়ে কার্যকর হয় যখন তা বহুমাত্রিক, স্বাধীন এবং জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। একক কর্তৃত্ব বরং সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়ায়।
এই বাস্তবতায় কিছু নীতিগত পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার জন্য আলাদা সরকারি বা আধা-সরকারি স্বীকৃতি ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা এবং পেশাগত মানদণ্ড ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সেই কাঠামোর অধীনেই নিজেদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সরকার ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে কোনো কনটেন্ট অপসারণ বা নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত যোগাযোগ হলে তা লিখিত হতে হবে, কারণ উল্লেখ করতে হবে এবং জনসমক্ষে সংরক্ষিত নথি হিসেবে প্রকাশ করতে হবে। গোপন সমন্বয় গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তৃতীয়ত, বিদেশি প্রভাব বা বিদেশ-সমর্থিত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার সংজ্ঞা এতটাই স্পষ্ট হতে হবে যাতে সাধারণ নাগরিক সংগঠন, সাংবাদিক বা নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বা অনুদান গ্রহণের কারণে অযথা সন্দেহের মুখে না পড়েন।
ভুয়া তথ্য অবশ্যই একটি বাস্তব হুমকি। এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এমন কোনো আইন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যা অস্পষ্ট সংজ্ঞা, অতিরিক্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সীমিত জবাবদিহির মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। রোগের চিকিৎসা যদি রোগের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, তাহলে সেই চিকিৎসা সমাজের উপকারের বদলে ক্ষতিই ডেকে আনে।
একটি মুক্ত সমাজে সত্য নির্ধারণের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান এখনো আদালতই। উন্মুক্ত বিচার, স্পষ্ট আইন এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার সুযোগ—এই তিনটি নীতির ওপরই গণতন্ত্রের আস্থা টিকে থাকে। তাই ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই যেমন জরুরি, তেমনি সত্যের বিচারক কে হবেন—সেই প্রশ্নের উত্তরও সমান সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
লিটো অ্যাভেরিয়া 


















