তিস্তা নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় বন্যার দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। বরং নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। ভাঙনের মুখে পড়েছে বাড়িঘর, সড়ক, বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। একই সঙ্গে নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকার অন্তত ২০ হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর বিস্তীর্ণ চর ও নিম্নাঞ্চলে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি ওঠানামা করায় মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।
ভাঙনের নতুন শঙ্কা
পাউবোর রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, গত দুই দিনে নদীভাঙনে পাঁচ জেলায় অন্তত ৬৫টি পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। আগামী কয়েক দিনে নদীর পানি আবারও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের মাইকিং করে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী দুই দিনে রংপুর বিভাগ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উজানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর আরও তিন দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে তিস্তার পানি আবারও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পাউবো।
ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ, সড়ক ও সেতু
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় তিস্তার তীব্র স্রোতে তিস্তা সেতুর প্রতিরক্ষা বাঁধ ও ডান তীরের গ্রয়েন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কলকলন্দা ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় চরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানির নিচে চলে গেছে পাট, চিনাবাদাম ও আমনের বীজতলা।
মাহিপুর এলাকায় একটি সেতুর প্রায় ১৫০ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এতে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু, রংপুর-কাকিনা আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং আশপাশের হাজারো বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে। সেতুর সংযোগ সড়কে বড় ফাটল, দেবে যাওয়া ও গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।
কৃষিতে বড় ক্ষতির আশঙ্কা

পাঁচ জেলার শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও কৃষিজমি এখনো হাঁটুসমান পানির নিচে রয়েছে। নিরাপদ খাবার পানি, খাদ্য ও গবাদিপশুর খাদ্য সংকটে ভুগছেন অনেক পরিবার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৩২০ হেক্টর আমন ধান, ৮ হেক্টর মাষকলাই, ৮৬০ হেক্টর বীজ চিনাবাদাম এবং ৭৯০ হেক্টর সবজিক্ষেত প্লাবিত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ত্রাণের অপেক্ষায় দুর্গত মানুষ
চর শঙ্করদহ গ্রামের কৃষক আবদুল হালিম বলেন, রাতারাতি পানি বেড়ে বাড়িঘর ডুবে যায়। এখন পানি কমলেও নদীভাঙনের ভয় আরও বেশি।
বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা রহিমা বেগম জানান, বাড়িতে পানি ঢুকে যাওয়ার পর সন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটছে। এখনো কোনো ত্রাণ পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কলকলন্দা এলাকার কৃষক সালাম উদ্দিন বলেন, তার দেড় একর জমি এখনো পানির নিচে। গবাদিপশুর খাদ্য সংকটের পাশাপাশি আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

স্থানীয়দের উদ্যোগে নির্মিত বাঁধও ঝুঁকিতে
গঙ্গাচড়ার বড়াইবাড়ী ফেরিঘাটের বিপরীতে স্থানীয় মানুষের অর্থ ও স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মাটির বাঁধ গত তিন বছর ধরে পাঁচটি গ্রামের প্রায় ১২ হাজার পরিবারকে বন্যা থেকে রক্ষা করে আসছে। কিন্তু এবার সেই বাঁধের বিভিন্ন অংশেও ভাঙন শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পাশের সহায়ক বাঁধ ভেঙে গেলে মূল বাঁধটিও টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
ভাঙন ঠেকাতে পাউবো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রায় ২০০টি জিওব্যাগ ফেলেছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, সময়মতো ব্যবস্থা নিলে বর্তমান ক্ষয়ক্ষতির বড় অংশ এড়ানো যেত। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, আগেভাগে জিওব্যাগ ফেললে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না। তিনি আরও জানান, অস্থায়ী সুরক্ষার জন্য বসানো বাঁশের পাইলিং বর্ষার প্রথম দফার স্রোতেই ভেঙে পড়েছে।
রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, প্রশাসন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং শিগগিরই ত্রাণ বিতরণ শুরু হবে।
তবে দুর্গত মানুষের দাবি, কেবল জরুরি ত্রাণ নয়, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ী পুনর্বাসন এবং তিস্তা অববাহিকায় দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পই পারে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















