০৫:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
নতুন বিপর্যয়ে থমকে গেল ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, ভূমিকম্পের ধাক্কায় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা অনিশ্চিত বিশ্বব্যাংকের ১.১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা: খাদ্য নিরাপত্তা ও জরুরি সুরক্ষায় নতুন ভরসা বাংলাদেশের নতুন ৭ শিশুর মৃত্যু, হামে মৃতের সংখ্যা ৭০৯ ছাড়াল নিখোঁজের পর কুষ্টিয়ায় নদী থেকে উদ্ধার প্রতিবন্ধী যুবকের মরদেহ গাজীপুরে ডেঙ্গুতে ৯ বছরের শিশুর মৃত্যু সিরাজগঞ্জে তীব্র লোডশেডিংয়ে ক্ষোভ: পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও, বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন গ্রামবাসী নিষ্প্রভ উদারনীতির সংকট: কেন কেন্দ্রপন্থাকে আবার বিদ্রোহী হতে হবে বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের গোলঝড়, নিউ জিল্যান্ডকে উড়িয়ে নকআউটে শীর্ষে রেড ডেভিলস নতুন বাস্তবতায় উপসাগর: যুদ্ধের ধাক্কায় বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও রাজনীতি এবার লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থার ঝড়, বদলে যাচ্ছে রাজনীতির মানচিত্র

প্রফেসর ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ: যোগ্যতা যাকে সম্মানিত করেছে

২৬ জুন সকালে তখনও শুক্রবারের (ছুটির দিনের) বিছানা ছাড়েনি। সে সময়ে কর্মব্যস্ত দিল্লি থেকে একজন প্রখ্যাত সম্পাদক ফোন করে জানতে চাইলেন, বাংলাদেশে তাদের দেশের নতুন রাষ্ট্রদূত গতকাল থেকে যে কাজ শুরু করেছেন তার ইম্প্যাক্ট কেমন?

বলি দেখো, মূল মিডিয়ায় কীভাবে তাঁর কথা প্রকাশ হলো তা দিয়ে তো ইম্প্যাক্ট বুঝতে পারবো না। আসলে এটা বোঝার একমাত্র উপায় বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে গতকাল জোহরের নামাজের পর থেকেই আজ এই তুমি যখন ফোন করেছো সে সময় অবধি সামাজিক মাধ্যম ভরে আছে আমাদের একজন ডাক্তারকে গত সরকার ইমেরিটাস প্রফেসর করেছিল তার সেই পদ বাতিল করে- তাকে এ অবধি যে বেতন দেওয়া হয়েছিল তা ফেরত চেয়ে অসম্মানিত করা হয়েছে সেটা নিয়েই। এমনকি টেলিভিশন টক শো, সামাজিক মাধ্যমের টকশোগুলোতেই মূল আকর্ষণ সেটা। এর ফলে তোমাদের রাষ্ট্রদূতের সংবাদ নয়, রাষ্ট্রীয় অনেক বড় সংবাদও ঢেকে গেছে।

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপরে যা বলে তার অর্থ- এ তুমি কী বলছো? তখন তাকে বলি, দেখো মোটা দাগে আমাদের পাকিস্তান আমল থেকে এ পর্যন্ত তিনজন ডাক্তারকে ধারাবাহিকভাবে মানুষ ধন্বন্তরি হিসেবেই মনে করে। তারা গায়ে হাত দিলেই যেন রোগী সুস্থ হয়ে যান বা যেতেন বলে লোকে মনে করে। তাদের দুজন মারা গেছেন, বর্তমানে আছেন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ।

এই তিনজন হলেন প্রফেসর নূরুল ইসলাম, ও প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরি ও অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ। অধ্যাপক আবদুল্লাহর মৌলিক বই তোমাদের অল ইন্ডিয়া মেডিকেল রিসার্স ইনস্টিটিউটেও পড়ানো হয়। তাছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ানো হয়।

সে সম্পাদক মানুষ। কাজের তাড়া তাঁর। তাই তার মূল প্রশ্নের উত্তরটা পেয়ে যাওয়ার পরে দ্রুত কথা শেষ করে।

শুক্রবার সকাল হলেও একটু শরীরচর্চার জন্য একটা ছোট জায়গাতে জড়ো হয়েছিলাম। সেখানেও গিয়ে দেখি, তাদের অনেকেই প্রফেসর আবদুল্লাহকে ঘিরে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলছেন। এবং সকলেই দুঃখিত।

