পাঁচ দিনের মালয়েশিয়া এবং চীন সফর শেষে তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন গতকাল, ২৬ জুন।
এই দুটো দেশ সফরের বিস্তারিত আপনারা ফেসবুক, মেইন স্ট্রিম মিডিয়া এবং টেলিভিশনে দেখেছেন। সব জায়গাতেই এই সফর গুলোকে ‘ঐতিহাসিক’, ‘নতুন সরকার প্রধানের জন্য বিরাট সম্মানের’ ইত্যাদি বিশেষনে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
এগুলো যখন আমি পড়ছিলাম বা দেখছিলাম তখন আমার বারবার মনে হচ্ছিল যে এই দেশে প্রকৃত সাংবাদিকতা আছে কিনা? এর কারণ টিভি এবং সংবাদপত্রে যেভাবে বিষয়গুলোকে তুলে ধরা হয়েছে তাতে আমার মনে হল যে এগুলো সরকারি বিটিভি বা আগের আমলের দৈনিক বাংলার মত। এদের রিপোর্টিং গুলো দেখে মনে হয় এরা সাংবাদিক নয়, ইনফরমেশন মিনিস্ট্রির তথ্য কর্মকর্তা। সরকারি বয়ানগুলোকে কূটনৈতিক প্রতিবেদক, নিজস্ব সংবাদদাতা ইত্যাদি বলে চালিয়েছে।
ব্যাপারটা বুঝায় বলি। সাংবাদিকতার প্রথম লেসন হল সরকারি বয়ানকে ভালোভাবে ভেরিফাই করে পাঠক বা দর্শকদের সামনে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরা। উদাহরণস্বরূপ বলি প্রকৃত সাংবাদিকদের প্রশ্ন করা উচিত ছিল এই সফরগুলোক ‘ঐতিহাসিক’ এবং, ‘অত্যন্ত সফল’ বলা হচ্ছে কেন? তাদের উচিত ছিল ভালোভাবে হোমওয়ার্ক করা এবং এর আগে বাংলাদেশ সরকার প্রধানদের সফরের বেলায় কি হয়েছে বা হয়নি সেটা পরিষ্কার করে বলা।
দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় থেকে দেখেছি যে প্রতিটা বিদেশ সফরের পরই প্রত্যেকটা সরকার প্রধান বলেন যে ভীষণ সাকসেসফুল হয়েছে ভিজিট। আর তাদের পোষ্য সংবাদ মাধ্যমগুলো এর প্রমাণ হিসেবে দেখায় গার্ড অফ অনার, অফিসিয়াল মিটিং বা স্টেট ডিনারের বিবরণ। এই সাংবাদিকরা কখনোই চিন্তা করে না বা বুঝতে পারে না যে দ্বিপাক্ষিক বা রাষ্ট্রীয় সফরে এগুলো একটা নরমাল প্রটোকল। আমাদের দেশে যখন কোন সরকার প্রধান আসেন আমরা ঠিক তাদেরকে একইভাবে ট্রিট করি। এ প্রসঙ্গে বলি, চীন গত ছয় মাসে এক ডজন এর উপর বিদেশী সরকার প্রধানদের হোস্ট করেছে। তারেক রহমানের সফরের মাত্র দু সপ্তাহ আগে তারা মিয়ানমারের মিলিটারি জান্তা সরকারের প্রধানকে দাওয়াত দিয়ে এনে একইভাবে আপ্যায়ন করেছে।
তারেক রহমানকে যে কোনো বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়নি তার প্রমাণ যখন অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান (এখন বিশ্ব বাটপার হিসেবে সমধিক পরিচিত) মুহাম্মদ ইউনুস গত বছর চিনে যান তখন তাকে একইভাবে রিসেপশন দেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৪ এ শেখ হাসিনা গেলেও একই ব্যাপার হয়েছে। যদিও শেখ হাসিনা যে পাঁচ বিলিয়ন ডলার লোন চেয়েছিল সেটা তারা দেয়নি। ক্ষুব্দ হয়ে তিনি একদিন আগেই সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন।
এইসব সফরে সাধারণত দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। এরপর একটা যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। আমি গত কয়েকটা সফরের যৌথ বিবৃতির দিকে চোখ বুলালাম। সত্যি কথা বলতে কি তেমন উল্লেখযোগ্য কোন কিছু দেখতে পেলাম না।

উদাহরণস্বরূপ বলি, প্রতিটা সফরের পরেই বলা হয় দুই নেতা বর্তমানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন। তারপর সমঝোতা স্মারক সই হয় এবং সেখানে দুই দেশ কি কি ব্যাপারে একে অপরের সাহায্য সহযোগিতা নিতে পারে তার একটা ধারণা দেওয়া হয়।
মালয়েশিয়া এবং চীন সফরের ক্ষেত্রে একই ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। অর্থাৎ সমঝোতা হয়েছে, কিন্তু কোন কংক্রিট রেজাল্ট দেখলাম না।
প্রথমেই বলি মালয়েশিয়ার কথা। সেখানে আমাদের একটা বড় শ্রম বাজার রয়েছে এবং সেটাকে আরো কিভাবে বাড়ানো যায় তার একটা চেষ্টা বাংলাদেশ আগেও করেছে, এখনো করছে। আমি কিছুদিন আগে মালয়েশিয়া সফর করেছি। সেখানে দেখলাম দশ লাখের উপর বাংলাদেশী আছেন। এদের অনেকেই অবৈধ। এটা মালয়েশিয়ার জন্য একটা বড় সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। প্রায়ই খবরে দেখি সেখানে অবৈধ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে এবং অন্যান্য অবৈধদের সঙ্গে বাংলাদেশীরাও জেল খাটছে। মালয়েশিয়া বারবার বলছে যে তোমরা এখানে দক্ষ বা আধা-দক্ষ জনবল পাঠাও, যারা সত্যিকার অর্থে আমাদের এখানে কিছু কন্ট্রিবিউট করতে পারবে।
