পশ্চিমা গণতন্ত্রে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। যে উদারনীতি একসময় স্বাধীনতা, সমতা ও সামাজিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, আজ সেটিই নানা দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন উত্থান এবং ডানপন্থী জনতাবাদের বিস্তার—উভয় প্রবণতাই ইঙ্গিত করছে যে প্রচলিত উদারপন্থী রাজনীতি মানুষের আস্থা ও আবেগের সঙ্গে আগের মতো সংযোগ রাখতে পারছে না।
ব্রিটেনে লেবার পার্টির ভেতরে আরও বামঘেঁষা অর্থনৈতিক চিন্তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টদের নির্বাচনী সাফল্য এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। যদিও সব ভোটার সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছেন না, তবুও এটা স্পষ্ট যে মধ্যপন্থী উদারনীতির প্রচলিত সংস্করণ ক্রমশ প্রাণশক্তি হারাচ্ছে।
উদারনীতির হারানো লড়াকু চরিত্র
উদারনীতির জন্ম হয়েছিল ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। এটি ছিল বংশগত সুবিধা, অভিজাততন্ত্র, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, একচেটিয়া অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন। সেই অর্থে উদারনীতি ছিল প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সমালোচক, রক্ষক নয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদারনীতি পশ্চিমা সমাজের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ফাউন্ডেশন, গণমাধ্যম এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের একটি অংশের কাছে এটি আর পরিবর্তনের শক্তি নয়; বরং বিদ্যমান ক্ষমতার অংশ বলে মনে হয়।
স্বাধীনতা বনাম দায়িত্ব
গত কয়েক দশকে উদারনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং মুক্তবাজারের প্রতি দৃঢ় সমর্থন। কিন্তু এই অবস্থানের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে বাজারের বিকৃতি, করপোরেট একচেটিয়াতন্ত্র এবং সামাজিক সংকটকে প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে।
ফলে বৈষম্য বেড়েছে, অর্থনৈতিক শক্তি কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং অনেক সামাজিক সমস্যার ক্ষেত্রে কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। আসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা জনস্বাস্থ্য সংকটকে প্রায়শই কেবল কাঠামোগত ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও করপোরেট প্রভাবের প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রকৃত স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অনুপস্থিতি নয়। মানুষ যদি একচেটিয়া অর্থনৈতিক শক্তি, অপরাধ, আসক্তি কিংবা অজ্ঞতার কারণে নিজের সক্ষমতা হারায়, তবে তার স্বাধীনতাও সীমিত হয়ে পড়ে। উদারনীতিকে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হবে।

মেধাতন্ত্রের নতুন অভিজাত শ্রেণি
উদারনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল মেধার ভিত্তিতে অগ্রগতির সুযোগ সৃষ্টি। জন্ম, বর্ণ বা শ্রেণিগত পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা ও পরিশ্রমকে মূল্যায়নের ধারণা আধুনিক সমাজকে বদলে দিয়েছে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেধাতন্ত্র নিজেও একটি নতুন অভিজাত শ্রেণিতে রূপ নিয়েছে। যারা সুযোগের সমতার কথা বলে, তারাই অনেক সময় নিজেদের সুবিধাজনক কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখতে আগ্রহী। ফলে নীতিগত বক্তব্য এবং বাস্তব আচরণের মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা, আবাসন এবং সামাজিক গতিশীলতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে এই দ্বৈততা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা জন্ম নিয়েছে যে উদারনীতির নেতৃত্ব আসলে তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী।
জনতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের সুযোগ
এই পরিস্থিতিতেই জনতাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো নতুন শক্তি পেয়েছে। তারা অন্তত এমন একটি ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছে যে তারা প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রস্তুত। যদিও তাদের প্রস্তাবিত সমাধান সবসময় কার্যকর বা বাস্তবসম্মত নয়, তবুও তারা মানুষের ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তাকে রাজনৈতিক ভাষা দিতে পেরেছে।
মানুষ যখন মনে করে যে বিদ্যমান ব্যবস্থা তাদের জন্য কাজ করছে না, তখন তারা এমন নেতাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে যারা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করলে উদারনীতির সংকট আরও গভীর হবে।
পুনর্জাগরণের পথ
উদারনীতির ভবিষ্যৎ তার মৌলিক নীতিগুলো পরিত্যাগ করার মধ্যে নেই। বরং প্রয়োজন তার প্রাথমিক বিদ্রোহী চেতনাকে পুনরুদ্ধার করা। একচেটিয়া অর্থনৈতিক ক্ষমতা, বংশগত সুবিধা, বন্ধ সামাজিক কাঠামো এবং প্রতিযোগিতাবিরোধী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আবারও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
কেন্দ্রপন্থা যদি কেবল বাম ও ডানের মাঝামাঝি একটি আপসের অবস্থান হয়ে থাকে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিন্তু যদি এটি আবারও ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈষম্য এবং সুযোগের অসমতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের শক্তি হয়ে উঠতে পারে, তাহলে উদারনীতি নতুন জীবন পেতে পারে।
ইতিহাসে উদারনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল মানুষকে শুধু স্বাধীনতা দেওয়া নয়, সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করা। বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সেই লক্ষ্যকেই আবার রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।
ফরিদ জাকারিয়া 



