Nurul Islam: Celebrating the life of a freedom fighter - Rehman Sobhan | CPD

আমার অভিজ্ঞতা তাদের সঙ্গে শেয়ার না করে নীরবে ভাবতে থাকি কেন আমাদের দেশে এমন হয়? বাংলাদেশের আজকের প্রজন্ম জানে না প্রফেসর নুরুল ইসলাম কেমন ডাক্তার ছিলেন? কীভাবে তিনি রোগীর সেবা করে গেছেন, আর কত ডাক্তার তিনি তৈরি করেছেন। ১৯৯৫ কি ১৯৯৪-এর দিকে একটি ভুল চিকিৎসার সংকটে পড়ে তার কাছে গেলে তিনি বিনা ওষুধেই সুস্থ করে দিয়েছিলেন। যেমন অধ্যাপক আবদুল্লাহকে বড় একটা সমস্যা বোধ করে জানালে বলেন, “ওই একটা ওর স্যালাইন খান তো, আর একটু বেশি করে পানি খান- কাল যদি অসুবিধা হয় তখন ওষুধ দেওয়া যাবে”। দেখা যায় পরের দিন কোনো অসুবিধাই নেই। আবার সামান্য সমস্যা নিয়ে বললে বলেন, ছোট্ট একটা অ্যান্টিবায়োটিক লিখে নেন তো, আর এই দুই-তিনটে টেস্ট একটু করান। টেস্টগুলো করানোর পরে বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকটা চলুক ৫ দিন। আমার এখন প্রতিদিন দুটো খুবই সাধারণ ওষুধ খেতে হয় শরীরের সামান্য সমস্যার জন্য। খুবই কম দামের। একটি প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরির দেওয়া, আরেকটি প্রফেসর আবদুল্লাহর দেওয়া। এছাড়া বদরুদ্দোজা চৌধুরি চল্লিশে পড়লেই বলেছিলেন, বয়সটা একটু বেঁধে দেই। বলে একটা সস্তা ভিটামিন দিয়েছিলেন।

এই তিনজনের মধ্যে প্রফেসর নুরুল ইসলাম ও প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরিকে স্যার সম্বোধন করতাম। প্রফেসর আবদুল্লাহকে ভাই সম্বোধন করি। তিনিও তার অতি মিষ্টি গলায় দাদা বলেই ডাকেন।

প্রফেসর নুরুল ইসলামের সঙ্গে স্মৃতি কম। তবে তার শেষের দিকের দুঃখের ও পরোক্ষভাবে সরকারের করা অপমানের সঙ্গে অনেকটা জড়িয়ে যেতে হয়েছিল। তিনি একটি হাসপাতাল করতে গিয়ে ওই ১৯৯৪, ৯৫-তে যে কী নাজেহাল হয়েছেন সে প্রসঙ্গ নিয়ে সত্যিই একটা বই লেখা যায়। তার মূল অপরাধ ছিল তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন।

আর এর পরে প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরি বিএনপি থেকে রাষ্ট্রপতি হবার পরে কীভাবে নাজেহাল হয়েছিলেন তা হয়তো আজকের প্রজন্ম জানে না। বদরুদ্দোজা চৌধুরি রাজনীতি করুন আর মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি যখন যে পদে থাকুন না কেন, কখনই রোগী দেখা বন্ধ করেননি। যাহোক বিএনপি ওনাকে রাষ্ট্রপতি করেও কেন অপমান করে বের করে দিয়েছিলেন সেই তথ্য এখানে না-ই লিখি। তাহলে লেখা ভিন্ন দিকে চলে যাবে।

তবে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হবার পরে ওনার ওখানে মাঝে মাঝেই যেতাম। এবং সেটা যেতাম নিজের প্রয়োজনে। কারণ, একজন সাংবাদিক হতে গেলে প্রথমে মানুষকে সম্মান করতে ও ভালোবাসতে শিখতে হয়। প্রফেসর নুরুল ইসলাম, প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরি ও প্রফেসর এবিএম আবদুল্লাহর কাছে গেলে সত্যিই মানুষকে ভালোবাসা ও সম্মান কীভাবে করতে হয় তা শেখা যায়।

প্রফেসর নুরুল ইসলাম, প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরির যেমন অনেক ঘটনার পেশাগত কারণে বা রোগী হিসেবে সাক্ষী, প্রফেসর এবিএম আবদুল্লাহর ক্ষেত্রেও তেমনি। শুধু একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করি, আমার জীবনের বন্ধু চিত্রার একটি গাইনি প্রবলেম। দেশে ও বাইরের দুটি দেশে অনেক নামকরা ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কিন্তু কিছুটা সমস্যা থেকে যাচ্ছে। চিত্রার বিশ্বাস তার অন্য সকল রোগের মতো এটাও আবদুল্লাহ ভাইয়ের কাছে গেলে সেরে যাবে। তার সঙ্গী হিসেবে গিয়ে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ওনার রুমে বসেছি মাত্র, এর ভেতর গ্রাম থেকে আসা একটি পরিবার- দিনমজুরও হতে পারে বা সিকিউরিটি গার্ডও হতে পারে। পরিবারটির মহিলা সদস্যের কোলে একটি শিশু।শিশুটির শরীরের নিচের দিকে কোনো পোশাক নেই। তারা কোনো বাধা না মেনেই প্রফেসর আবদুল্লাহর রুমে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে আর সেই সঙ্গে বাচ্চাটি তীব্র স্বরে কাঁদছে। রুমের দ্বাররক্ষক তার সকল সাধ্য দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

