যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পারমাণবিক সমঝোতার আলোচনা আবারও কূটনৈতিক অঙ্গনে আশাবাদের জন্ম দিয়েছে। জুন মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এবং পরবর্তী উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ইঙ্গিত দেয় যে উভয় পক্ষ অন্তত সংলাপের পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু আলোচনার অগ্রগতি যতই দৃশ্যমান হোক না কেন, একটি মৌলিক বাস্তবতা এখনো অপরিবর্তিত—নতুন কোনো চুক্তি মূলত অতীতের ব্যর্থতার বিচারেই মূল্যায়িত হবে।
বর্তমান আলোচনা কেবল ভবিষ্যতের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নয়; এটি অতীতের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, আস্থাহীনতা এবং অসম বাস্তবায়নের উত্তরাধিকার নিয়েও। সেই কারণেই আলোচনার প্রতিটি ধাপ আগের চুক্তির অভিজ্ঞতার ছায়ায় আবদ্ধ।
অতীতের শিক্ষা কেন আজও নির্ধারক
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ (JCPOA) একসময় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সেই ভিত্তিকে ভেঙে দেয়। তেহরানের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সেই প্রতিশ্রুতির স্থায়িত্ব।

ইরানের নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা হলো, বর্তমান কোনো মার্কিন প্রশাসন চুক্তিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও ভবিষ্যতের প্রশাসন আবারও একই পথ অনুসরণ করতে পারে। ফলে শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এখন তাদের প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে।
এ কারণেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক অনুমোদন, রাশিয়া ও চীনের সমর্থন এবং বহুপক্ষীয় কাঠামোকে ইরান নতুন চুক্তির অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে চাইছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা তাদের এটাও মনে করিয়ে দেয় যে আন্তর্জাতিক অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে তা সবসময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ঠেকাতে পারে না।
শুধু কাগুজে নিশ্চয়তা নয়, কার্যকর সুরক্ষা
ইরানের অবস্থান ক্রমশ একটি ভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা ধারণার দিকে ঝুঁকেছে। তারা মনে করে, ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ যদি আবার চুক্তি ভঙ্গ করে, তাহলে তার জবাব দেওয়ার মতো বাস্তব সক্ষমতাও থাকতে হবে।
এই যুক্তির পেছনে রয়েছে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব। অতীতে উত্তেজনা বৃদ্ধির সময় এই জলপথকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। ফলে নতুন আলোচনায় রাজনৈতিক ভাষার পাশাপাশি বাস্তব কৌশলগত সক্ষমতাও আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
এটি কেবল সামরিক অবস্থান নয়; বরং ইরানের দৃষ্টিতে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিকে কার্যকর রাখার একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
অসম বাস্তবায়নের অভিযোগ
ইরানের অভ্যন্তরে জেসিপিওএর সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে একটি যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, তেহরান চুক্তির শর্ত পূরণে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছিল—সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করা পর্যন্ত। কিন্তু বিনিময়ে যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার কথা ছিল, তার বাস্তব সুফল দেশটি পায়নি।
এই অভিজ্ঞতা বর্তমান আলোচনায় ইরানের অবস্থানকে আরও কঠোর করেছে। এখন তারা কোনো মৌলিক ছাড় দেওয়ার আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বাস্তব প্রমাণ দেখতে চায়। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বাস্তবায়নই এখন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড।
জমাটবাঁধা সম্পদ: আলোচনার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন
ইরানের বিদেশে আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের সম্পদ নতুন আলোচনার অন্যতম জটিল ইস্যু। তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানি থেকে অর্জিত এই অর্থ বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ রয়েছে।
তেহরানের যুক্তি, এই অর্থ তাদের বৈধ সম্পদ এবং এর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদেরই থাকা উচিত। বিপরীতে ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, অর্থ ছাড় করা হলেও তা কঠোর নজরদারির আওতায় এবং মানবিক খাতে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
এই পার্থক্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাসের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, অবাধ অর্থপ্রবাহ আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রম ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে শক্তিশালী করতে পারে। অন্যদিকে ইরান এটিকে তাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে।
২০২৩ সালের বন্দি বিনিময় চুক্তির সময় কাতারে স্থানান্তরিত ইরানের অর্থ ব্যবহারে কঠোর মার্কিন নিয়ন্ত্রণও তেহরানের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। তাদের মতে, সেই ব্যবস্থায় অর্থ আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্ত হলেও বাস্তবে তা অর্থনৈতিক স্বস্তি এনে দিতে পারেনি।
অবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় বাধা
বর্তমান আলোচনা দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর সমাধান তুলনামূলক সহজ হলেও রাজনৈতিক আস্থার সংকট কাটানো অনেক কঠিন। যাচাই-বাছাই, চুক্তি বাস্তবায়নের ধাপ, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অবস্থান পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং অবরুদ্ধ সম্পদের প্রশ্ন—সবকিছুই একই মূল সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে, আর সেটি হলো পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব।
ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ আলোচনার এই পর্বে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতা কিছু অগ্রগতি এনে দিলেও সমঝোতার পথ এখনো দীর্ঘ। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি হবে কি না, তা অনিশ্চিত।
শেষ পর্যন্ত নতুন পারমাণবিক চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কোনো নতুন রাজনৈতিক ঘোষণার ওপর নয়; বরং উভয় পক্ষ কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে তার ওপর। কারণ ইতিহাসের অসমাপ্ত হিসাব মিটিয়ে না ফেললে ভবিষ্যতের কোনো সমঝোতাই স্থায়ী ভিত্তি পাবে না।
ভ্যালি কালেজি 


















