আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনেকের কাছেই এক অগোছালো, অনিশ্চিত ও ব্যাখ্যাতীত বাস্তবতা বলে মনে হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কিংবা ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ওঠানামা—সব মিলিয়ে বিশ্ব যেন দিকহারা। কিন্তু ঘটনাগুলোকে যদি দৈনন্দিন কূটনৈতিক নাটক হিসেবে না দেখে দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একটি ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। বিশৃঙ্খলা যতটা দৃশ্যমান, তার পেছনের রাজনৈতিক যুক্তি ততটাই সুস্পষ্ট।
আন্তর্জাতিক সংকটগুলো হঠাৎ জন্ম নেয় না। এগুলোর শিকড় বহু দশক, কখনও শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা নিরাপত্তা-উদ্বেগ, সাম্রাজ্যিক আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার ভারসাম্য ও আদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিহিত থাকে। বর্তমান বিশ্বের প্রধান সংঘাতগুলোর প্রতিটিই সেই দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিক ফল।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধের ব্যাপকতা বিশ্বকে বিস্মিত করলেও এর রাজনৈতিক ভিত্তি বহুদিন ধরেই স্পষ্ট ছিল। মস্কো কখনোই ইউক্রেনকে পুরোপুরি স্বাধীন ভূরাজনৈতিক সত্তা হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে কিয়েভের ঘনিষ্ঠতা রাশিয়ার কাছে শুধু কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং নিজস্ব শক্তি ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রশ্ন। সোভিয়েত-পরবর্তী বাস্তবতাকে অস্বীকার করে পুনরায় প্রভাবক্ষেত্র পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষাই এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে।

তাইওয়ান প্রশ্নেও একই ধরনের ধারাবাহিকতা দেখা যায়। বর্তমান উত্তেজনা নতুন নয়; এর ভিত্তি কোরীয় যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থায় স্থাপিত। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে তার প্রতিরক্ষা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করে, আর চীন দ্বীপটির ওপর নিজের দাবি কখনো প্রত্যাহার করেনি। কয়েক দশক ধরে কৌশলগত অস্পষ্টতা এই সংকটকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না, আবার দ্বীপটির নিরাপত্তা রক্ষার প্রতিশ্রুতিও পুরোপুরি অস্বীকার করে না। অন্যদিকে বেইজিংও সামরিক পদক্ষেপের হুমকি বজায় রেখেও পূর্ণমাত্রার সংঘাতে যায়নি। ফলে অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, কিন্তু সেটি অযৌক্তিক নয়।
অবশ্য এই ভারসাম্য চিরস্থায়ী হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্র যদি তার অবস্থান বদলে ফেলে অথবা চীন যদি শক্তি প্রয়োগের পথে হাঁটে, তাহলে সংকট দ্রুত বৈশ্বিক রূপ নিতে পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিও হঠাৎ সৃষ্টি হবে না; বরং দীর্ঘদিনের কৌশলগত দ্বন্দ্বের স্বাভাবিক পরিণতি হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও একই বাস্তবতার প্রতিফলন। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধ কিংবা ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা—দুটোরই ইতিহাস বহু পুরোনো। শান্তির জন্য ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা বহু বছর ধরে আলোচিত হলেও বাস্তবে উভয় পক্ষ সেই পথ থেকে আরও দূরে সরে গেছে। সহিংসতা বেড়েছে, মানবিক বিপর্যয় গভীর হয়েছে, কিন্তু সংঘাতের মূল কারণ অপরিবর্তিত রয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব বর্তমান বাস্তবতার ভিত্তি তৈরি করে। বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা পশ্চিমা প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কৌশল গ্রহণ করে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের প্রভাব সীমিত রাখতে সচেষ্ট থাকে। পারমাণবিক কর্মসূচি এই দ্বন্দ্বকে আরও জটিল করে তোলে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি কেবল একটি নির্দিষ্ট ঝুঁকি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিল; বৃহত্তর নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা কিন্তু অমীমাংসিতই থেকে যায়। পরে সেই চুক্তি বাতিল হওয়ায় উত্তেজনা আবার নতুন মাত্রা পায়।

এই উদাহরণগুলো দেখায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যাকে প্রায়ই ‘বিশৃঙ্খলা’ বলা হয়, তা মূলত দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ। প্রকৃত সংকট শুধু সংঘাতের অস্তিত্ব নয়; বরং এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া, যা আগে এই ধরনের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ বা প্রশমিত করতে সক্ষম ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমেছে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করেছে। একই সময়ে বিশ্বশক্তির ভারসাম্য ধীরে ধীরে ওয়াশিংটন থেকে বেইজিংয়ের দিকে সরে যাচ্ছে। এই রূপান্তর এখনো অসম্পূর্ণ, আর সেই অসম্পূর্ণতাই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
চীনও এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার প্রভাব দ্রুত বাড়লেও বৈশ্বিক নেতৃত্বের সঙ্গে যে দায়িত্ব ও জোট-রাজনীতি জড়িত, সে পথে বেইজিং পুরোপুরি অগ্রসর হয়নি। ফলে ক্ষমতার বিস্তার ঘটলেও নেতৃত্বের শূন্যতা রয়ে গেছে। একই কারণে চীন রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে—আদর্শগত কারণে নয়, বরং পশ্চিমা প্রভাবের ভারসাম্য পরিবর্তনের কৌশল হিসেবে।

রাশিয়াকে সমর্থন করা কিংবা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো তাই বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়; এগুলোর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর শক্তির প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই নৈতিক অবস্থানের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, আর বর্তমান বাস্তবতাও তার ব্যতিক্রম নয়।
তবু এই অস্থিরতার মধ্যেও পৃথিবী পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বাণিজ্য চলছে, উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে। পুরোনো বাণিজ্যপথ বদলাচ্ছে, নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে উঠছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সম্পূর্ণ থেমে যায়নি।
সমস্যা সম্ভবত বিশ্বের অযৌক্তিক হয়ে ওঠায় নয়; বরং আমরা তাকে ব্যাখ্যা করার পুরোনো কাঠামো হারিয়ে ফেলেছি। ইতিহাস, ভূরাজনীতি এবং শক্তির পরিবর্তিত ভারসাম্যকে একসঙ্গে না দেখলে বর্তমান সংকটগুলো বিচ্ছিন্ন ও রহস্যময় বলে মনে হয়। অথচ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয়, এগুলো দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রবণতারই ধারাবাহিক প্রকাশ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে বোঝার জন্য তাই নতুন কোনো অলৌকিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতাকে আবারও বিশ্লেষণের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।
জাকি লাইদি 


