একনজরে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী

প্রফেসর আবদুল্লাহ তাদেরকে বাধা দিতে নিষেধ করে ভেতরে আসতে বলেন। বাচ্চাটির কান্নার উচ্চ স্বরের কারণে তাদের কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। প্রফেসর আবদুল্লাহ দ্রুত নিজেই বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে তার সঙ্গে নানান ধরনের আদরের স্বর উচ্চারণ করে ও শরীরে আদর করে শান্ত করেন। তারপরে তিনি তার একজন জুনিয়র ডাক্তারকে দিয়ে তাদেরকে একতলা বা দুই তলা নিচে শিশু ডিপার্টমেন্টের প্রধানের রুমে পাঠিয়ে দেন। এই ধরনের ময়লা কাপড়চোপড় পরা ঘরের বাচ্চাকে এর আগে আমি একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া আর কোনো মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষকে ওইভাবে নিজের করে কোলে নিতে দেখিনি। এনজিও করা মানুষদেরও দেখেছি পরে টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ডেঙ্গিপ্রবণ এলাকা। যদিও আমরা এখানে ডেঙ্গিকে ডেঙ্গু বলি। এই ডেঙ্গু জ্বরে এদেশে এ যাবৎ অনেক মানুষ মারা গেছেন। পৃথিবীতে কেউ বলেনি যে ডাক্তাররা সব মানুষকে, সব রোগীকে বাঁচাতে পারবেন। তাহলে প্রকৃতির নিয়ম ব্যর্থ হয়ে যেত। তবে এটা সত্য, অধ্যাপক আবদুল্লাহ ডেঙ্গু চিকিৎসার যে পদ্ধতি বাংলাদেশে চালু করেছেন এবং তার ছাত্রদের সেভাবে প্রশিক্ষিত করেছেন- তার ফলে প্রতিবেশী অন্য যে কোনো দেশের থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গিতে মৃত্যু কম। পাশ্ববর্তী ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গু চিকিৎসা অনেক ভালো। আর বিশেষ করে আমাদের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হাসপাতাল বা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় যেটা, আগে পিজি ছিল, তারপরে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনূসের আমল থেকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে ছিল প্রফেসর আবদুল্লাহর দীর্ঘ সময়ের ও শেষ অবধি কর্মস্থল। ডেঙ্গু হলে তার অধীনে ভর্তি হতে পারলে ধরে নেওয়া যেত রোগী সুস্থ হয়ে ফিরবে।

এ অভিজ্ঞতা নিজ পরিবারেও আছে। গত সরকারের আমলে লেখার কারণে রাজরোষে পড়ে যাই। তখন মূলত বন্ধু-বান্ধবরাই সংসার থেকে সব কিছু সামলাচ্ছে। এর ভেতর ছেলের জ্বর। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বা পাশ করে গেছে এমন কিছু ছোট ভাই মিলে ছেলেকে একটি নামকরা হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু তিন দিনে শরীরের তাপমাত্রা তো কমে না বরং মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায়। তিন দিন পরে চিত্রা আর তাঁর ছেলেকে নিয়ে রিস্ক না নিয়ে প্রফেসর আবদুল্লাহর অধীনে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে। পরের দিন জানতে পারি ছেলের শরীরের তাপমাত্রা ভর্তি হবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নেমে গেছে। দেখতে যাবার সুযোগ পাইনি। তারপরের দিন দুপুরে নিজে মুক্ত হয়ে সোজা হাসপাতালের দিকে রওনা দিয়ে ছেলেকে ফোন করতেই সে বলে, বাবা, “আঙ্কেল বাসায় চলে আসতে বলেছেন, তাই আমি বাসায় চলে এসেছি। ভাইয়ারা কাগজপত্র ঠিক করে বাসায় দিয়ে যাবে”। বাসায় এসে দেখি ছেলে খুবই দুর্বল। অথচ সামনে ওর পরীক্ষা। একটু চিন্তা করছি- এমন সময় প্রফেসর আবদুল্লাহ ভাই ফোন করেন। ফোনে উনি বললেন, ছেলেকে বলে দিয়েছি, আপাতত কয়েকদিন যেন খুব বেশি হাঁটাহাঁটি না করে। ইউনিভার্সিটিতেও যেহেতু লিফট আছে ক্লাসে যাক। বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে গেলে দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে।

২০০১-এর পরে বাংলাদেশে যখন ভয়াবহ রকম সংখ্যালঘু নির্যাতন চলছে। দেশের বুদ্ধিজীবী মহল সারাদেশ ঘুরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করছেন। সে সময়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ি। হার্টের সমস্যা মনে করে পাশে থাকা বন্ধু ও তৎকালীন আমেরিকান এম্বাসির পলিটিক্যাল কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী ভাই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে (হৃদরোগের হাসপাতাল) নিয়ে যান। হার্টে কোনো প্রবলেম নেই। অথচ সমস্যাগুলো হচ্ছে। তখন সাংবাদিক আতাউস সামাদ ভাই খবর পেয়ে তিনি বদরুদ্দোজা চৌধুরির কাছে নিয়ে যান। প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরি ওই সব রিপোর্ট যে খুব দেখলেন তা নয়- বললেন, বাসায় তো খুব ভালো সম্পর্ক জানি। কর্মক্ষেত্রে কি মানসিক সমস্যা হচ্ছে? বললাম কিছুটা হচ্ছে। উনি বললেন, চাকরিটা ছেড়ে দাও। বলে উনি এক মাসের জন্য একটা মেন্টাল পিসের ওষুধ দিলেন। আর বললেন, এখন থেকে পরিবেশ ও মানুষ চয়েস করতে শিখতে হবে। বিরক্ত হলে তার সঙ্গে বন্ধুত্বটা ওইভাবেই একটা গ্যাপ রেখে রাখতে হবে। আর কাজের পরিবেশ বিরক্তিকর হলেই সেটা ত্যাগ করতে হবে। তাছাড়া ভালো বইপড়া আর গান শোনার অভ্যাস তো আছেই- অতএব সুস্থ থাকায় কোনো অসুবিধা নেই- বলে উনি ওনার প্যাডে ওষুধের নামটির সঙ্গে সঙ্গে নিজে হাতে লিখে দিলেন ৭০ বছর বয়স অবধি হার্টের কোনো কাটা-ছেঁড়ার দরকার হবে না।