এই অবৈধ শ্রমিকদের মালয়েশিয়া বৈধতা দেবে এমন কোন অঙ্গীকার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী করেননি। করার কথাও না। তারও আগে এক অভিযানে মালয়েশিয়া প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশীকে বের করে দেয়। সেটা ছিল ইউনুস সরকারের সময়। ইউনুসের মালয়েশিয়া সফর শেষে আমাদের বলা হলো যে এই সফরের ফলে বিতাড়িত বাংলাদেশিরা আবার সেখানে ফেরত যাবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ গেছে কিনা সেটা জানিনা।
সদ্য সমাপ্ত চীন সফরে অলমোস্ট একই ব্যাপার ঘটেছে। সমঝোতা স্মারক ছাড়া আর কোন কংক্রিট আউটকাম নেই। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, চীন যেটা চাইছে সেটাই পাচ্ছে। নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে করিডোর দেওয়ার কোন প্রস্তাব ছিল না। কিন্তু পরদিন দেখলাম সী জীন পিং এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে সেই ব্যাপারটাতেই তারা জোর দিয়েছে। এর অর্থ হল চীনের সর্বোচ্চ নেতা এটাই চান এবং সেটা বুঝানোর জন্যই ওই বৈঠকে তারেক রহমানকে সেটা বলা হয়েছে।
একটা জিনিস দেখতে পাচ্ছি আমাদের উপর বড় দেশগুলো বিভিন্ন জিনিস চাপিয়ে দিচ্ছ। এর আগে আমেরিকা করিডোর চেয়েছিল, এবার চীন চাচ্ছে। এটা দেখার পর আমার মনে হল বাংলাদেশ কেন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের সঙ্গে এটাকে কন্ডিশনাল করল না। মিয়ানমার আমাদের বন্ধু না। এটা এখন পরিষ্কার। তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না এটাও মোটামুটি আমরা এখন বুঝতে পেরেছি। চীন নিশ্চয়ই তার নিজের স্বার্থ উপেক্ষা করে মিয়ানমারের উপর এমন কোন চাপ সৃষ্টি করবে না যা তার স্বার্থের পরিপন্থী।

আরো একটা উল্লেখযোগ্য বিষয়: এই সফরের আগেই বাংলাদেশ চীনের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সেখান থেকে যুদ্ধবিমান কেনার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। এর ফলে চীনের সঙ্গে যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি আছে সেটা আরো বাড়বে। বর্তমানে চীন থেকে আমরা ২০ বিলিয়ান ডলারের পণ্য আমদানি করি। রপ্তানি করি এক বিলিয়নেরও কম। আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন আমেরিকাও আমাদেরকে চাপ দিচ্ছে তাদের থেকে সামরিক অস্ত্র কেনার।
আমি বুঝতে পারছি না, আমাদের নেতারা কেন তাদেরকে বলছে না যে আমাদের এখন কোন সামরিক অস্ত্রের প্রয়োজন নাই। আমাদের দরকার কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন এবং রপ্তানির আরো ডাইভারসিফিকেশন। তাদেরকে বলা উচিত যে আমাদের এইসব ক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য সহযোগিতা প্রয়োজন।
কিছুদিন আগে দেখলাম তুরস্কের সঙ্গে আলাপ আলোচনা হচ্ছে এখানে ড্রোন ফ্যাক্টরি তৈরি করার। এটা নাকি আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে! আরো বলা হচ্ছে আমরা এই ধরনের অত্যাধুনিক জিনিস রপ্তানি করলে আমাদের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। কিন্তু এইভাবে অস্ত্রপাতির কারবার করলে দেশের সত্যিকার অর্থে যে কোন উন্নতি হয় না সেটা বহুবার আমরা দেখেছি বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে।
এই পোস্ট শেষ করব শুধু একটি কথা বলে, বিশেষ করে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে। আপনারা দয়া করে সাংবাদিক হওয়ার চেষ্টা করেন। প্রেস রিলিজ লেখা আপনাদের দায়িত্ব বা কর্তব্য না। দেশের মানুষের কাছ প্রকৃত এবং সত্য ঘটনা তুলে ধরাই সাংবাদিকের মূল দায়িত্ব। কোন দল বা সরকারের লেজুরবৃত্তি করা নয়।
আরশাদ মাহমুদ 



