গত একদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে দেখছি, প্রফেসর আবদুল্লাহর কাছে বিভিন্ন মানুষ তাদের সুস্থ হবার ও তাদের চিকিৎসা নেবার স্মৃতি লিখছেন। প্রায় সবারই একই ধরনের অভিজ্ঞতা। অহেতুক কোনো টেস্ট নেই। তাছাড়া রোগীর স্বজনকে ফোন করেও তিনি বলে দেন, রোগীর এই সমস্যা আছে তাকে কীভাবে চলতে হবে। অর্থাৎ প্রচারের জন্য যে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন তা নয়, অতি সাধারণ রোগীকেও শত ব্যস্ততার মাঝেও তার জন্য যা প্রয়োজনীয় সেটা করেন।

অর্থাৎ ডাক্তারির মাধ্যমে আয়-রোজগার করা তার মূল লক্ষ্য নয়, মানবসেবাই তার লক্ষ্য।

শেখ মুজিব ছাড়াও যেসব ক্ষমতাধরদের মূর্তি ভাঙা হয়েছে

কোভিডের লকডাউনের সময় তিনি অধিকাংশ রোগীকে পরামর্শ দিয়েছেন খুব খারাপ অবস্থা না হলে হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিতে- সে রকম একটা চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রও তিনি দিতেন। আমার মোট পাঁচবার কোভিড হয়েছে। তার ভেতর দুইবার দিল্লিতে থাকা অবস্থায়। জ্বরের লক্ষণ শুনেই তিনি ওষুধ দিয়েছেন। একবার জ্বর নিয়ে দুইদিন পরেই তাকে ফোন করতেই তিনি গলার স্বর শুনেই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দেন। বলেন, কোভিডের সঙ্গে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ, কোনো লং কোভিডের ধাক্কা শরীরে পড়েনি তাঁর সুচিকিৎসার ফলে।

লেখাটাতে কিছু স্মৃতিই উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, তাঁর ডাক্তারি বিদ্যা নিয়ে লেখার কোনো জ্ঞান তো আমার নেই।

প্রফেসর নুরুল ইসলামের কাছে প্রথম স্মৃতি ছিলো এমনিটি- অনেকগুলো টেস্ট করিয়ে একজন ডাক্তার যখন বললেন কিডনিতে সমস্যা হয়েছে – তখন পরিবার থেকে বললো চেন্নাই আর কোথায় কোথায় যেন নিয়ে যাবে। আমার খুব একটা ইচ্ছে না। কারণ আমার ধারণা আছে ওসব জায়গার চিকিৎসা নিয়ে। এ সময়ে গাজী শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের স্ত্রী বললেন, ভারতে যেও তবে আজ একটু নুরুল ইসলাম সাহেবকে দেখিয়ে এসো। বলে উনি ফোন করে দিলেন।

প্রফেসর নুরুল ইসলামের কাছে গেলে উনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তারপরে ওই ব্যবস্থাপত্র ও একগাদা টেস্ট দেখে বিরক্ত হলেন ঠিক- কিন্তু হেসে বললেন, তোমার কিছু হয়নি। বললাম স্যার কোনো ওষুধ দেবেন না, হেসে বললেন ওষুধ খেতে চাও। বলে ড্রয়ারে হাত দিয়ে একটি ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের ভায়াল দিলেন। তখন ফাইজার কোম্পানি বা রেনাটা এটা তৈরি করতো। প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরিও শুধু প্রেসারটা মেপে আর বুকে একটু স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে বলেছিলেন, কিছুই হয়নি। তারপরে যে ওষুধ লিখেছিলেন, মাসে তার মূল্য পড়তো ২১ টাকা। ওনাকে দেখাতে গেলে একটা ফরম ফিলাপ করতে হতো। সেখানে আয়ের পরিমাণ কত তা লিখতে হতো। প্রশ্ন করেছিলাম স্যার এটা কেন? তিনি বলেছিলেন, দেখ প্রত্যেককে তার আয়ের মধ্যে একটা বাজেট করে চলতে হয়। যদি ওষুধ কেনার টাকা জোগাড়ের চাপ তার মাথায় ঢুকে যায় তাহলে তো আর তার রোগ সারবে না। আগে তো মন তারপরে তো শরীর। আর প্রফেসর আবদুল্লাহর গলার স্বর শুনেই কোভিডের সঙ্গে নিউমোনিয়ার ওষুধ দেওয়ার কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

এছাড়া গত দুই দিনে সামাজিক মাধ্যমে হাজার হাজার স্মৃতি পাচ্ছি প্রফেসর আবদুল্লাহর চিকিত্‌সাসেবা নিয়ে।  সবাই বলছেন, একটি বা দুটি ওষুধ খেয়েছেন- তাতেই কীভাবে সুস্থ হয়ে গেছেন। হাজার হাজার মানুষের এই প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে প্রফেসর আবদুল্লাহকে কর্তৃপক্ষ অপমান করেই যেন আরেকবার দেশের মানুষকে তাদের ভালোবাসার ও শ্রদ্ধার মুকুটটি অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহর মাথায় পরিয়ে দেওয়ার সুযোগ দিল।

কিন্তু সব শেষে একটি প্রশ্ন আসে, আসলে জাতি হিসেবে আমাদের সমস্যা কোথায়? এ জাতির একমাত্র বীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাস্কর্যের মাথায় উঠে আমরা প্রস্রাব করি। দেশের গত ৬০ বছরের তিনজন গুণী ডাক্তার যাদেরকে গোটা দেশ শ্রদ্ধা করতো বা করে। তাদের প্রত্যেকেই অপমানিত হতে হলো।

জাতির এই রোগের চিকিৎসা কে করবে? যে জাতির একদল মানুষ দীর্ঘকায় বীরকে সরিয়ে সেখানে বামনকে বসাতে পছন্দ করে, গুণীকে সম্মান না করে অসম্মান করে আনন্দ পায়। এ রোগের চিকিৎসা কী?

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন বিপর্যয়ে থমকে গেল ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, ভূমিকম্পের ধাক্কায় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা অনিশ্চিত

প্রফেসর ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ: যোগ্যতা যাকে সম্মানিত করেছে

০৪:০১:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

২৬ জুন সকালে তখনও শুক্রবারের (ছুটির দিনের) বিছানা ছাড়েনি। সে সময়ে কর্মব্যস্ত দিল্লি থেকে একজন প্রখ্যাত সম্পাদক ফোন করে জানতে চাইলেন, বাংলাদেশে তাদের দেশের নতুন রাষ্ট্রদূত গতকাল থেকে যে কাজ শুরু করেছেন তার ইম্প্যাক্ট কেমন?

বলি দেখো, মূল মিডিয়ায় কীভাবে তাঁর কথা প্রকাশ হলো তা দিয়ে তো ইম্প্যাক্ট বুঝতে পারবো না। আসলে এটা বোঝার একমাত্র উপায় বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে গতকাল জোহরের নামাজের পর থেকেই আজ এই তুমি যখন ফোন করেছো সে সময় অবধি সামাজিক মাধ্যম ভরে আছে আমাদের একজন ডাক্তারকে গত সরকার ইমেরিটাস প্রফেসর করেছিল তার সেই পদ বাতিল করে- তাকে এ অবধি যে বেতন দেওয়া হয়েছিল তা ফেরত চেয়ে অসম্মানিত করা হয়েছে সেটা নিয়েই। এমনকি টেলিভিশন টক শো, সামাজিক মাধ্যমের টকশোগুলোতেই মূল আকর্ষণ সেটা। এর ফলে তোমাদের রাষ্ট্রদূতের সংবাদ নয়, রাষ্ট্রীয় অনেক বড় সংবাদও ঢেকে গেছে।

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপরে যা বলে তার অর্থ- এ তুমি কী বলছো? তখন তাকে বলি, দেখো মোটা দাগে আমাদের পাকিস্তান আমল থেকে এ পর্যন্ত তিনজন ডাক্তারকে ধারাবাহিকভাবে মানুষ ধন্বন্তরি হিসেবেই মনে করে। তারা গায়ে হাত দিলেই যেন রোগী সুস্থ হয়ে যান বা যেতেন বলে লোকে মনে করে। তাদের দুজন মারা গেছেন, বর্তমানে আছেন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ।

এই তিনজন হলেন প্রফেসর নূরুল ইসলাম, ও প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরি ও অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ। অধ্যাপক আবদুল্লাহর মৌলিক বই তোমাদের অল ইন্ডিয়া মেডিকেল রিসার্স ইনস্টিটিউটেও পড়ানো হয়। তাছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ানো হয়।

সে সম্পাদক মানুষ। কাজের তাড়া তাঁর। তাই তার মূল প্রশ্নের উত্তরটা পেয়ে যাওয়ার পরে দ্রুত কথা শেষ করে।

শুক্রবার সকাল হলেও একটু শরীরচর্চার জন্য একটা ছোট জায়গাতে জড়ো হয়েছিলাম। সেখানেও গিয়ে দেখি, তাদের অনেকেই প্রফেসর আবদুল্লাহকে ঘিরে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলছেন। এবং সকলেই দুঃখিত।

Nurul Islam: Celebrating the life of a freedom fighter - Rehman Sobhan | CPD

আমার অভিজ্ঞতা তাদের সঙ্গে শেয়ার না করে নীরবে ভাবতে থাকি কেন আমাদের দেশে এমন হয়? বাংলাদেশের আজকের প্রজন্ম জানে না প্রফেসর নুরুল ইসলাম কেমন ডাক্তার ছিলেন? কীভাবে তিনি রোগীর সেবা করে গেছেন, আর কত ডাক্তার তিনি তৈরি করেছেন। ১৯৯৫ কি ১৯৯৪-এর দিকে একটি ভুল চিকিৎসার সংকটে পড়ে তার কাছে গেলে তিনি বিনা ওষুধেই সুস্থ করে দিয়েছিলেন। যেমন অধ্যাপক আবদুল্লাহকে বড় একটা সমস্যা বোধ করে জানালে বলেন, “ওই একটা ওর স্যালাইন খান তো, আর একটু বেশি করে পানি খান- কাল যদি অসুবিধা হয় তখন ওষুধ দেওয়া যাবে”। দেখা যায় পরের দিন কোনো অসুবিধাই নেই। আবার সামান্য সমস্যা নিয়ে বললে বলেন, ছোট্ট একটা অ্যান্টিবায়োটিক লিখে নেন তো, আর এই দুই-তিনটে টেস্ট একটু করান। টেস্টগুলো করানোর পরে বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকটা চলুক ৫ দিন। আমার এখন প্রতিদিন দুটো খুবই সাধারণ ওষুধ খেতে হয় শরীরের সামান্য সমস্যার জন্য। খুবই কম দামের। একটি প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরির দেওয়া, আরেকটি প্রফেসর আবদুল্লাহর দেওয়া। এছাড়া বদরুদ্দোজা চৌধুরি চল্লিশে পড়লেই বলেছিলেন, বয়সটা একটু বেঁধে দেই। বলে একটা সস্তা ভিটামিন দিয়েছিলেন।

এই তিনজনের মধ্যে প্রফেসর নুরুল ইসলাম ও প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরিকে স্যার সম্বোধন করতাম। প্রফেসর আবদুল্লাহকে ভাই সম্বোধন করি। তিনিও তার অতি মিষ্টি গলায় দাদা বলেই ডাকেন।

প্রফেসর নুরুল ইসলামের সঙ্গে স্মৃতি কম। তবে তার শেষের দিকের দুঃখের ও পরোক্ষভাবে সরকারের করা অপমানের সঙ্গে অনেকটা জড়িয়ে যেতে হয়েছিল। তিনি একটি হাসপাতাল করতে গিয়ে ওই ১৯৯৪, ৯৫-তে যে কী নাজেহাল হয়েছেন সে প্রসঙ্গ নিয়ে সত্যিই একটা বই লেখা যায়। তার মূল অপরাধ ছিল তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন।

আর এর পরে প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরি বিএনপি থেকে রাষ্ট্রপতি হবার পরে কীভাবে নাজেহাল হয়েছিলেন তা হয়তো আজকের প্রজন্ম জানে না। বদরুদ্দোজা চৌধুরি রাজনীতি করুন আর মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি যখন যে পদে থাকুন না কেন, কখনই রোগী দেখা বন্ধ করেননি। যাহোক বিএনপি ওনাকে রাষ্ট্রপতি করেও কেন অপমান করে বের করে দিয়েছিলেন সেই তথ্য এখানে না-ই লিখি। তাহলে লেখা ভিন্ন দিকে চলে যাবে।

তবে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হবার পরে ওনার ওখানে মাঝে মাঝেই যেতাম। এবং সেটা যেতাম নিজের প্রয়োজনে। কারণ, একজন সাংবাদিক হতে গেলে প্রথমে মানুষকে সম্মান করতে ও ভালোবাসতে শিখতে হয়। প্রফেসর নুরুল ইসলাম, প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরি ও প্রফেসর এবিএম আবদুল্লাহর কাছে গেলে সত্যিই মানুষকে ভালোবাসা ও সম্মান কীভাবে করতে হয় তা শেখা যায়।

প্রফেসর নুরুল ইসলাম, প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরির যেমন অনেক ঘটনার পেশাগত কারণে বা রোগী হিসেবে সাক্ষী, প্রফেসর এবিএম আবদুল্লাহর ক্ষেত্রেও তেমনি। শুধু একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করি, আমার জীবনের বন্ধু চিত্রার একটি গাইনি প্রবলেম। দেশে ও বাইরের দুটি দেশে অনেক নামকরা ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কিন্তু কিছুটা সমস্যা থেকে যাচ্ছে। চিত্রার বিশ্বাস তার অন্য সকল রোগের মতো এটাও আবদুল্লাহ ভাইয়ের কাছে গেলে সেরে যাবে। তার সঙ্গী হিসেবে গিয়ে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ওনার রুমে বসেছি মাত্র, এর ভেতর গ্রাম থেকে আসা একটি পরিবার- দিনমজুরও হতে পারে বা সিকিউরিটি গার্ডও হতে পারে। পরিবারটির মহিলা সদস্যের কোলে একটি শিশু।শিশুটির শরীরের নিচের দিকে কোনো পোশাক নেই। তারা কোনো বাধা না মেনেই প্রফেসর আবদুল্লাহর রুমে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে আর সেই সঙ্গে বাচ্চাটি তীব্র স্বরে কাঁদছে। রুমের দ্বাররক্ষক তার সকল সাধ্য দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

একনজরে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী

প্রফেসর আবদুল্লাহ তাদেরকে বাধা দিতে নিষেধ করে ভেতরে আসতে বলেন। বাচ্চাটির কান্নার উচ্চ স্বরের কারণে তাদের কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। প্রফেসর আবদুল্লাহ দ্রুত নিজেই বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে তার সঙ্গে নানান ধরনের আদরের স্বর উচ্চারণ করে ও শরীরে আদর করে শান্ত করেন। তারপরে তিনি তার একজন জুনিয়র ডাক্তারকে দিয়ে তাদেরকে একতলা বা দুই তলা নিচে শিশু ডিপার্টমেন্টের প্রধানের রুমে পাঠিয়ে দেন। এই ধরনের ময়লা কাপড়চোপড় পরা ঘরের বাচ্চাকে এর আগে আমি একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া আর কোনো মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষকে ওইভাবে নিজের করে কোলে নিতে দেখিনি। এনজিও করা মানুষদেরও দেখেছি পরে টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ডেঙ্গিপ্রবণ এলাকা। যদিও আমরা এখানে ডেঙ্গিকে ডেঙ্গু বলি। এই ডেঙ্গু জ্বরে এদেশে এ যাবৎ অনেক মানুষ মারা গেছেন। পৃথিবীতে কেউ বলেনি যে ডাক্তাররা সব মানুষকে, সব রোগীকে বাঁচাতে পারবেন। তাহলে প্রকৃতির নিয়ম ব্যর্থ হয়ে যেত। তবে এটা সত্য, অধ্যাপক আবদুল্লাহ ডেঙ্গু চিকিৎসার যে পদ্ধতি বাংলাদেশে চালু করেছেন এবং তার ছাত্রদের সেভাবে প্রশিক্ষিত করেছেন- তার ফলে প্রতিবেশী অন্য যে কোনো দেশের থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গিতে মৃত্যু কম। পাশ্ববর্তী ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গু চিকিৎসা অনেক ভালো। আর বিশেষ করে আমাদের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হাসপাতাল বা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় যেটা, আগে পিজি ছিল, তারপরে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনূসের আমল থেকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে ছিল প্রফেসর আবদুল্লাহর দীর্ঘ সময়ের ও শেষ অবধি কর্মস্থল। ডেঙ্গু হলে তার অধীনে ভর্তি হতে পারলে ধরে নেওয়া যেত রোগী সুস্থ হয়ে ফিরবে।

এ অভিজ্ঞতা নিজ পরিবারেও আছে। গত সরকারের আমলে লেখার কারণে রাজরোষে পড়ে যাই। তখন মূলত বন্ধু-বান্ধবরাই সংসার থেকে সব কিছু সামলাচ্ছে। এর ভেতর ছেলের জ্বর। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বা পাশ করে গেছে এমন কিছু ছোট ভাই মিলে ছেলেকে একটি নামকরা হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু তিন দিনে শরীরের তাপমাত্রা তো কমে না বরং মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায়। তিন দিন পরে চিত্রা আর তাঁর ছেলেকে নিয়ে রিস্ক না নিয়ে প্রফেসর আবদুল্লাহর অধীনে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে। পরের দিন জানতে পারি ছেলের শরীরের তাপমাত্রা ভর্তি হবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নেমে গেছে। দেখতে যাবার সুযোগ পাইনি। তারপরের দিন দুপুরে নিজে মুক্ত হয়ে সোজা হাসপাতালের দিকে রওনা দিয়ে ছেলেকে ফোন করতেই সে বলে, বাবা, “আঙ্কেল বাসায় চলে আসতে বলেছেন, তাই আমি বাসায় চলে এসেছি। ভাইয়ারা কাগজপত্র ঠিক করে বাসায় দিয়ে যাবে”। বাসায় এসে দেখি ছেলে খুবই দুর্বল। অথচ সামনে ওর পরীক্ষা। একটু চিন্তা করছি- এমন সময় প্রফেসর আবদুল্লাহ ভাই ফোন করেন। ফোনে উনি বললেন, ছেলেকে বলে দিয়েছি, আপাতত কয়েকদিন যেন খুব বেশি হাঁটাহাঁটি না করে। ইউনিভার্সিটিতেও যেহেতু লিফট আছে ক্লাসে যাক। বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে গেলে দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে।

২০০১-এর পরে বাংলাদেশে যখন ভয়াবহ রকম সংখ্যালঘু নির্যাতন চলছে। দেশের বুদ্ধিজীবী মহল সারাদেশ ঘুরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করছেন। সে সময়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ি। হার্টের সমস্যা মনে করে পাশে থাকা বন্ধু ও তৎকালীন আমেরিকান এম্বাসির পলিটিক্যাল কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী ভাই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে (হৃদরোগের হাসপাতাল) নিয়ে যান। হার্টে কোনো প্রবলেম নেই। অথচ সমস্যাগুলো হচ্ছে। তখন সাংবাদিক আতাউস সামাদ ভাই খবর পেয়ে তিনি বদরুদ্দোজা চৌধুরির কাছে নিয়ে যান। প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরি ওই সব রিপোর্ট যে খুব দেখলেন তা নয়- বললেন, বাসায় তো খুব ভালো সম্পর্ক জানি। কর্মক্ষেত্রে কি মানসিক সমস্যা হচ্ছে? বললাম কিছুটা হচ্ছে। উনি বললেন, চাকরিটা ছেড়ে দাও। বলে উনি এক মাসের জন্য একটা মেন্টাল পিসের ওষুধ দিলেন। আর বললেন, এখন থেকে পরিবেশ ও মানুষ চয়েস করতে শিখতে হবে। বিরক্ত হলে তার সঙ্গে বন্ধুত্বটা ওইভাবেই একটা গ্যাপ রেখে রাখতে হবে। আর কাজের পরিবেশ বিরক্তিকর হলেই সেটা ত্যাগ করতে হবে। তাছাড়া ভালো বইপড়া আর গান শোনার অভ্যাস তো আছেই- অতএব সুস্থ থাকায় কোনো অসুবিধা নেই- বলে উনি ওনার প্যাডে ওষুধের নামটির সঙ্গে সঙ্গে নিজে হাতে লিখে দিলেন ৭০ বছর বয়স অবধি হার্টের কোনো কাটা-ছেঁড়ার দরকার হবে না।

গত একদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে দেখছি, প্রফেসর আবদুল্লাহর কাছে বিভিন্ন মানুষ তাদের সুস্থ হবার ও তাদের চিকিৎসা নেবার স্মৃতি লিখছেন। প্রায় সবারই একই ধরনের অভিজ্ঞতা। অহেতুক কোনো টেস্ট নেই। তাছাড়া রোগীর স্বজনকে ফোন করেও তিনি বলে দেন, রোগীর এই সমস্যা আছে তাকে কীভাবে চলতে হবে। অর্থাৎ প্রচারের জন্য যে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন তা নয়, অতি সাধারণ রোগীকেও শত ব্যস্ততার মাঝেও তার জন্য যা প্রয়োজনীয় সেটা করেন।

অর্থাৎ ডাক্তারির মাধ্যমে আয়-রোজগার করা তার মূল লক্ষ্য নয়, মানবসেবাই তার লক্ষ্য।

শেখ মুজিব ছাড়াও যেসব ক্ষমতাধরদের মূর্তি ভাঙা হয়েছে

কোভিডের লকডাউনের সময় তিনি অধিকাংশ রোগীকে পরামর্শ দিয়েছেন খুব খারাপ অবস্থা না হলে হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিতে- সে রকম একটা চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রও তিনি দিতেন। আমার মোট পাঁচবার কোভিড হয়েছে। তার ভেতর দুইবার দিল্লিতে থাকা অবস্থায়। জ্বরের লক্ষণ শুনেই তিনি ওষুধ দিয়েছেন। একবার জ্বর নিয়ে দুইদিন পরেই তাকে ফোন করতেই তিনি গলার স্বর শুনেই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দেন। বলেন, কোভিডের সঙ্গে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ, কোনো লং কোভিডের ধাক্কা শরীরে পড়েনি তাঁর সুচিকিৎসার ফলে।

লেখাটাতে কিছু স্মৃতিই উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, তাঁর ডাক্তারি বিদ্যা নিয়ে লেখার কোনো জ্ঞান তো আমার নেই।

প্রফেসর নুরুল ইসলামের কাছে প্রথম স্মৃতি ছিলো এমনিটি- অনেকগুলো টেস্ট করিয়ে একজন ডাক্তার যখন বললেন কিডনিতে সমস্যা হয়েছে – তখন পরিবার থেকে বললো চেন্নাই আর কোথায় কোথায় যেন নিয়ে যাবে। আমার খুব একটা ইচ্ছে না। কারণ আমার ধারণা আছে ওসব জায়গার চিকিৎসা নিয়ে। এ সময়ে গাজী শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের স্ত্রী বললেন, ভারতে যেও তবে আজ একটু নুরুল ইসলাম সাহেবকে দেখিয়ে এসো। বলে উনি ফোন করে দিলেন।

প্রফেসর নুরুল ইসলামের কাছে গেলে উনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তারপরে ওই ব্যবস্থাপত্র ও একগাদা টেস্ট দেখে বিরক্ত হলেন ঠিক- কিন্তু হেসে বললেন, তোমার কিছু হয়নি। বললাম স্যার কোনো ওষুধ দেবেন না, হেসে বললেন ওষুধ খেতে চাও। বলে ড্রয়ারে হাত দিয়ে একটি ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের ভায়াল দিলেন। তখন ফাইজার কোম্পানি বা রেনাটা এটা তৈরি করতো। প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরিও শুধু প্রেসারটা মেপে আর বুকে একটু স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে বলেছিলেন, কিছুই হয়নি। তারপরে যে ওষুধ লিখেছিলেন, মাসে তার মূল্য পড়তো ২১ টাকা। ওনাকে দেখাতে গেলে একটা ফরম ফিলাপ করতে হতো। সেখানে আয়ের পরিমাণ কত তা লিখতে হতো। প্রশ্ন করেছিলাম স্যার এটা কেন? তিনি বলেছিলেন, দেখ প্রত্যেককে তার আয়ের মধ্যে একটা বাজেট করে চলতে হয়। যদি ওষুধ কেনার টাকা জোগাড়ের চাপ তার মাথায় ঢুকে যায় তাহলে তো আর তার রোগ সারবে না। আগে তো মন তারপরে তো শরীর। আর প্রফেসর আবদুল্লাহর গলার স্বর শুনেই কোভিডের সঙ্গে নিউমোনিয়ার ওষুধ দেওয়ার কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

এছাড়া গত দুই দিনে সামাজিক মাধ্যমে হাজার হাজার স্মৃতি পাচ্ছি প্রফেসর আবদুল্লাহর চিকিত্‌সাসেবা নিয়ে।  সবাই বলছেন, একটি বা দুটি ওষুধ খেয়েছেন- তাতেই কীভাবে সুস্থ হয়ে গেছেন। হাজার হাজার মানুষের এই প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে প্রফেসর আবদুল্লাহকে কর্তৃপক্ষ অপমান করেই যেন আরেকবার দেশের মানুষকে তাদের ভালোবাসার ও শ্রদ্ধার মুকুটটি অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহর মাথায় পরিয়ে দেওয়ার সুযোগ দিল।

কিন্তু সব শেষে একটি প্রশ্ন আসে, আসলে জাতি হিসেবে আমাদের সমস্যা কোথায়? এ জাতির একমাত্র বীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাস্কর্যের মাথায় উঠে আমরা প্রস্রাব করি। দেশের গত ৬০ বছরের তিনজন গুণী ডাক্তার যাদেরকে গোটা দেশ শ্রদ্ধা করতো বা করে। তাদের প্রত্যেকেই অপমানিত হতে হলো।

জাতির এই রোগের চিকিৎসা কে করবে? যে জাতির একদল মানুষ দীর্ঘকায় বীরকে সরিয়ে সেখানে বামনকে বসাতে পছন্দ করে, গুণীকে সম্মান না করে অসম্মান করে আনন্দ পায়। এ রোগের চিকিৎসা কী?

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.